চীন, থাইল্যান্ড ও ভারত থেকে উন্নত মানের পোশাক এনে রাজধানীর বিপণিবিতানগুলোয় সরবরাহ করতেন ব্যবসায়ী সিদ্দিকুর রহমান। এজন্য প্রতি মাসেই ৫-৭ কোটি টাকার ঋণপত্র (এলসি) খুলতে হয় তাকে। এতদিন ব্যাংকাররাই তার কাছে আসতেন এলসি খোলার তদবিরে। এখন ব্যাংকারদের কাছে ধরনা দিয়েও সিদ্দিকুর রহমান এলসি খুলতে পারছেন না।
এ পরিস্থিতি শুধু এক সিদ্দিকুর রহমানের নয়, বরং দেশের ছোট ও মাঝারি মানের আমদানিকারকরা ঋণপত্র খুলতে গিয়ে বিপদে পড়ছেন। দেশের আন্তঃব্যাংক মুদ্রাবাজারে বাংলাদেশ ব্যাংক ঘোষিত প্রতি ডলারের মূল্য ৮৬ টাকা ৭০ পয়সা। যদিও এ দামে কোনো ব্যাংকেই ডলার পাওয়া যাচ্ছে না। ব্যাংকগুলো বড় ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে ডলারপ্রতি ৯০-৯৫ টাকা পর্যন্ত আদায় করছে। আর মাঝারি ও ছোট ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে আদায় করছে তারও বেশি। এক্ষেত্রে প্রতি ডলারের মূল্য ৯৮ টাকা পর্যন্ত ঠেকছে বলে জানা গিয়েছে।
ব্যবসায়ী সিদ্দিকুর রহমানের ভাষ্য, ব্যাংক কর্মকর্তারা বলছেন, বাজারে ডলার নেই। এজন্য এলসি খোলা কঠিন হয়ে গিয়েছে। চাপাচাপি করলে ব্যাংকাররা যে দর বলছেন, সে দরেই ডলার কিনতে হচ্ছে। গত সপ্তাহে ৯৬ টাকা দরেও ডলার কিনতে হয়েছে।
ব্যবসায়ীদের অভিযোগ ব্যাংকাররা স্বীকারও করছেন। তারা বলছেন, মানি এক্সচেঞ্জ প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে ৯৫ টাকা দরেও রেমিট্যান্স কিনতে হচ্ছে। ব্যাংক তো গ্রাহকদের কাছে লোকসানে বিক্রি করতে করবে না। ব্যাংকের স্বার্থে বড় ব্যবসায়ীদের কেনা দামেও ডলার দিতে হচ্ছে। কিন্তু ছোট ও মাঝারি ব্যবসায়ীদের একই দামে ডলার দেয়া সম্ভব নয়। ফলে এ শ্রেণীর ব্যবসায়ীদের থেকে বাড়তি দাম নিতে হচ্ছে। দেশের অন্তত তিনটি ব্যাংকের শীর্ষ নির্বাহীর পাশাপাশি বেশ কয়েকটি ব্যাংকের শাখা ব্যবস্থাপকরা এসব কথা বলেছেন। তবে তাদের কেউই নিজেদের নাম উদ্ধৃত করে বক্তব্য দিতে রাজি হননি।
চলতি অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে (জুলাই ’২১-মার্চ ’২২) ৬ হাজার ১৫২ কোটি ডলারের পণ্য আমদানি করেছে বাংলাদেশ, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ৪৩ দশমিক ৮৬ শতাংশ বেশি। রেকর্ড আমদানির এলসি দায় পরিশোধ করতে হিমশিম খাচ্ছে দেশের বেশির ভাগ ব্যাংক। এতে ডলারসহ বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। ফলে দেশের বাজারে প্রতিটি শক্তিশালী বৈদেশিক মুদ্রারই দাম বেড়েছে।
