বৃদ্ধ মাকে বাঁশবাগানে রেখে ছেলেরা থাকে পাকাঘরে

আরো পড়ুন

চৌগাছা (যশোর) প্রতিনিধি ॥ ৩০/৩৫ বছর আগে স্বামী হারিয়েছেন ছায়রন বেগম (৭৫)। স্বামী হারানোর পর অন্যের বাড়িতে গৃহকর্মীর কাজ করে ৪ ছেলে ২ মেয়েকে বড় করেছেন। চার ছেলের তিনজন বর্তমানে জীবিত। নিজেরা স্বাচ্ছন্দে থাকেন। সবারই আছে ইটের (আধাপাকা) বাড়ি। মেঝ ছেলে আনিছুর ফ্লাট বাড়ি তৈরি করছেন। বাড়িতে এসেছে ২/৩ গাড়ি চলতি মৌসুমের আমন ধান।
তবে মা’ এখন আর কাজ করতে পারেন না। তাই মা’কে বাঁশঝাড়ের গোবরের সারগর্তে গরু ও মানুষের মলমূত্রের মধ্যে একটি খুপড়ি জায়গা হয়েছে। গত ৫ বছর ধরে এই বৃদ্ধা সেখানেই থাকছেন। এই খুপড়ি ঘরও ছেলেরা তৈরি করে দেননি। নিজের জমানো কিছু টাকা ছিলো। সেই টাকার কিছু দিয়ে খুপড়ির দু’তিনখানা টিন কিনে বাঁশের খুটির উপর বসিয়ে দিয়েছেন ছেলেরা। বাকি টাকাও নিয়ে নিয়েছেন তাঁরা।
এই অমানবিক ঘটনাটি যশোরের চৌগাছার জগদীশপুর ইউনিয়নের স্বর্পরাজপুর গ্রামের।

বৃহস্পতিবার দুপুরে স্থানীয় সাংবাদিকদের মাধ্যমে বিষয়টি জানতে পেরে চৌগাছা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার দায়িত্বে থাকা সহকারী কমিশনার (ভূমি) প্রকৌশলী কাফী বিন কবির এবং উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা ইশতিয়াক আহমেদ দুটি কম্বল, চাল, ডাল আলুসহ খাবার নিয়ে হাজির হন সেখানে। ব্যক্তিগতভাবে এক হাজার টাকা দেন এই বৃদ্ধাকে। সেখানে একটি কাঠের পিড়িতে বসে সরকারের এই কর্মকর্তা বৃদ্ধাকে চেয়ারে বসিয়ে কথা বলেন। সবকিছু শুনে ইউএনও বৃদ্ধার বড় ছেলের পাকা ঘরের বারান্দায় তুলে দেন। নবনির্বাচিত ইউপি সদস্য শাহিনুর রহমানকে ইউএনও নির্দেশ দেন আগামী দুই দিনের মধ্যে বৃদ্ধার তিন ছেলে যেন তাঁর দপ্তরে যান। তিনি বৃদ্ধাকে প্রতিশ্রুতি দেন আপনাকে আর না খেয়ে এভাবে খুপড়ি ঘরে থাকতে হবে না।

তবে ইউএনও’র আসার খবর পেয়ে বাড়িতে তালা ঝুলিয়ে সটকে পড়েন ছেলের বউরা। বৃদ্ধার ছেলেরা মাঠে ছিলেন।
এদিকে, প্রকৌশলী কাফী বিন কবির ছেলেদের বিচার করার কথা বলতেই কেঁদে ফেলেন এই বৃদ্ধা। ইউএনওর হাত জড়িয়ে ধরে বলতে থাকেন ‘‘না না না সোনা। ওদের ধরতি হবে না। ওরা জন মাইনে খেটে খাচ্ছে। খাই¹ে যাক। ওদের কিছু বলবেন না।’
বৃদ্ধা ছায়রন বলেন, সকালে গ্রামের সাবেক ইউপি সদস্য ও স্বর্পরাজপুর দাখিল মাদরাসার সুপার আম্মাদুল তাঁকে খাবার দিয়ে গিয়েছিলেন। সেই খাবার ছাড়া দুপুর পর্যন্ত আর কিছু খাননি। তিনি ইউএনওর কাছে অভিযোগ করেন ছেলে ও পুত্রবধূরা তাঁকে বাড়িতেই যেতে দেয় না। মাঝে মাঝে খাবার দিয়ে যায়। বিষয়টি গ্রামের মানুষ দীর্ঘদিন ধরে জানলেও কোন প্রতিকার পাননি তিনি।

ছায়রনের প্রতিবেশি আয়েশা জনান, স্বামীর মৃত্যুর সময় তাঁর ছোট ছেলের বয়স ছিল মাত্র ৫/৭ বছর। সেই ছেলে মারাও গেছে। তবে তার রেখে যাওয়া মেয়ের বিয়ে হয়েছে। খুপড়ি ঘরটি বৃদ্ধার নিজের জমানো টাকায় করা। বৃদ্ধার সঞ্চিত যে অর্থ ছিল তা হাতিয়ে নিয়েছে ছেলেরা। দীর্ঘদিন ধরে বৃদ্ধা রোদ-বৃষ্টি ঝড়ে এই বাঁশ ঝড়েই থাকেন। কাঁথা-বালিশে-পায়খানা পস্রব করে দিলেও ছেলে-বৌরা পরিস্কার করে দেয় না। পাশের জগদীশপুর গ্রামের এক নারী এবং গ্রামের কিছু মানুষ মাঝে মধ্যে পরিস্কার করে দেন এসব।
গ্রামের সাবেক ইউপি সদস্য আম্মাদুল ইসলাম বলেন মা’র খাবার দেয়া বা ঘরে রাখার মত সক্ষমতা ছেলেদের আছে। তাঁর ছেলে ও নাতি যারা আছে তাঁরা প্রত্যেকে একদিন করে খেতে দিলেও এক সপ্তাহ হয়ে যায়। তবে ওদের বারবার বলেও কাজ হয়নি।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার দায়িত্বে থাকা প্রকৌশলী কাফী বিন কবির জানান, আমরা তাকে কিছু খাবার, হাত খরচ ও দুটি কম্বল দিয়ে ছেলের ঘরে তুলে দিয়ে এসেছি। তাঁর ছেলেদের অফিসে আসতে বলা হয়েছে। তাঁদের সাথে কথা বলে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

আরো পড়ুন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

সর্বশেষ