সরকারি চালের কার্ডে প্রতিমন্ত্রী-নেতাদের ভাগ

আরো পড়ুন

সরকারের একটি প্রকল্পের আওতায় অসচ্ছল, বিধবা ও তালাকপ্রাপ্ত নারীদের মাসে ৩০ কেজি করে চাল বিতরণ করা হয়। কুড়িগ্রামের রৌমারীতে এ চাল বিতরণের বরাদ্দকৃত কার্ড প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী, উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান, আওয়ামী লীগ নেতা ও প্রেসক্লাবের নামে ভাগাভাগির অভিযোগ উঠেছে। তা স্বীকার করেছেন উপজেলা চেয়ারম্যান ও আওয়ামী লীগ নেতা।

বিপরীতে প্রকৃত সুবিধাভোগী হওয়ার যোগ্য নারীদের টাকার বিনিময়ে কার্ড নিতে হচ্ছে। কার্ডবঞ্চিত একাধিক অসচ্ছল নারী অর্থ আদায়ের অভিযোগ তুলেছেন। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) বরাবর লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন তিন ইউপি সদস্যও।

‘ভালনারেবল উইমেন বেনিফিট (ভিডব্লিউবি)’ নামে প্রকল্পের ২০২৩-২৪ চক্রে উপজেলার ৬ ইউনিয়নে বরাদ্দকৃত কার্ডের সংখ্যা ৩ হাজার ২৫৩টি। গত ডিসেম্বরে ২৩ শতাংশ (৭৪৮টি) কার্ড প্রতিমন্ত্রী, বীর মুক্তিযোদ্ধা, আওয়ামী লীগ ও স্থানীয় প্রেসক্লাবের নামে ভাগ হয়েছে।

উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ৬ শতাংশ (২০০), ভাইস চেয়ারম্যান ও মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান ৩ শতাংশ করে (১৯০) কার্ড পেয়েছেন। বাকি ৬৫ শতাংশ (২১১৫) কার্ড ভাগ হয়েছে ৬ ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যানদের মাঝে। তাদের (চেয়ারম্যান) কাছ থেকে ভাগে পাওয়া কার্ড স্বজনদের মাঝে বিতরণ করেছেন সাধারণ ও সংরক্ষিত ওয়ার্ডের একাধিক সদস্য।

ভাগাভাগির পর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ইমান আলী, আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আবু হোরায়রা কার্ড পাওয়ার কথা স্বীকার করেছেন। ইমান আলী বলেছেন, ভাগাভাগির বিষয়টি আগে থেকে প্রচলিত। ইউনিয়নের চেয়ারম্যানরা বণ্টন করে থাকেন। এটা কোনো সরকারি নিয়মনীতির মধ্যে পড়ে না। আমি নতুন এসেছি। পরে প্রতিমন্ত্রীর নির্দেশে এভাবে কার্ড বণ্টন হয়েছে।

আবু হোরায়রা বলেছেন, ভাগের ৪২৩টি কার্ড বিতরণ করেছেন নেতা-কর্মীদের মাঝে।

প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী জাকির হোসেন কুড়িগ্রাম-৪ আসনের সংসদ সদস্য। তিনি রৌমারী সদরের বাসিন্দা ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি। কার্ড ভাগাভাগিতে নির্দেশ দেয়ার বিষয়ে জানতে গত পাঁচ দিন মুঠোফোনে প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। সাংবাদিক পরিচয় উল্লেখ করে খুদেবার্তা দিলেও সাড়া দেননি তিনি। এর পর প্রতিমন্ত্রীর ব্যক্তিগত কর্মকর্তা রাশেদুল ইসলামের মাধ্যমে যোগাযোগ করেও প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

মন্ত্রণালয়ের তথ্য কর্মকর্তা মাহবুবুর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ করে প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্য চাওয়া হলেও গতকাল রাত পর্যন্ত তা পাওয়া যায়নি। মাহবুবুর রহমান বলেন, স্যার এলাকায় থাকায় যোগাযোগ করতে পারিনি।