টাকার অবমূল্যায়ন ঠেকাতে প্রায় প্রতিদিনই বাজারে ডলার বিক্রি করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। চলতি অর্থবছরে এরই মধ্যে রিজার্ভ থেকে ৫০৩ কোটি ডলার বিক্রি করা হয়েছে। এর পরও ডলারের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারছে না কেন্দ্রীয় ব্যাংক। দেশের আন্তঃব্যাংক মুদ্রাবাজারে গত বৃহস্পতিবার ডলারের ঘোষিত দর ছিল ৮৬ টাকা ৭০ পয়সা। যদিও ঘোষিত মূল্যের চেয়ে ৯-১০ টাকা বেশি দরে ব্যাংকগুলো ডলার লেনদেন করেছে। অথচ ২০২১ সালের জুনে প্রতি ডলারের ঘোষিত মূল্য ছিল ৮৪ টাকা ৮০ পয়সা।
তবে কিছুটা বিপরীত চিত্র দেখা যাচ্ছে ডলারের খুচরা বাজারে (কার্ব মার্কেট)। সাধারণত ব্যাংকের চেয়ে কার্ব মার্কেটে ডলারের দাম ২-৩ টাকা বেশি থাকে। কিন্তু বর্তমানে এ পরিস্থিতি একেবারেই পাল্টে গেছে। কার্ব মার্কেটে গত বৃহস্পতিবার প্রতি ডলারের মূল্য ছিল ৯৪-৯৫ টাকা।
খুচরা বাজার থেকেও ব্যাংকিং চ্যানেলে ডলারের দর বেড়ে যাওয়াকে অস্বাভাবিক হিসেবে দেখছেন না মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, কার্ব মার্কেটের তুলনায় ব্যাংকিং চ্যানেলে ডলারের চাহিদা অনেক বেশি। ব্যাংক বড় অংকের ডলার একসঙ্গে কেনে এবং বিক্রি করে। চাহিদা বেশি হওয়ায় এক্সচেঞ্জ হাউজগুলোর কাছ থেকে ৯৪ টাকারও বেশি দামে ব্যাংকগুলো ডলার কিনতে বাধ্য হচ্ছে।
সৈয়দ মাহবুবুর রহমান জানান, যেসব ব্যাংকের রেমিট্যান্স ও রফতানি আয় ভালো, তারা অপেক্ষাকৃত ভালো অবস্থায় আছে। যে অংকের আমদানি এলসি এরই মধ্যে খোলা হয়েছে, সেগুলো নিষ্পত্তি করাই বড় চ্যালেঞ্জ। বাংলাদেশ ব্যাংক বিলাসপণ্য আমদানির লাগাম টানার উদ্যোগ নিয়েছে। তবে দেখতে হবে, মোট আমদানি পণ্যের মধ্যে এ ধরনের পণ্যের অংশ কতটুকু। আগামী দিনগুলোয় আমদানি দায় ও বিদেশী ঋণ পরিশোধে বড় ধরনের চাপ তৈরি হবে।
দেশের রফতানি খাতে বড় প্রবৃদ্ধি সত্ত্বেও চলতি অর্থবছরে বাণিজ্য ঘাটতি রেকর্ড ছাড়িয়েছে। ফলে অর্থবছরের প্রথম নয় মাসেই সরকারের চলতি হিসাবে ঘাটতি তৈরি হয়েছে ১৪ বিলিয়ন ডলার। দেশের ব্যালান্স অব পেমেন্টের ঘাটতিও ৩ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে। রেমিট্যান্সের মন্দা ভাবের পাশাপাশি আমদানি প্রবৃদ্ধির চাপ সামাল দিতে ব্যর্থ হওয়ায় এ ঘাটতি তৈরি হয়েছে।
রেকর্ড বাণিজ্য ঘাটতির সঙ্গে নতুন দুশ্চিন্তাও যুক্ত হচ্ছে দেশের অর্থনীতিতে। প্রতি বছর যে পরিমাণ অর্থের পণ্য রফতানি হচ্ছে, সেটি প্রত্যাবাসিত হচ্ছে না। শুধু গত আড়াই বছরেই রফতানি ও অর্থ প্রাপ্তির ব্যবধান ১ হাজার ২৯১ কোটি বা ১২ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে। করোনার প্রভাবে বিদেশী ক্রেতাদের সঙ্গে বাংলাদেশী রফতানিকারকদের বাণিজ্য বিরোধের ঘটনা বাড়ছে। একই সঙ্গে বাড়ছে রফতানির বিপরীতে পণ্যের মূল্য হ্রাসের ঘটনাও। ঋণপত্রের বিপরীতে অর্থ পরিশোধের সময়সীমা বেড়ে যাওয়ার নেতিবাচক প্রভাবও রফতানি আয় প্রত্যাবাসনের