১০ মাস বয়সী আফরিন প্রায় এক মাসের বেশি সময় সর্দি ও কাশিতে ভুগছিল। থেমে থেমে জ্বর এলেও সেটা এক বা দুইদিন পরে সেরে যেতো। তবে ২ মার্চ থেকে তার জ্বর আর কমেনি। ১০২ থেকে ১০৩ ডিগ্রির উপরে জ্বর উঠছিল বারবার। চিকিৎসকের পরামর্শে একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করানোর পরে নমুনা পরীক্ষায় জানা যায় ‘অ্যাডিনোভাইরাসে’ আক্রান্ত শিশু আফরিন। তার মায়েরও জ্বরের উপসর্গ প্রায় একইসময় থেকে। নমুনা পরীক্ষায় জানা যায় আফরিনের মাও একই ভাইরাসে আক্রান্ত।
একই পরিবারে ১৭ মাস বয়সী আরিয়ান ও ৫ বছর বয়সী সাফিয়াও একমাসেরও বেশি সময় থেকে ভুগছিল জ্বর, সর্দি, কাশিতে।
আরিয়ান ও সাফিয়ার মা ইসমাত আরা আঁখি বলেন, ওদের জন্মের পর থেকে একজন শিশু বিশেষজ্ঞের পরামর্শে সব কিছু করে থাকি। এবারও তাই করছিলাম। কিন্তু আরিয়ানের জ্বর ভালো হলে সাফিয়ার আসতো আর ওরটা ভালো হলে আরিয়ানের। প্রায় দুই মাস এমন অবস্থা। এর মাঝে আমারও প্রায়ই জ্বর ও সর্দি ছিল।
তিনি বলেন, ভাবছিলাম ঋতু পরিবর্তনের ফলে এমন হচ্ছে হয়তো। কিন্তু সাফিয়ার একবার কাশির সঙ্গে কফে রক্ত দেখতে পাই। এরপরে একটানা জ্বর ওর আর গলায় কফ যেন কমছিলই না। এরসঙ্গে আবার যুক্ত হয় পাতলা পায়খানা। শরীর বেশি দুর্বল হয়ে গেলে চিকিৎসকের পরামর্শে হাসপাতালে ভর্তি করাই। সেখানে নমুনা পরীক্ষা শেষে জানা গেলো অ্যাডিনোভাইরাসে আক্রান্ত সাফিয়া। আরিয়ানের নমুনা পরীক্ষার পরেও একই ফলাফল আসে।
সাংবাদিক উজ্জ্বল জিসানের ৮ বছরের ছেলে সাদমানের জ্বর আসার পরে চিকিৎসকের পরামর্শে নাপা খাওয়ানো হয়। কিন্তু তিন দিন জ্বর ১০৩ ডিগ্রির উপরে উঠলে চিকিৎসকের পরামর্শে নাপার পাশাপাশি শুরু করা হয় অ্যান্টিবায়োটিক। এসময় কিছু খেতে পারছিল না সাদমান।
উজ্জ্বল জিসান বলেন, সাদমানের বমির পরিমাণ বাড়তে থাকলে আবার চিকিৎসকের পরামর্শ নেয়া হয়। কারণ এ সময় বমির সঙ্গে চোখে রক্ত আসতেও দেখা যায়। এ সময় দুইটা নমুনা পরীক্ষা দেয়া হয়। কিন্তু তাও জ্বর না কমার কারণে রাজধানীর শিশু হাসপাতালের আরেকজন চিকিৎসকের পরামর্শ নেয়া হয়। এ সময় আগের সব ওষুধ বাদ দিয়ে নতুনভাবে সাবোজিটরের পাশাপাশি শুধুমাত্র নাপা ওষুধ দেয়া হয়। এরপরে জ্বর কমে আসতে থাকে। এরপরে চক্ষু বিশেষজ্ঞের পরামর্শে চোখের চিকিৎসা শুরু করা হয়।
তিনি বলেন, সাদমান ধীরে ধীরে সুস্থ হতে থাকলেও ১০ মার্চ থেকে আমার দুই বছরের শিশুর জ্বর আসে। তার চোখও লাল হয়ে আছে প্রায়। একইরকমভাবে লাগাতার ১০৩ ডিগ্রি জ্বর আসে। ওষুধ খেলে দুই ঘণ্টা জ্বর কিছুটা কমে আসে। কিন্তু এরপর আবার সেই ১০৩ ডিগ্রি। কোনোভাবেই কমছে না। খবরে দেখি অ্যাডিনোভাইরাসে আক্রান্তের হার বাড়ছে। কিন্তু আমাদের দেশে এটা কিভাবে বা কোথায় গেলে পরীক্ষা করানো যাবে তাই তো জানি না।
