ই-কমার্স সাইট ‘ক্লিক বিডি ডটকম।’ সুঁই থেকে সুতা পর্যন্ত বিক্রি হয় এই অনলাইনশপে। ইলেকট্রিক নানা পণ্য থেকে শুরু করে খাদ্য, শাকসবজিও মেলে। ক্লিক বিডি ডটকমের ‘ফুড অ্যান্ড গ্রোসারি’ ক্যাটাগরিতে কিনতে পাওয়া যায় মাদকও! সেখানে প্রকাশ্যেই বিক্রি হচ্ছে ভয়ংকর মাদক ‘কুশ’। অর্ডার করলেই পৌঁছে যাচ্ছে ঘরে। এই কুশ হাতে পাওয়ার পর দেখেশুনে পরিশোধ করা যায় টাকা!
২০২২ সালে দেশে প্রথম ভয়ংকর মাদক কুশের অস্তিত্ব মেলে। ওই সময় র্যাব সদস্যরা রাজধানীর গুলশান এলাকা থেকে ওনাইসী সাঈদ ওরফে রেয়ার সাঈদ নামে এক ব্যক্তিকে গ্রেফতার করেন। এরপর মোহাম্মদপুরে অভিযান চালিয়ে কুশ চাষে তার প্লান্ট আবিষ্কার করা হয়। গ্রেফতারের পর ওই ব্যক্তি জানিয়েছিলেন, বিদেশি এই মাদক চাষ করে তা দেশে ছড়িয়ে দেয়ার পরিকল্পনা ছিল তার। প্রতি ১০০ গ্রাম কুশ তিনি ৩ লাখ টাকায় বিক্রি করতেন।
ওই সময় ওনাইসী সাঈদ ক্লোজ গ্রুপে কুশ বিক্রির তথ্য দিলেও ৬ মাসের মাথায় জানা গেল, মরণঘাতী এই মাদক প্রকাশ্যে ই-কমার্স সাইটে বিক্রি হচ্ছে। সরকার মাদক নির্মূলে জিরো টলারেন্স নীতি ঘোষণার পর মাদকের বিস্তার ঠেকাতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মাদক নির্মূলে ‘যুদ্ধ’ ঘোষণা করেছে। কিন্তু অনলাইনে প্রকাশ্যে এই মাদক বিক্রির তথ্য উদ্বেগ ছড়াচ্ছে। এর আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ক্লোজ গ্রুপ কিংবা মেসেঞ্জারের মাধ্যমে মাদক কেনাবেচার কথা শোনা যেত।
ক্লিকবিডি নামে ওই সাইটে ঢুকে দেখা যায়, এটির ‘হোম অ্যান্ড লিভিং’ ক্যাটাগরিতে ক্লিক করলে ‘ফুড অ্যান্ড ভেজিটেবল’ সাব-ক্যাটাগরির দ্বিতীয় পৃষ্ঠায় ছবিসহ বিক্রির বিজ্ঞাপন রয়েছে। সেখানে ঘোষণা দেয়া হয়েছে, অন্তত ২ হাজার ২৩৩ টাকার কুশ অর্ডার করতে হবে। তবে সেখানে পরিমাণ উল্লেখ করা হয়নি। এতে বলা হয়েছে, অর্ডার করলে ঠিকানা মতো এই মাদক চলে যাবে। এরপর টাকা পরিশোধ করা যাবে। কুশ কিনতে যোগাযোগের জন্য একটি মেইল আইডি দেওয়া দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি সেখানে একটি মোবাইল নম্বরও রয়েছে। তাতে ফোন দিয়ে দেখা যায়, নম্বরটি আফ্রিকার দেশ ক্যামেরুন থেকে চালানো হয়। তাতে ফোন দিলে ই-মেইল নম্বরে যোগাযোগ করতে বলা হয়।
