যশোর মাহিদিয়া মহিলা মাদরাসার অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে নানা অনিয়মের প্রমাণ মিলেছে

আরো পড়ুন

যশোর সদর উপজেলার মাহিদিয়া মহিলা মাদরাসার অধ্যক্ষ ফারুক হুসাইনের বিরুদ্ধে নানা অনিয়মের প্রমাণ মিলেছে।

তদন্তে জানা গেছে, মাদরাসাটিতে বিজ্ঞান বিভাগ না থাকলেও এমপিওভুক্তির পর টাকা নিয়ে অবৈধভাবে শিক্ষক নিয়োগ দিয়েছেন অধ্যক্ষ। উপাধ্যক্ষ থাকলেও নীতিমালা না মেনে ওই পদে আরেকজনকে নিয়োগ দিয়েছেন। উপজেলা শিক্ষা অফিসার এম কামরুজ্জামান জাহাঙ্গীরের সঙ্গে মিলে আগে থেকে কর্মরতদের বাদ দিয়ে নতুন শিক্ষক এনে এমপিওভুক্ত করিয়েছেন তিনি। কামরুজ্জামানের বিরুদ্ধে এমন একাধিক অভিযোগ থাকলেও তাকে শুধু বদলি করা হয়েছে। মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদফতরের একজন উপপরিচালককে ম্যানেজ করে শাস্তি থেকে রেহাই পাচ্ছেন, এমন কথা চাউর রয়েছে শিক্ষা প্রশাসনের সর্বত্র।

জানা গেছে, মহিলা মাদরাসার শিক্ষক মাহাবুবুর জামান গত ১১ সেপ্টেম্বর অধ্যক্ষ ফারুক হুসাইনের বিরুদ্ধে যশোর সদরের উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসে অভিযোগ দায়ের করেন। অভিযোগের প্রেক্ষিতে পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। ওই কমিটি অক্টোবরের ১২ তারিখ তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয়।

তদন্ত কর্মকর্তারা ছিলেন- উপজেলা একাডেমিক সুপারভাইজার এস এম আশিক আহমেদ, সহকারী উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার এস এম বজলুর রশীদ, জীরাট আলিম মাদরাসার অধ্যক্ষ আবু জাফর, মুনশী মেহের উল্লাহ একাডেমির প্রধান শিক্ষক আবু কালাম, ছাতিয়ানতলা চুড়ামনকাটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ফজলুর রহমান।

অভিযোগে বলা হয়, ২০২০ খ্রিষ্টাব্দের মে মাসে মাদরাসাটি এমপিও ঘোষণা করা হয়। তখন ওই প্রতিষ্ঠানে যারা আগে থেকে শিক্ষকতা করে আসছেন তাদের বাদ দিয়ে অন্য শিক্ষকদের এনে এমপিওভুক্ত করান অধ্যক্ষ ফারুক হুসাইন। উপজেলা শিক্ষা অফিসার এম কামরুজ্জামান জাহাঙ্গীরের সঙ্গে তিনি ওই শিক্ষকদের এমপিওভুক্ত করান। মাদরাসাটির দাখিল পর্যায়ে সহ-সুপার ছিলেন নুর ইসলাম। বিধিমতে তার ভাইস প্রিন্সিপাল হওয়ার কথা। কিন্তু সেই জায়গায় আব্দুল মালেক নামে একজনকে ভাইস প্রিন্সিপাল করেন অধ্যক্ষ ফারুক হুসাইন। আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে দুর্নীতি ও অনিয়ম করে এ নিয়োগ হয়।

অভিযোগে আরো বলা হয়, চারজন শিক্ষকের পদে সার্টিফিকেট ও নিবন্ধন না থাকলেও তাদের আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। চারজনের মধ্যে মোস্তাক আহম্মেদ অনার্স-মাস্টার্স করেছেন ইংরেজি বিষয়ে। কিন্তু তাকে রসায়ন বিজ্ঞান বিষয়ে এমপিও ভুক্ত করা হয়। তার নিবন্ধন নেই এবং তিনি কোনো প্রতিষ্ঠানে কোনোদিন চাকরিও করেননি। ১০-১২ লাখ টাকা ঘুষের বিনিময়ে তার নিয়োগ হয়। অপর শিক্ষক আব্দুল কাইয়ুম ডিগ্রি করেছে মানবিক বিভাগে। তিনি উদ্ভিদ বিজ্ঞান বিষয়ের শিক্ষক হিসেবে এমপিওভুক্ত হয়েছেন। তারও নিবন্ধন নেই। উপরন্তু শিক্ষকতার প্রয়োজনীয় অভিজ্ঞতাও নেই।

মাসুম পারভেজ নামে একজন সমাজকর্মে অনার্স-মাস্টার্স করলেও পদার্থ বিজ্ঞানের শিক্ষক হিসেবে এমপিওভুক্ত হয়েছেন। তারও নিবন্ধনও নেই। আলিম পাস আসমা খাতুন আমেনা সহকারী মৌলভী পদে চাকরি করছেন সার্টিফিকেট, নিবন্ধন ও অভিজ্ঞতা ছাড়াই। এছাড়াও তরিকুল ইসলাম গণিত বিষয়ে এমপিওভুক্ত হয়েছেন। যদিও এইচএসসি বা আলিম পর্যায়ে গণিত বিষয় শিক্ষক প্যাটার্নে নেই এবং যদি কেউ বিজ্ঞান বিভাগে শিক্ষক হযন তাহলে তাকে উচ্চতর গণিত দেখাতে হয়। কিন্তু মাদরাসায় উচ্চতর গণিতের কোনো বিষয় নেই এবং তার নিবন্ধনও নেই।