হ্যাঁ, ‘অ্যাডিনোভাইরাস’ নতুন কোনো রোগের নাম না আবার নতুন কোনো ভাইরাসও না। তবে নভেল করোনাভাইরাস পরবর্তীতে এই রোগের নাম সামনে আসে ভারতের কলকাতায় শিশুদের মৃত্যুর পরে। এখন পর্যন্ত ৫০ জনেরও অধিক শিশু দেশটিতে মারা গেছে ‘অ্যাডিনোভাইরাসে’ আক্রান্ত হয়ে। বাংলাদেশেও বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালের পাশাপাশি শিশু বিশেষজ্ঞদের চেম্বারে বাড়ছে অ্যাডিনোভাইরাসের লক্ষণযুক্ত রোগী।
তবে বেসরকারিভাবে কিছু হাসপাতালে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হলেও সরকারিভাবে এখন পর্যন্ত রোগ শনাক্ত করার জন্য নেয়া হয়নি কোনো উদ্যোগ। শুধু তাই না, কারা করবে এই নমুনা পরীক্ষা এই বিষয়েও পাওয়া যায়নি কোনো উত্তর।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অ্যাডিনোভাইরাসও করোনার মতোই একটি ‘রেসপিরেটরি ভাইরাস’, অর্থাৎ যা শ্বাসযন্ত্রে সংক্রমণ ঘটায়। এর উপসর্গগুলোও অনেকটা কোভিডের মতোই– এবং এটিও অত্যন্ত ছোঁয়াচে বা সংক্রামক। আর যেহেতু ভারতের কলকাতায় এটি বেড়েছে তাই বাংলাদেশেও বাড়তে পারে। কিন্তু অ্যাডিনোভাইরাসের কারণেই মৃত্যু হয়েছে কিনা তা কিন্তু এখনো নিশ্চিত না। তাই দেশে সার্ভিল্যান্স করাটা জরুরি।
কিন্তু সার্ভিল্যান্স করবে কে- এমন প্রশ্নের জবাবে বিশেষজ্ঞরা জানান, সরকারের স্বাস্থ্য অধিদফতরের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) পক্ষ থেকে ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাসের নিয়মিত সার্ভিল্যান্স করা হয়। বর্তমানে পরিস্থিতি বোঝার জন্য তাদের সেটা চালু রাখা প্রয়োজন।
তবে এ বিষয়ে আইইডিসিআর-এর পক্ষ থেকে কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ তাদের সক সার্ভিল্যান্স রিপোর্ট ওয়েবসাইটে প্রকাশিত হওয়ার তথ্য জানালেও সেখানে কোনো আপডেট মেলেনি।
সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখা কর্তৃপক্ষের কেউ কথা বলতে না চাইলেও তাদের কাছে ‘কোনো আপডেট নেই’ বলে জানিয়েছেন।
স্বাস্থ্য অধিদফতরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (প্রশাসন) জানিয়েছেন, দেশের কোনো স্থানে যদি অ্যাডিনো ভাইরাসের সংক্রমণ শনাক্তের সংবাদ পাওয়া যায় তবে তারা অবশ্যই সেটি গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করবেন। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে শনাক্তের তথ্য যদি স্বাস্থ্য অধিদফতরে জানানো না হয় তবে সেক্ষেত্রে কিছু করার থাকে না বলে জানান তিনি।
যেসব লক্ষণ দেখা যাচ্ছে?
রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানের অভিভাবকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, অন্যান্য বছর ঋতু পরিবর্তনের ফলে শিশু থেকে শুরু করে প্রাপ্তবয়স্ক প্রায় সবারই জ্বর, সর্দি, কাশিসহ নানারকমের ভাইরাল ফিভারে আক্রান্ত হওয়ার তথ্য পাওয়া যেতো। কিন্তু এবার শিশু কিছু কিছু ক্ষেত্রে শিশুদের জ্বর একবার উঠলে আর সহজে নামছে না।
কিছুকিছু ক্ষেত্রে দেখা গেছে শিশুদের জ্বর নেই কিন্তু সর্দির পাশাপাশি হালকা ডায়রিয়া হচ্ছে।
একইসঙ্গে কিছু খেতে গেলেই বমি হচ্ছে। একইসময়ে চোখ হয়ে যাচ্ছে রক্তের মতো লাল। আবার অনেক ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে জ্বর উঠে যাচ্ছে ১০৪ ডিগ্রি ফারেনহাইট। প্যারাসিটামল খেলে জ্বর নামছে ঠিকই। কিন্তু কয়েক ঘণ্টার মধ্যে ফের ছুঁয়ে যাচ্ছে সেই ১০৪ ডিগ্রিই।
বিষয়টা কী?
চিকিৎসকরা জানাচ্ছেন, সরকারি হাসপাতালের জরুরি বিভাগের পাশাপাশি প্রাইভেট চেম্বারে আসা অধিকাংশ রোগীদের মাঝে দেখা যাচ্ছে ‘অ্যাডিনোভাইরাসে’র এক বা একাধিক উপসর্গ। অনেকেই জানাচ্ছেন শিশু স্কুল থেকে জ্বর নিয়ে আসছে বাসায় আর এরপরে অন্যদের মাঝে সংক্রমণ ঘটছে।
অন্যান্য সময় ভাইরাল ফিভার, চিকেন পক্স এগুলো ঋতু পরিবর্তনের মতো স্বাভাবিক বিষয় হলেও এবারে ভোগান্তিটা বেড়েছে। বিশেষ করে জ্বর সহজে না নামার পাশাপাশি বমির বিষয়টি শিশুদের দুর্বল করে তুলছে। এমন অবস্থায় এগুলো ‘অ্যাডিনোভাইরাসে’ই লক্ষণ।
চিকিৎসকরা জানান, এবারের অ্যাডিনোভাইরাস সংক্রমণে দুটি বিষয় খুব বেশি করে দেখা যাচ্ছে। এক, নন-রেমিট্যান্ট পার্সিস্টেন্ট ফিভার। অর্থাৎ, শরীরের তাপমাত্রা কখনও স্বাভাবিক (৯৮.৪ ডিগ্রি ফারেনহাইট) জায়গায় আসছে না। প্যারাসিটামল খাওয়ানোর পরেও টানা চার-পাঁচ দিন জ্বর থেকে যাচ্ছে অনেকের। আর তুলনায় জ্বর কম হলেও আক্রান্ত বাচ্চাদের একাংশের চোখের সাদা অংশটা রক্তের মতো লাল হয়ে উঠছে। তাতে চোখ গোলাপি-লাল হয়। কিন্তু টকটকে লাল হওয়ার অর্থ, চোখের ভিতর রক্তপাত হয়েছে।
তবে চিকিৎসকরা এতে ভয় না পেয়ে উপযুক্ত চিকিৎসা নেয়ার পরামর্শ দেন। পাঁচ-ছদিন পেরিয়ে গেলেও বাচ্চাদের যদি জ্বর থেকেই যায় কিংবা প্রচুর বমি বা পায়খানা হয়ে পানিশূন্যতা তৈরি হয় অথবা শ্বাসকষ্ট হয় কিংবা রক্তে অক্সিজেনের মাত্রা কমে যায়, তখন দেরি না-করে হাসপাতালে ভর্তি করানোর পরামর্শ তাদের।
অ্যাডিনোভাইরাস কী?