রৌমারীর জনপ্রতিনিধি ও আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের সূত্রে জানা গেছে, এলাকায় প্রতিমন্ত্রীর প্রতিনিধিত্ব করেন তার দুই চাচাতো ভাই মোস্তাফিজুর ও মশিউর রহমান। মোস্তাফিজুর গত সোমবার সন্ধ্যায় বলেন, পারিবারিক কাজে রৌমারীর বাইরে ছিলাম। আমি কার্ড বণ্টন করিনি। সম্ভবত মশিউর করেছে।

মশিউর রহমানের একাধিক মুঠোফোন নম্বরে গতকাল মঙ্গলবার কল করা হলে ভুল ব্যক্তির বা রং নম্বর পরিচয় দেয়।

ভাগাভাগির তালিকায় নাম আছে উপজেলা প্রেসক্লাবেরও। এর সভাপতি সুজাউল ইসলাম বলেছেন, প্রেসক্লাবের নাম ভাঙিয়ে একটি চক্র ভিডব্লিউবির কার্ড ভাগাভাগি করে নিয়েছে। সুষ্ঠু তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া উচিত।

উপজেলায় প্রকল্পটির সদস্যসচিব মহিলাবিষয়ক কর্মকর্তা জেবুন নেছা। তিনি বলেছেন, ভাগাভাগির বিষয়টি জানা নেই।

টাকার বিনিময়ে কার্ড

উপজেলা মহিলাবিষয়ক অধিদফতর সূত্রে জানা গেছে, মোট বরাদ্দকৃত কার্ডের বিপরীতে অনলাইনে আবেদন পড়ে ১২ হাজার ৪০০টি। এর মধ্য থেকে সুবিধাভোগী নির্বাচন করা হবে। তারা একটি কার্ড দিয়ে দুই বছর বিনামূল্যে সরকারি চাল পাবেন।

কার্ড না পাওয়া একাধিক নারী ও তাদের স্বজনরা বলছেন, প্রচারের ঘাটতিতে হতদরিদ্রদের অনেকেই অনলাইনে আবেদন করতে পারেননি। যারা আবেদন করেছেন তাদেরও বাছাইয়ের জন্য কোথাও ডাকা হয়নি। ইউপি চেয়ারম্যান, সদস্যদের কাছে কার্ডের জন্য গেলে টাকা দাবি করা হয়েছে।

বন্দবেড় ইউনিয়নের কুটিরচর গ্রামের রাহিমা বেগম বলেন, তিনি ৯ নম্বর ওয়ার্ডের নারী সদস্যের কাছে সম্প্রতি কার্ডের জন্য গিয়েছিলেন। তখন তার কাছে ৬ হাজার টাকা চাওয়া হয়। সে টাকা নিয়ে গেলে ওই নারী সদস্য আরো তিন হাজার দাবি করেন।

একই ইউনিয়নের পুড়ারচর গ্রামের বসু মিয়া বলেন, তার বোন শারীরিক প্রতিবন্ধী। ৩ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্যের কাছে কার্ডের জন্য গেলে ৭ হাজার টাকা চায়। তখন তিনি বোনের পক্ষে কার্ডের জন্য উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যানের কাছে যান। তাতেও কাজ হয়নি।

বসু মিয়া বলেন, আমরা গরিব মানুষ ভাই। সরকার আমাগোরে দেয় আর মেম্বার, চেয়ারম্যানরা নিয়ে নেয়। কিছু বললে তারা বলেন, আমরা টাকা দিয়ে নির্বাচন করি, এহন টাকা তো নিবই।

দাঁতভাঙ্গা ইউনিয়নের বালুর গ্রামের প্রতিবন্ধী সাদিকুল ইসলামের স্ত্রী হাছনা বানু বলেন, তার স্বামীর আয়-রোজগার নেই। কার্ডের জন্য মেম্বার-চেয়ারম্যানের কাছে ঘুরেও পাত্তা পাননি। দালালের মাধ্যমে তার কাছে ৮ হাজার টাকা চাওয়া হয়। সেই টাকা দিতে না পারায় তালিকায় নামও ওঠেনি।