‘কুশ’ বিক্রির ওই ক্যাটাগরির বিবরণে বলা হয়েছে, আমরা কুশ-গাঁজার সেরা আন্ডারগ্রাউন্ড সাপ্লাই দিয়ে থাকি। আমরা সব ধরনের গাঁজা বিক্রি করি। আমরা পেশাদার চাষি। ‘বেগুনি কুশ’, ‘হিন্দু কুশ’, ‘স্নুপ মাস্টার কুশ’, ‘মুন রকসওজি কুশ’ ও ‘আফগানি কুশ’ বিক্রি করি। এতে ‘ব্লু ড্রিম ক্রিস্টাল’ বিক্রির কথাও বলা হয়।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের একজন বিশেষজ্ঞ বলছেন, ভয়ংকর মাদক কুশ গাঁজা বা মারিজুয়ানার মতোই, এটি সিনথেটিক মারিজুয়ানা। গাঁজার চেয়ে এটা শতভাগ বেশি পাওয়ারফুল। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এর নানা নাম থাকলেও এই উপমহাদেশে এই মাদককে কুশ বলা হয়। এটা ধূমপানের সঙ্গে সঙ্গেই বাজে অ্যাকশন শুরু হয়। ট্যাবলেট আকারে সেবন করলে কয়েক ঘণ্টা পর তা কার্যকর হয়। এক মিলিগ্রাম ট্যাবলেট আকারে থাকা এই কুশ এক কেজি গাঁজার চেয়ে বেশি ভয়ংকর।
ই-কমার্স সাইট ক্লিক বিডি ডটকমের অফিস রাজধানীর কাকরাইলে। প্রকাশ্যে মাদক বিক্রির বিষয়ে জানতে ওই সাইটে থাকা মোবাইল নম্বরে যোগাযোগ করা হয়। কাস্টমার ম্যানেজার পরিচয় দিয়ে ইকরাম শিকদার নামের এক ব্যক্তি ফোন রিসিভ করেন। তিনি দাবি করেন, তাদের সাইটে যে কেউ পণ্য বিক্রি করতে পারেন। তবে অবৈধ কিছু বিক্রি করা হয় না। সেই সুযোগও নেই। এই সাইটে মাদক বিক্রির বিজ্ঞাপনের বিষয়ে দৃষ্টি আর্কষণ করলে তিনি বলেন, এটি ব্লক করে দেয়া হবে।
যদিও সাইটটিতে দেখা যাচ্ছে, ২০১৭ সাল থেকে ফুড অ্যান্ড ভেজিটেবল ক্যাটাগরিতে মাদক বিক্রি করা হচ্ছে।
ই-কমার্স সাইটে প্রকাশ্যে মাদক বিক্রির বিষয়ে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের (দক্ষিণ) সহকারী পরিচালক সুব্রত সরকার শুভ বলেন, ই-কমার্স সাইটে মাদক বিক্রির বিষয়টি যেমন নতুন, তেমনি ভয়াবহ। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন-২০১৮ অনুযায়ী অনলাইনে এভাবে মাদক কেনাবেচার কোনো সুযোগ নেই। বিষয়টি আপনার মাধ্যমে আমরা জানতে পারলাম। আমরা এখন এই বিষয়ে যথাযথ ব্যবস্থা নেয়ার জন্য উদ্যোগ নিচ্ছি।
ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম বিভাগের (উত্তর) ডিসি তারেক বিন রশিদ বলেন, ই-কমার্স সাইটকে আমরা সার্বক্ষণিক মনিটরিং করি। এসব সাইটে মাদক বিক্রি করার কোনো সুযোগ নেই। এর আগেও আমাদের কাছে কিছু অভিযোগ এসেছিল। পরে দেখা গেছে সেগুলো ভুয়া। মাদক বিক্রির নাম করে টাকা হাতিয়ে নিত। কিন্তু এসব সাইটে মাদকের নামে প্রতারণার সুযোগও নেই। আমাদের নজরে এলে আমরা আইনি ব্যবস্থা নেব।
গোয়েন্দা সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম বিভাগের (দক্ষিণ) ডিসি মোহাম্মাদ ইকবাল হোসাইন বলেন, বিষয়টি আমাদের নজরে কেউ আনলে আমরা অবশ্যই এসব সাইটের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেব। কারণ প্রকাশ্যে মাদক বিক্রি করে এমন সাইট চলতে দেয়া যেতে পারে না।

