বাংলাদেশ রেলওয়ের চারটি বড় প্রকল্পের কাজ শেষের পথে। আগামী জাতীয় নির্বাচনের আগেই প্রকল্পগুলো উদ্বোধনের প্রস্তুতি নিচ্ছে রেল মন্ত্রণালয়।
সেপ্টেম্বর মাসেই পর্যায়ক্রমে উদ্বোধন হতে পারে পদ্মা সেতু রেল সংযোগ প্রকল্পসহ দোহাজারী-কক্সবাজার, খুলনা-মোংলা এবং আখাউড়া-আগরতলা রেললাইন।
ধারণা করা হচ্ছে, অক্টোবর মাসে জাতীয় নির্বাচনের তফসিল হতে পারে। তফসিলের পর উন্নয়ন প্রকল্প উদ্বোধনে আইনি বাধা থাকতে পারে। সেই হিসেবে সেপ্টেম্বরেই চার প্রকল্পের উদ্বোধন হতে পারে।
চার প্রকল্পের উদ্বোধনের সার্বিক বিষয়ে রেলপথ মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. হুমায়ুন কবীর জানিয়েছেন, অক্টোবর মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে পদ্মা সেতু রেল সংযোগ প্রকল্পের উদ্বোধনের জন্য প্রধানমন্ত্রীর কাছে সারসংক্ষেপ পাঠানো হবে। সেই হিসেবে আমরা পরিকল্পনা করেছি সেপ্টেম্বর মাসের তৃতীয় সপ্তাহে পদ্মা সেতু রেল সংযোগ প্রকল্পের উদ্বোধন করার এবং তার এক সপ্তাহ পর সেপ্টেম্বরের শেষ নাগাদ উদ্বোধন করা হবে দোহাজারী-কক্সবাজার রেললাইন। তা ছাড়া আগামী সেপ্টেম্বর মাসে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারত সফরের সময় খুলনা-মোংলা এবং আখাউড়া (বাংলাদেশ) এবং আগরতলা (ভারত) রেললাইন উদ্বোধন করা হবে।
রেল মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, আগামী সেপ্টেম্বরে প্রকল্পের উদ্বোধনের জন্য ইতোমধ্যে পরিকল্পনা শুরু হয়েছে। প্রকল্পের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান কোথায় হবে সেসব নিয়েও একটা বৈঠক হয়েছে গত সপ্তাহে। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সুধী সমাবেশে প্রায় ৩ হাজার অতিথিকে আমন্ত্রণ জানানো হতে পারে। ইতোমধ্যেই একটি ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট প্রতিষ্ঠানকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে।
পদ্মা সেতু রেল সংযোগ প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক আফজাল হোসেন বলেন, ঢাকা থেকে ভাঙ্গা অংশে দুই কিলোমিটার রেললাইন বসতে বাকি আছে। কাজ চলমান আছে। ট্রেন চালানোর মতো রেললাইন হয়ে যাবে। আগামী সেপ্টেম্বর মাসে যেহেতু ঢাকা থেকে ভাঙ্গা পর্যন্ত রেললাইনের উদ্বোধনের পরিকল্পনা আছে। ফলে আগামী মাসের শুরুর দিকে এই অংশের ট্রায়াল রান করা হবে।
প্রকল্পের জুলাই মাসের অগ্রগতির তথ্য বলছে, পুরো প্রকল্পের সার্বিক অগ্রগতি হয়েছে ৮১ শতাংশ। এর মধ্যে মাওয়া-ভাঙ্গা অংশের অগ্রগতি হয়েছে ৯৬ শতাংশ। ঢাকা-মাওয়া অংশের অগ্রগতি হয়েছে ৭৯ ভাগ। এদিকে ভাঙ্গা-যশোর অংশের কাজের অগ্রগতি হয়েছে ৭৬ ভাগ।
ঢাকা থেকে পদ্মা সেতু হয়ে যশোর পর্যন্ত ১৬৯ কিলোমিটার রেললাইন বসানো এবং স্টেশন ও অন্য অবকাঠামো নির্মাণের জন্য আলাদা প্রকল্প নেয় রেলওয়ে ২০১৬ সালের জুনে। জিটুজি পদ্ধতিতে এ প্রকল্পে অর্থায়ন করছে চীন। প্রকল্পের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করছে চায়না রেলওয়ে গ্রুপ লিমিটেড (সিআরইসি)। পরামর্শক প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করছে কনস্ট্রাকশন সুপারভিশন কনসালট্যান্ট (সিএসসি), বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। পদ্মা সেতু রেল সংযোগের জন্য ব্যয় ধরা হয়েছে ৩৯ হাজার ২৪৭ কোটি টাকা। প্রকল্পের মেয়াদ আছে ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত।