ওপর পড়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রফতানি আয়ের যে প্রবৃদ্ধি সেটি আমদানি ব্যয়ের তুলনায় খুবই কম। এ কারণে দেশের বাণিজ্য ঘাটতি রেকর্ড উচ্চতায় গিয়ে ঠেকেছে। করোনাভাইরাস সৃষ্ট আর্থিক দুর্যোগ, ইউক্রেন যুদ্ধসহ বৈশ্বিক নানা কারণে জ্বালানি তেল-গ্যাসসহ খাদ্যপণ্যের দাম এখন আকাশচুম্বী। শিগগিরই এ পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে আসবে এমন কোনো অবস্থাও দেখা যাচ্ছে না। ফলে সরকারের চলতি হিসাব ও ব্যালান্স অব পেমেন্টের বিদ্যমান ঘটতি বছর শেষে আরো বড় হবে। আগামী দুই বছর একই পরিস্থিতি বিদ্যমান থাকলে দেশের অর্থনীতিতে দুর্যোগ নেমে আসবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, চলতি অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে ৩ হাজার ৬৬১ কোটি ডলারের পণ্য রফতানি করেছে বাংলাদেশ। যেটি ২০২০-২১ অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ৩২ দশমিক ৯২ শতাংশ বেশি। বিপরীতে চলতি অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে দেশে ৬ হাজার ১৫২ কোটি ডলারের পণ্য আমদানি হয়েছে। আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় আমদানিতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৪৩ দশমিক ৮৬ শতাংশ। রেকর্ড এ আমদানি প্রবৃদ্ধি দেশের ২ হাজার ৪৯০ কোটি ডলারের বাণিজ্য ঘাটতি তৈরি করেছে।
প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্সের অর্থে দেশের বাণিজ্য ঘাটতি পূরণ হতো। কিন্তু চলতি অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে রেমিট্যান্সের প্রবৃদ্ধি কমেছে ১৭ দশমিক ৭৪ শতাংশ। এ সময়ে দেশে ১ হাজার ৫২৯ কোটি ডলারের রেমিট্যান্স এসেছে। রেমিট্যান্স ও রফতানি আয় বাবদ নয় মাসে দেশে ৫ হাজার ১৯২ কোটি ডলার বৈদেশিক মুদ্রা এসেছে। বিপরীতে একই সময়ে ৬ হাজার ১৫২ কোটি ডলারের পণ্য আমদানি করেছে বাংলাদেশ।
চলতি অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে গড়ে আমদানি ব্যয় হয়েছে ৬৮৩ কোটি ডলার। অর্থবছরের বাকি তিন মাসে একই হারে আমদানি হলে বছর শেষে দেশের আমদানি ব্যয় ৮২ বিলিয়ন ডলার ছাড়াবে। ইতিহাস সৃষ্টি করা এ আমদানি প্রবৃদ্ধি চলতি হিসাবের ঘাটতিকে ২০ বিলিয়ন ডলারে নিয়ে যেতে পারে। এ অবস্থায় আমদানিতে লাগাম টানার উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ব্যক্তিগত গাড়ি, হোম অ্যাপ্লায়েন্স হিসেবে ব্যবহূত ইলেকট্রিক্যাল ও ইলেকট্রনিকসামগ্রীর আমদানি ঋণপত্রের ন্যূনতম নগদ মার্জিন ৭৫ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। আর নিত্যপ্রয়োজনীয় নয় এমন পণ্যের নগদ মার্জিন নির্ধারণ করে দেয়া হয়েছে ৫০ শতাংশ।