অ্যাডিনো ভাইরাস সাধারণত চোখ, শ্বাসযন্ত্র, মূত্রনালি ও স্নায়ুতন্ত্রের ক্ষতি করে। সাধারণত আক্রান্ত হওয়ার ২ দিন থেকে ২ সপ্তাহের মধ্যেই শরীরে এই ভাইরাসের উপস্থিতি টের পাওয়া যায়। এই ভাইরাসের সবচেয়ে প্রচলিত লক্ষণগুলি হল জ্বর, সর্দি, কাশি, শ্বাসকষ্ট, গলা ব্যথা, বমি, ডায়রিয়া, পেটে ব্যথা, নিউমোনিয়া, ব্রঙ্কাইটিস, কনজাংটিভাইটিস ইত্যাদি।
সঠিক সময়ে এই ভাইরাসের চিকিৎসা না হলে রোগী মেনিনজাইটিস এবং এনসেফালাইটিসের মতো গুরুতর রোগে আক্রান্ত হতে পারে। অ্যাডিনোভাইরাসের প্রকোপে শুধুমাত্র শিশুরাই নয় বরং যেকোনও বয়সের মানুষই আক্রান্ত হতে পারেন। চিকিৎসকেরা জানাচ্ছেন, অ্যাডিনোভাইরাসে শিশুদের ফুসফুস ও শ্বাসনালী মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যেকোনো বয়সী মানুষ অ্যাডিনোভাইরাসে আক্রান্ত হতে পারেন। জ্বর, সর্দি, কাশি ছাড়াও ফুসফুসে ইনফেকশন হতে পারে। বড়রা শ্বাসনালীর উপরিভাগে বেশি সংক্রমিত হচ্ছে।
কিভাবে ছড়ায় অ্যাডিনো ভাইরাস?
অ্যাডিনো ভাইরাসের চরিত্রটা অনেকটা কোভিডের মতোই। এই সংক্রামক ভাইরাসটি আক্রান্ত ব্যক্তির হাঁচি, কাশি থেকেই ছড়ায়। রোগীর ছোঁয়া কোনো জিনিসের সংস্পর্শে এলেও এই রোগে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। হাঁচি-কাশির মাধ্যমে বাতাসে ছড়িয়ে পড়া ভাইরাসও সরাসরি আক্রমণ করেতে পারে ফুসফুসকে।
রাজধানীর একাধিক অভিভাবকের সঙ্গে কথা বলে জানা যায় বেসরকারি হাসপাতালে নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে তাদের শিশুর অ্যাডিনোভাইরাসের সংক্রমণের বিষয়ে জানতে পারেন। তার মাঝে একটি হাসপাতাল হলো রাজধানীর পান্থপথে অবস্থিত স্কয়ার হাসপাতাল।
প্রতিষ্ঠানটির পেডিয়াট্রিকস অ্যান্ড পেডিয়াট্রিক আইসিইউ কনসালট্যান্ট ডা. আহমেদ সাঈদ বলেন, আমাদের কাছে এটার ডায়াগনোসিস করার পিসিআর সিস্টেম ও কিটস আছে। আমরা যতগুলো বাচ্চাকে পরীক্ষা করছি, যে সমস্ত বাচ্চার নিউমোনিয়া ইম্প্রুভ করছে না, বারেবারে বাবা-মা আউটডোরে আসছে, তাদের আমরা আরেকটু পরীক্ষা করে দেখতে পাচ্ছি সেখানে সবগুলো বাচ্চারই অ্যাডিনোভাইরাস পজিটিভ।
তবে বিষয়টি স্বাস্থ্য অধিদফতর না জানার কারণে সরকারিভাবে খুব একটা বেশি গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে না।
স্বাস্থ্য অধিদফতরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (প্রশাসন) ডা. রাশিদা সুলতানা বলেন, যেকোনো সংক্রমণের বিষয়ে আমরা সতর্ক অবস্থানে আছি। তবে অ্যাডিনোভাইরাসের বিষয়টি নিয়ে আমাদের কাছে কোনো তথ্য নেই। এক্ষেত্রে যদি কোনো বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে এমনটা দাবি করা হয়ে থাকে তবে তা অবশ্যই অধিদফতরের জানানো প্রয়োজন। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায় বেসরকারি কিছু হাসপাতালে নিজেদের ইন্টারেস্ট থেকেও অনেক কিছু করা হয়। অপ্রয়োজনীয় টেস্টও করা হয়ে থাকে। তবে কেউ যদি পেয়ে থাকে সেক্ষেত্রে ডিজি হেলথে কিছু জানানো হয়নি। যদি জানানো হয় তবে সেক্ষেত্রে আমরা সেটা গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করবো।

