বরেণ্য চিত্রশিল্পীদের তুলিতে মুক্তিযুদ্ধের ‘যশোর রোড’র হৃদয়স্পর্শী উপস্থাপনা

আরো পড়ুন

মহান মুক্তিযুদ্ধে যশোর রোডটি লক্ষ লক্ষ বাঙালির অশ্রুভেজা ছিল। এই রোড সন্তান হারা মাকে দেখেছে, স্বামীহারা স্ত্রীকে দেখেছে, তাদের চোখের জলে প্রতিনিয়ত স্নান করেছে। আবার এই রোড সম্ভমহারা নারীকে মুখ লুকিয়ে চলতে দেখেছে। শুধু তাই নয়; যশোর রোড লাখো শরণার্থীকে বিজয়ের মিছিল নিয়ে নিজ ভূখন্ডে ফিরতেও দেখেছে। যুদ্ধকালীন সময়ে যশোর রোডে সেই শরণার্থীদের অবর্ণনীয় দুর্দশা ও যুদ্ধচিত্র ঘটনা প্রবাহের রং-তুলির ছোঁয়ায় তুলে ধরেছেন ‘মুক্তিযুদ্ধে যশোর রোড’ শিরোনামে আর্ট ক্যাম্পে’র ৫০ জন দেশ বরেণ্য চিত্রশিল্পী। রোববার দিনব্যাপী মুক্তিযুদ্ধের সেই অধ্যায়ের গল্প নিয়ে যশোর পৌর পার্কে আর্ট ক্যাম্পের আয়োজন করে জেলা সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট। বিজয়ের ৫০ বছর উদযাপনের অংশ হিসাবে যুদ্ধকালীন সময়ে যশোর রোডে শরণার্থীদের অবর্ণনীয় দুর্দশা-যুদ্ধচিত্র রং তুলির প্রাণবন্ত উপস্থাপনা দেখে অনেকের চোখ যেন ছলছল হয়ে ওঠে।
সকাল সাড়ে ১০ টার দিকে ক্যাম্পের উদ্বোধন করেন দেশ বরেণ্য চিত্রশিল্পী তপন কুমার ঘোষ। প্রধান অতিথি ছিলেন জেলা প্রশাসক তমিজুল ইসলাম খান। সভাপতিত্ব করেন বিজয়ের ৫০ বছর পূর্তি উদযাপন পর্ষদ’২১ এর চেয়ারম্যান হাবিবা শেফা। স্বাগত বক্তব্য দেন আয়োজক পর্ষদের সদস্য সচিব সানোয়ার আলম খান দুলু। সঞ্চালনা করেন মামুনুর রশিদ। উপস্থিত ছিলেন আয়োজক পর্ষদের ভাইস চেয়ারম্যান সুকুমার দাস, হারুণ অর রশীদ, দীপংকর দাস রতন, ফারাজী আহমেদ সাঈদ বুলবুল, অনুষ্ঠান উপপরিষদের আহ্বায়ক অ্যাড. মাহমুদ হাসান বুলু, অর্থ উপপরিষদের আহ্বায়ক তরিকুল ইসলাম তারু, স্বেচ্ছাসেবক উপপর্ষদের আহ্বায়ক নওরোজ আলম খান চপল, প্রচার উপপর্ষদের আহ্বায়ক শরিফুল ইসলাম, অপ্যায়ন উপপর্ষদের আহ্বায়ক রফিকুল ইসলাম প্রমুখ।
আর্ট ক্যাম্পে’ অংশ নেওয়া চিত্র শিল্পীদের হাতে ফুটে উঠে ১৯৭১ সালে বেঁচে থাকার জন্য নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে যশোর রোড দিয়ে হাজার হাজার মানুষ যার যার শেষসম্বল নিয়ে পাড়ি দিচ্ছেন অজানা গন্তব্যে। পথের দু’ধারের খড়ের চালার ঘর, রাস্তার দুধারে বড় বড় গাছ। তার মধ্যে কাঁদা-মাটির রাস্তায় দলবেঁধে হাঁটছে ভারতের দিকে শত শত বাংলার নারী-পুরুষ। কারোও হাতে রং তুলিতে বিজয় মিছিল দিতে দিতে যশোর রোড দিয়ে ওপার বাংলা থেকে এই বাংলার ফেরার দৃশ্য ফুটে উঠেছে। আর্ট ক্যাম্পে যশোরসহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় চারুকলা বিভাগের সাবেক এবং বর্তমান শিল্পীরা অংশ নেয়। ক্যাম্পে আঁকা চিত্রকর্মগুলো নিয়ে আজ সোমবার থেকে সাতদিন ব্যাপী যশোর ইনস্টিটিউটের মিলনায়তনে প্রদর্শনীর আয়োজন করা হবে। উৎসব