কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরী উপজেলার ঝাউকুটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। প্রতিষ্ঠানটিতে সাতজন শিক্ষকের জায়গায় আছেন মাত্র দুজন। আট বছর ধরে শূন্য রয়েছে প্রধান শিক্ষকের পদ। একজন সহকারী শিক্ষককে চলতি দায়িত্ব দিয়ে চালানো হচ্ছে প্রধান শিক্ষকের কাজ। ফলে বিদ্যালয়ের ক্লাস চলছে মাত্র একজন শিক্ষক দিয়ে।
ঝাউকুটি বিদ্যালয় যেন পুরো জেলার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রতীকী চিত্র। কুড়িগ্রামে প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ স্কুলে নেই প্রধান শিক্ষক। সেই সঙ্গে রয়েছে সহকারী শিক্ষকের সংকটও। এতে ব্যাহত হচ্ছে পাঠদান। খোদ জেলা শিক্ষা কর্মকর্তাদের মতেই জেলাটিতে শিক্ষাব্যবস্থা অনেকটা ভেঙে পড়েছে।
জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা যায়, জেলায় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এক হাজার ২৩৮টি। এগুলোর মধ্যে প্রধান শিক্ষক রয়েছেন মাত্র ৪৯৭ প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। ৭৪১টি বিদ্যালয়ে কোনো প্রধান শিক্ষক নেই। এর মধ্যে ২৩৫টি বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষকদের প্রধান শিক্ষকের চলতি দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। বাকি ৫০৬টি বিদ্যালয় চলছে প্রধান শিক্ষক ছাড়াই।
সবচেয় বেশি সংকট নাগেশ্বরী উপজেলায়। এখানে ১৯৪টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে ৯২টিতে প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য রয়েছে। উলিপুর উপজেলায় ২৬৭ বিদ্যালয়ের মধ্যে ৮৮টিতে প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য রয়েছে। ৩৬টি বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষকরাই প্রধান শিক্ষকের চলতি দায়িত্ব পালন করছেন। কুড়িগ্রাম সদর উপজেলায় ১২৯টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে ৪৯টিতে প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য রয়েছে। ২১টি বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষকরাই প্রধান শিক্ষকের চলতি দায়িত্ব পালন করছেন। চিলমারী উপজেলায় ৯৩টি বিদ্যালয়ের মধ্যে ২৬টিতে প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য রয়েছে। ২টি বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষকরাই প্রধান শিক্ষকের চলতি দায়িত্ব পালন করছেন।
ফুলবাড়ী উপজেলায় ১৪৯টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে ৭২টিতে প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য রয়েছে। ৩৬টি বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষকরাই প্রধান শিক্ষকের চলতি দায়িত্ব পালন করছেন। ভুরুঙ্গামারী উপজেলায় ১১২টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে ৪৯টিতে প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য রয়েছে। ৩১টি বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষকরা প্রধান শিক্ষকের চলতি দায়িত্ব পালন করছেন। রাজারহাট উপজেলায় ১২৩ বিদ্যালয়ের মধ্যে ৪৩টিতে প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য রয়েছে। ২৪টি বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষকরাই প্রধান শিক্ষকের চলতি দায়িত্ব পালন করছেন।
চরাঞ্চলের শিক্ষক সংকটের এই চিত্র আরও বেশি। ব্রহ্মপুত্র নদ দ্বারা বিচ্ছিন্ন উপজেলা রৌমারীতে ১১৪টি বিদ্যালয়ের ৯০টিতে প্রধান শিক্ষক নেই। চলতি দায়িত্বের প্রধান শিক্ষক রয়েছেন ৩০টি বিদ্যালয়ে। চরাঞ্চলের আরেক উপজেলা চর রাজিপুরে ৫৭টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ২৭টিতে প্রধান শিক্ষের পদ শূন্য রয়েছে। শুধু প্রধান শিক্ষকই নয়, ফাঁকা রয়েছে সহকারী শিক্ষকের পদও। জেলায় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মোট ৬ হাজার ১৯১টি সহকারী শিক্ষকের পদের মধ্যে শূন্যপদ রয়েছে ৪৪১টি।
জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা গেছে, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক পদে সরাসরি নিয়োগ হয় ৩৫ শতাংশ। বেশ কয়েক বছর ধরে এ পদে নিয়োগ করা হচ্ছে না। বাকি ৬৫ শতাংশ পদোন্নতির মাধ্যমে হয়ে থাকে। সহকারী শিক্ষকদের প্রধান শিক্ষক পদে পদোন্নতি দেওয়াও বন্ধ রয়েছে। তাই প্রধান শিক্ষকের শূন্যপদ পূরণ করা যাচ্ছে না।
ঝাউকুটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের চলতি দায়িত্বে আছেন সহকারী শিক্ষক রুহুল আমিন। তিনি বলেন, ক্লাসে গেলে প্রশাসনিক কাজ ব্যাহত হয়, আবার প্রশাসনিক কাজ করতে গেলে ক্লাস ব্যাহত হয়। আসলে মানসিক শান্তি না থাকলে দায়িত্বপালনটাও কষ্টকর হয়।’
বিদ্যালয়টির পরিচালনা কমিটির সভাপতি নুর ইসলাম বলেন, শিক্ষক সংকটের কারণে ঠিকমতো ক্লাস হয় না। তাই বাচ্চারা স্কুলে আসা কমিয়ে দিয়েছে। দুজন শিক্ষকের একজন অফিস নিয়ে ব্যস্ত থাকেন। আর একজন কতজনকে পড়াবেন, কয়টা ক্লাস করবেন। চরাঞ্চলের সব স্কুলেরই একই অবস্থা।
জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা শহীদুল ইসলাম জানান, সিনিয়রিটি ও গ্রেডেশন নিয়ে শিক্ষকদের দুটি পক্ষ হাইকোর্টে রিট করেছেন। বিষয়টি আদালতে বিবেচনাধীন থাকায় পদোন্নতি বন্ধ রয়েছে। এটির নিষ্পত্তি কবে নাগাদ হবে, তাও বলা যাচ্ছে না। ফলে সহসাই কাটছে না পদোন্নতির সমস্যা। এ অবস্থায় জেলার প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থা অনেকটা ভেঙে পড়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