শারমিন আক্তার নামের আরেকজন রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিষয়ে এমপিওভুক্ত হয়েছেন। তিনিও নিবন্ধন ছাড়া। কোনো প্রতিষ্ঠানে ছিলেন না। কিন্তু রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের মাহাবুবুর জামান দীর্ঘ ৭ বছর ৬ মাস ধরে প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকতা করলেও তাকে এমপিওভুক্ত করানো হয়নি। আরেক শিক্ষক মহিবুল আল মামুনেরও নিবন্ধন নেই। তিনি প্রতিষ্ঠানে কখনও শিক্ষকতা করেননি। তিনি ইংরেজি প্রভাষক হিসেবে নিয়োগ পান। অন্য শিক্ষক আমিনুর রহমান তপসিডাঙ্গা মাদরাসায় ইবতেদায়ী প্রধান থাকা অবস্থায় মাহিদিয়া আলিম মাদরাসার আরবি প্রভাষক হিসেবে এমপিওভুক্ত হন। যা ৩ মাস আগে তার সেখানে লিখিত কোনো অব্যাহতিপত্র দেননি, তার নিবন্ধনও নেই। এছাড়া মোজাম্মেল হোসেন নামে শিক্ষককে অধ্যক্ষ ফারুক হুসাইন ৪ বছর ছুটি দেন। তিনি একটি এনজিওতে চাকরি করেছেন এবং ওই প্রতিষ্ঠান থেকে তিনি বিলও তুলেছেন। যা এমপিও নীতিমালার পরিপন্থি।

অভিযোগে আরো বলা হয়েছে, এর আগে অধ্যক্ষ ফারুক হুসাইনের দুর্নীতির কারণে বাঘারপাড়া বলরামপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের এমপিওভুক্তি বাতিল হয়েছিলো।

তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ২ অক্টোবর তদন্তকারীরা অধ্যক্ষ ফারুক হুসাইনকে তার পক্ষের তথ্য-প্রমাণসহ উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসে উপস্থিত হতে বলেন। কিন্তু তিনি উপস্থিত না হওয়ায় তাকে কারণ ব্যাখ্যা করতে বলা হয়। পরবর্তীতে পুনরায় ৬ অক্টোবর সরেজমিনে তদন্তের দিন ধার্য করা হয়। ওই দিন তদন্ত কমিটি প্রতিষ্ঠানে সরেজমিনে তদন্ত করতে যায়। কিন্তু সেখানে উপাধ্যক্ষ আব্দুল মালেক ছাড়া আর কেউ উপস্থিত ছিলেন না। উপাধ্যক্ষ আব্দুল মালেক তার লিখিত বক্তব্যে জানান, অধ্যক্ষ ফারুক হুসাইন ঢাকা থেকে তাকে ফোনে তদন্ত কমিটি আসবে জানিয়ে মাদরাসায় উপস্থিত থাকতে বলেন। কিন্তু মাদরাসার কোনো কাগজপত্র তার কাছে দিয়ে যাননি। আলমারির চাবি তার কাছে না থাকায় তদন্ত কাজে সহযোগিতাও করতে পারেননি। পরে ১২ অক্টোবর সরেজমিনে আবার তদন্ত করতে মাদরাসায় উপস্থিত হন তদন্তকারীরা। তখন অধ্যক্ষ ফারুক হুসাইন লিখিতভাবে জানান, অভিযোগকারী শিক্ষক মাহাবুবুর জামান অভিযোগ প্রত্যাহার করে নিয়েছেন। সেজন্য তিনি তদন্ত কমিটির কাছে কোনো প্রমাণ বা কাগজপত্র দেখাতে চান না।

তদন্ত কর্মকর্তারা প্রতিবেদনে আরো উল্লেখ করেন, মাহিদিয়া মহিলা আলিম মাদরাসার বিজ্ঞান বিভাগের কোনো শিক্ষার্থী উপজেলার আমিনিয়া কামিল মাদরাসা কেন্দ্রে বিজ্ঞান বিভাগে পরীক্ষা দেয় কিনা জানতে চান তারা। আমিনিয়া কামিল মাদরাসার অধ্যক্ষ তদন্তকারীদের জানান, তার কেন্দ্রে একমাত্র আমিনিয়া কামিল মাদরাসার বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থীরা আলিম পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেন। এছাড়া মাহিদিয়া মহিলা আলিম মাদরাসার এমপিও শিটে আলিম পর্যায়ে বিজ্ঞান বিভাগে চারজন শিক্ষকের নাম পাওয়া যায়। কিন্তু পরীক্ষা কেন্দ্রে তদন্ত করে ওই মাদরাসার কোনো বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী পাওয়া যায়নি।

তদন্ত কর্মকর্তারা প্রতিবেদনে উল্লেখ করেন, অধ্যক্ষ ফারুক হুসাইন তদন্ত কাজে কোনো সাহায্য করেননি। কোনো তথ্য-প্রমাণ তদন্ত কমিটিকে দেখাননি। এতে প্রতীয়মান হয়, তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ সত্য।

আরো পড়ুন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

সর্বশেষ