দোহাজারী থেকে রামু হয়ে কক্সবাজার এবং রামু থেকে মিয়ানমারের অদূরে গুমদুম পর্যন্ত সিঙ্গেল লাইন ডুয়েল গেজ ট্র্যাক নির্মাণ প্রকল্পের কাজ ২০১০ সালে হাতে নেয় সরকার। প্রথম পর্যায়ে দোহাজারী থেকে রামু হয়ে কক্সবাজার পর্যন্ত ১০০ দশমিক ৮৩১ কিলোমিটার সিঙ্গেল লাইন ডুয়েল গেজ রেললাইন নির্মাণ করা হচ্ছে।
এদিকে ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম হয়ে কক্সবাজার ট্রেন যেতে বাধা হলো কালুরঘাট সেতু। এই সেতুর সংস্কারকাজ শুরু হয়েছে। সেপ্টেম্বর নাগাদ শেষ হবে সেতুর সংস্থার কাজ।
এই বিষয়ে রেল মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, ‘পরিকল্পনা করা হচ্ছে সেপ্টেম্বরের শেষে শুধু দোহাজারী থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত রেললাইনের উদ্বোধন করে দেয়া হবে। পরবর্তীতে কালুরঘাট সেতু মেরামত হলে ঢাকা থেকে কক্সবাজার বাণিজ্যিক ট্রেন পরিচালনা শুরু হবে।’
প্রকল্পের অতিরিক্ত প্রকল্প পরিচালক আবুল কালাম চৌধুরী বলেন, প্রকল্পের কাজ প্রায় ৮৭ ভাগ শেষ। অল্প কিছু কাজ বাকি আছে, সেটা সেপ্টেম্বরের মধ্যেই শেষ হয়ে যাবে। আমরা দোহাজারী থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত রেললাইন রেডি করে দেব। সেপ্টেম্বরের শেষে গিয়ে এই প্রকল্পের উদ্বোধন হতে পারে। আমরা আশা করছি, আগামী ১৫ সেপ্টেম্বরের পর দোহাজারী-কক্সবাজার অংশে ট্রেনের ট্রায়াল রান হতে পারে।
জুলাই মাসের অগ্রগতির তথ্য বলছে, প্রকল্পের ১০০ কিলোমিটার রেললাইনের মধ্যে ৮৮ কিলোমিটার রেললাইন বসানো হয়ে গেছে। বাকি আছে ১২ কিলোমিটার। ৯টি স্টেশনের কাজ চলমান আছে। স্টেশনের সার্বিক কাজের অগ্রগতি হয়েছে প্রায় ৮০ ভাগ। এর মধ্যে ডুলাহাজরা স্টেশনের কাজ শেষ হয়েছে।
দোহাজারী থেকে রামু হয়ে কক্সবাজার প্রকল্পটি ২০১০ সালে অনুমোদন পায়। এরপর সব জটিলতা কাটিয়ে ২০১৮ সালে প্রকল্প নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠানগুলো কাজ শুরু করে। ফার্স্ট ট্র্যাক এই প্রকল্পের কাজ ২০২২ সালে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও মেয়াদ বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে ২০২৪ সাল পর্যন্ত। প্রকল্প বাস্তবায়নে মোট ব্যয় হচ্ছে ১৮ হাজার ৩৪ কোটি ৪৮ লাখ টাকা। এর মধ্যে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) ঋণ দিচ্ছে ১৩ হাজার ১১৫ কোটি ৪১ লাখ টাকা। বাকি ৪ হাজার ৯১৯ কোটি ৭ লাখ টাকা সরকারি তহবিল থেকে সরবরাহ করা হবে।
দীর্ঘ সময় অপেক্ষার পর অবশেষে চালু হতে যাচ্ছে আখাউড়া-আগরতলা রেললাইন। ভারতীয় ঋণে বাস্তবায়িত হচ্ছে এ প্রকল্প। ফলে আগামী সেপ্টেম্বর মাসে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারত সফরের সময় দুই দেশের প্রধানমন্ত্রী এই রেললাইনের উদ্বোধন করতে পারেন।