বিষয়ে বিজয়ের ৫০ বছর পূর্তি উদযাপন পর্ষদ’২১ এর চেয়ারম্যান হাবিবা শেফা বলেন, বিজয়ের ৫০ বছর উদযাপন আমাদের জীবনে এক অনন্য প্রাপ্তি। এই আয়োজনের মধ্য দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস তুলে ধরা, বর্তমান ও আগামী প্রজন্মকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় শাণিত করা, অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের স্বপ্ন বাস্তবায়ন সর্বোপরি বিজয়ের ৫০ বছরকে স্মরণীয় করে রাখতে এ উৎসব মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হবে। সদস্য সচিব সানোয়ার আলম খান দুলু জানান, ১৯৯১ সালে বড় পরিসরে বিজয়ের ২০ বছর উদযাপন হয়েছিল। এর ৩০ বছর পর যশোরে এত বড় সম্মিলিত উৎসব হচ্ছে। শুধু তাই নয়, সাম্প্রতিককালের সেরা উৎসবেও পরিণত হতে যাচ্ছে এটি। কারণ উৎসবে শুধু যশোর শহরেরই নয় বরং ৭টি উপজেলার সাংস্কৃতিক সংগঠনের পরিবেশনা, লোকজ গান, বাউল গানের আয়োজন রয়েছে। যে আয়োজনে মহান মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস তুলে ধরা এবং বর্তমান ও আগামী প্রজন্মের মাঝে মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিকশিত হবে। আয়োজক সংগঠনের ভাইস চেয়ারম্যান ফারাজী আহমেদ সাঈদ বুলবুল জানান, বিজয়ের ৫০ বছর উদযাপন আমাদের জীবনে এক অনন্যপ্রাপ্তি। মহান মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস তুলে ধরা এবং বর্তমান ও আগামী প্রজন্মকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় শানিত করার লক্ষ্য নিয়ে এ উৎসবের আয়োজন করা হয়েছে। এই আয়োজনের মধ্যে দিয়ে আমাদের শিল্পীরা যে আন্তরিকতা নিয়ে ছবিগুলো আঁকছেন সেটি ইতিহাসের একটি অমূল্য দলিল হিসাবে বিবেচিত হবে বলে আমি মনে করি।
প্রসঙ্গত, ‘চলো দুর্জয় প্রাণের আনন্দে’Ñএই শ্লোগানকে সামনে রেখে আজ ৬ ডিসেম্বর মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিধন্য ঐতিহাসিক টাউন হল ময়দানে সকালে সাড়ে ১১টায় যশোর মুক্ত দিবস উদযাপন ও ২১ দিনব্যাপী বিজয় সাংস্কৃতিক উৎসব আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন হবে। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ৫০জন শিল্পীর পরিবেশনায় মহান মুক্তিযুদ্ধের প্রেরণাদায়ী গণসঙ্গীত জয় বাংলা বাংলার জয়, স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে প্রচারিত বিজয়ের গান ‘বিজয় নিশান উড়ছে ওই’ পরিবেশনের পর জাতীয় সঙ্গীত ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালবাসি’ পরিবেশনার সাথে সাথে ৫০ জন মুক্তিযোদ্ধা জাতীয় পতাকা উত্তোলন করবেন। এরপর বর্ণিল ও বর্ণাঢ্য আনন্দ শোভাযাত্রা শহরের গুরুত্বপূর্ণ সড়ক প্রদক্ষিণ করবে।

আরো পড়ুন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

সর্বশেষ