দাঁতভাঙ্গা ইউপির চেয়ারম্যান এস এম রেজাউল করিম বলেন, যারা টাকা নেয়ার কথা বলছে তারা অনলাইনে আবেদন করছে কি না আমি জানি না। তারা আমার কাছে আসেনি।

প্রকল্পের নীতিমালা অনুযায়ী, ইউনিয়ন পরিষদের সংরক্ষিত নারী সদস্যের সভাপতিত্বে, তৃণমূল পর্যায়ে কমিটির মাধ্যমে যাচাই-বাছাই করে উপকারভোগীদের তালিকা প্রণয়ন করতে হবে। পরে ইউনিয়ন কমিটি সব তালিকা সমন্বয় করে উপজেলা কমিটিতে জমা দেবে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক ইউপি সদস্য বলেছেন, এই নিয়ম কখনো মানা হয়নি।

গত ১ জানুয়ারি ইউএনওর কাছে চেয়ারম্যানের কার্ড বিতরণে অনিয়মের অভিযোগ করেন যাদুরচর ইউনিয়নের ৩ সদস্য। মাহমুদুর রহমান, ময়নাল হক ও নজরুল ইসলাম নামে ইউপি সদস্যরা অভিযোগে উল্লেখ করেন, ইউনিয়নে আসা ৩৫৮টি কার্ড সদস্যদের মাঝে না দিয়ে ব্যক্তিগতভাবে বণ্টন করছেন চেয়ারম্যান। প্রতিবাদ করেও কাজ হয়নি।

এ বিষয়ে চেয়ারম্যান সরবেশ আলী বলেন, যারা অভিযোগ দিয়েছেন তাদের কাছে তালিকা চাওয়া হলেও দেননি। তাই তিনি নিজেই সুবিধাভোগীর নাম দিয়েছেন।

ইউপি চেয়ারম্যানদের নামে ভাগ হওয়া ৬৫ শতাংশ কার্ড সাধারণ সদস্য ও সংরক্ষিত নারী সদস্যের মাঝে বণ্টনের কথা। তবে বন্দবেড় ইউনিয়নের সংরক্ষিত ১ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য রুবি খাতুন বলেন, ভাগ চাইতে গেলে ইউপি চেয়ারম্যান আব্দুল কাদের ধমক দিয়ে থামিয়ে দেন। সংরক্ষিত সদস্যদের মাঝে কার্ড বিতরণের কোনো নীতিমালা নেই বলেও উল্লেখ করেন।

রুবি খাতুন বলেন, নীতিমালা অনুযায়ী ১০০ নামের তালিকা করার এখতিয়ার আছে নারী সদস্যদের। তবে তাকে মাত্র ২০টি নামের তালিকা করার ক্ষমতা দেয়া হয়েছে।

এ বিষয়ে চেয়ারম্যান আব্দুল কাদের বলেন, সংরক্ষিত সদস্যরা ভিডব্লিউবির তালিকা যাচাই-বাছাই কমিটির প্রধান হবেন এমন নিয়ম নেই। জনসংখ্যার অনুপাতে নাম (কার্ড) ভাগ করে দেয়া হয়েছে।

এদিকে কার্ড ভাগে পেয়েও স্বজনদের মাঝে বিতরণের কথা বলেছেন যাদুরচর ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ডের সংরক্ষিত সদস্য রহিতন নেছা। তিনি বলেন, ভাগে ২০টি কার্ড পেয়েছেন। তা নিজের আত্মীয়স্বজনদের নামে দেয়া হয়েছে। তবে কার্ড বিতরণে কারও কাছে থেকে টাকা নেননি।

রৌমারী উপজেলা কৃষক লীগের সভাপতি মতিয়ার রহমান বলেন, নাম দিতে টাকা নেয়ার বিষয়টি ওপেনসিক্রেট। যাচাই-বাছাই ছাড়া টাকার বিনিময়ে যদি নাম দেয়া হয় তাহলে অনলাইনে আবেদনের নামে গরিবের সঙ্গে তামাশা করা হলো কেন?

আরো পড়ুন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

সর্বশেষ