প্রকল্পের সার্বিক অগ্রগতির বিষয়ে জানতে চাইলে প্রকল্প পরিচালক মো. আবু জাফর মিঞা বলেন, আখাউড়া-আগরতলা প্রকল্পের ৮৯ ভাগ কাজ শেষ। রেললাইন বসানোর কাজ প্রায় শেষ। ভবন নির্মাণের ফিনিশিংয়ের কাজ কিছু বাকি আছে। তবে সেপ্টেম্বরের আগেই কাজ শেষ হয়ে যাবে।
এই প্রকল্পের আওতায় বাংলাদেশ অংশে ১০ দশমিক ০১ কিলোমিটার ডুয়েল গেজ মেইন লাইন এবং ২৫ কিলোমিটার ডুয়েলগেজ লুপ লাইন নির্মাণ। ৫৬ দশমিক ০১ একর ভূমি অধিগ্রহণ, ২০টি মাইনর ব্রিজ এবং তিনটি মেজর ব্রিজ নির্মাণ। তিনটি স্টেশনে কম্পিউটারাইজড ইলেকট্রনিক সিগন্যালিং সিস্টেম স্থাপন করা হয়েছে।
২০১০ সালের জানুয়ারিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারত সফরের সময় আখাউড়া-আগরতলা রেলপথ নির্মাণের বিষয়ে একমত হয় উভয় দেশ। তখন ২০১০ সালে ভারত সরকারের অনুদানে এই রেল সংযোগ নির্মাণের জন্য বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক সই হয়। স্মারক অনুযায়ী ভারত সরকারের আর্থিক ও কারিগরি সহায়তায় ইঞ্জিনিয়ারিং প্রকিউরমেন্ট অ্যান্ড কন্সট্রাকশন (ইপিসি) ভিত্তিতে এ রেল সংযোগ নির্মাণকাজ শুরু হয়।
এদিকে আখাউড়া-আগরতলা ডুয়েলগেজ রেল সংযোগ নির্মাণ প্রকল্পটি প্রথম ২০১৬ সালের জুলাই থেকে ২০১৮ মেয়াদে বাস্তবায়নের জন্য প্রকল্পটি অনুমোদন দিয়েছিলো একনেক । এরপর প্রকল্প সংশোধনে সময় বাড়ে ২০২২ সালের জুন নাগাদ। এ মেয়াদেও প্রকল্পের কাজ শেষ হচ্ছে না। চতুর্থবারের মতো প্রকল্পের মেয়াদ হয় ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত। প্রকল্পের মোট ব্যয় হচ্ছে ৪৭৭ কোটি ৮১ লাখ টাকা। এরমধ্যে সরকারি অর্থায়ন ৫৭ কোটি ৫ লাখ টাকা এবং ভারতীয় ঋণ ৪২০ কোটি ৭৬ লাখ টাকা।
খুলনা মোংলা রেললাইন
রেলের দীর্ঘদিনের প্রকল্প খুলনা-মোংলা রেললাইন নির্মাণ। নানা জটিলতায় দফায় দফায় মেয়াদ বেড়ে নির্দিষ্ট সময়ে শেষ হয়নি কাজ। অবশেষে এবার নির্মাণকাজ শেষের পথে। আগামী সেপ্টেম্বরে খুলনা-মোংলা রেললাইনের উদ্বোধন হতে পারে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, জুলাই মাস পর্যন্ত প্রকল্পের সার্বিকভাবে ৯৮ ভাগ কাজ শেষ হয়েছে। তবে পাঁচটা ব্রিজের কিছু গুরুত্বপূর্ণ কাজ চলমান রয়েছে। তা ছাড়া রেললাইন লিংকিংয়ের কিছু কাজ হচ্ছে। রেললাইন বসানোর কাজ শেষ। এই রেল রুটে আটটি স্টেশন নির্মাণ করা হয়েছে। স্টেশনগুলোর শেষ মুহূর্তের ফিনিশিং কাজ বাকি আছে। রং করাসহ কিছু ফিনিশিং কাজ উদ্বোধনের আগ মুহূর্তে করা হবে।
প্রকল্পটি ২০১০ সালে একনেক সভায় অনুমোদন হয়েছিলো। সে সময় প্রাথমিকভাবে ২০১৩ সালের ডিসেম্বরে প্রকল্পটি শেষ করার কথা ছিলো। কিন্তু কাজের অগ্রগতি না হওয়ায় পঞ্চম ধাপে প্রকল্পের মেয়াদ বেড়েছে। সর্বশেষ মেয়াদ বেড়ে খুলনা-মোংলা রেললাইনের কাজ শেষ করার মেয়াদ আছে ২০২৪ সালের অক্টোবর পর্যন্ত। তবে নির্মাণকাজ শেষ করার মেয়াদ হলো চলতি বছরের সেপ্টেম্বরে পর্যন্ত। বাকি এক বছর ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রকল্পের ডিফেক্ট লায়াবেলিটি পিরিয়ড হিসেবে ধরা আছে।

