করোনাভাইরাসের অভিঘাত ও ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের প্রভাবে দেশের উন্নয়নের গতি অনেকটা শ্লথ হয়ে গেছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। নিজেদের সম্পদ-মাটি-মানুষ দিয়েই এই সংকটকালে দেশকে সুরক্ষিত রাখার প্রত্যয় জানিয়ে খাদ্য উৎপাদনে মনোযোগী হওয়ার আহবান রাখেন সরকারপ্রধান।
চট্টগ্রামের পতেঙ্গায় নেভাল এভিয়েশন হ্যাঙ্গারে রবিবার সকালে দেশের সমুদ্রসীমা সুরক্ষায় নৌবাহিনীর নেভাল এভিয়েশনে মেরিটাইম পেট্রল এয়ারক্রাফট (এমপিএ) সংযোজন অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন।
গণভবন প্রান্ত থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে যুক্ত ছিলেন সরকারপ্রধান।
বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশে উন্নীত হওয়ার প্রসঙ্গটি সামনে এনে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ইতোমধ্যে আমরা খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করেছি। তবে দুর্ভাগ্য হলো, এই করোনাভাইরাসের অভিঘাত পাশাপাশি ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের কারণে আমাদের উন্নয়নের গতিটা অনেকটা শ্লথ হয়ে গেছে। শুধু আমরা না, সারা বিশ্বব্যাপী উন্নত দেশগুলো এখন হিমশিম খাচ্ছে। সেই অবস্থার মধ্য দিয়ে আমাদের চলতে হচ্ছে। তবে, আমরা আমাদের সম্পদ দিয়ে, নিজেদের মাটি-মানুষ দিয়েই এই দেশকে সুরক্ষিত রাখব। যার যেখানে যতটুকু সুযোগ আছে, আমাদের খাদ্য উৎপাদনে মনোযোগী হতে হবে।
শেখ হাসিনা বলেন, আমরা যে উন্নয়নের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি, যদিও হয়তো কিছুটা আন্তর্জাতিকভাবে অর্থনৈতিক মন্দা দেখা দেয়ার প্রভাব আমাদের ওপর পড়েছে। কিন্তু আমাদের চেষ্টা করতে হবে যে এর থেকে যেন আমরা নিজেরা মুক্ত থাকতে পারি।
নৌবাহিনীর বহরে নতুন করে দুটি মেরিটাইম পেট্রল এয়ারক্রাফট (এমপিএ) সংযোজন প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এ দুটি এমপিএ সংযোজনের ফলে নেভাল এভিয়েশনের ক্ষমতা অনেক বৃদ্ধি পাবে বলে আমি বিশ্বাস করি। এই যে সমুদ্রসীমা- এর সুরক্ষা দেয়ার জন্য অতি দ্রুত ব্যবস্থা নিতে পারবে। আমাদের যে জলসীমা, বিশেষ করে যে সমুদ্র সম্পদ, আমাদের অর্থনীতিতে যাতে ব্যবহার করতে পারি এটাই হচ্ছে আমাদের লক্ষ্য।
ঝড়, জলোচ্ছ্বাস, প্রাকৃতিক দুর্যোগে দ্বীপাঞ্চল থেকে উপকূল এবং সমুদ্রসীমা সুরক্ষায় সব সময় সবাইকে সজাগ থাকার আহবান জানান প্রধানমন্ত্রী।
টানা তিন মেয়াদের সরকারপ্রধান বলেন, আমরা শান্তি চাই, যুদ্ধ চাই না। কিন্তু বহিঃশত্রুর আক্রমণ থেকে দেশকে রক্ষার জন্য আমাদের সক্ষমতা অর্জন করতে হবে। যাতে আমাদের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব আমরা সব সময় ধরে রাখতে পারি। সেদিকে লক্ষ্য রেখেই আমরা প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকে তৈরি করছি, উপযুক্ত করছি।
জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭৪ সালে প্রতিরক্ষা নীতিমালা তৈরি করে গেলেও, তাকে নির্মমভাবে হত্যার ২১ বছর পর্যন্ত এই নীতিমালা নিয়ে কোনো কাজ হয়নি বলে জানান তার কন্যা।
তিনি বলেন, আমি দ্বিতীয়বার সরকারে এসে পদক্ষেপ নিই। এর ভিত্তিতে ১৯৭৪ সালের প্রতিরক্ষা নীতির ভিত্তিতেই ফোর্সেস গোল ২০৩০ প্রণয়ন করে তা বাস্তবায়ন শুরু করেছি। যাতে আমাদের প্রতিটি প্রতিষ্ঠানই শক্তিশালী হয়।
নৌবাহিনীতে উল্লেখযোগ্য আধুনিক যুদ্ধজাহাজ, হেলিকপ্টার, মেরিটাইম পেট্রল এয়ারক্রাফট এবং সাবমেরিনসহ আধুনিক যুদ্ধ সরঞ্জাম ও প্রযুক্তি সংযোজন করা হয়েছে বলেও জানান প্রধানমন্ত্রী।
তিনি বলেন, সমুদ্রের তলদেশ থেকে শুরু করে সমুদ্র এবং সবই যেন সুরিক্ষত থাকে সেদিকে বিশেষ দৃষ্টি দিয়ে আমাদের নৌবাহিনীকে ত্রিমাত্রিক বাহিনী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছি।
নৌবাহিনী লোকচক্ষুর আড়ালে থেকে প্রাকৃতিক প্রতিকূলতা মোকাবিলা করে সমুদ্র এলাকার সার্বিক নিরাপত্তা বিধান করছে বলেও জানান প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, যা প্রশংসার দাবি রাখে। শুধু তাই না, আমাদের বন্যার সময় উদ্ধার কাজেও…বিভিন্ন সময় আমাদের লঞ্চডুবি হয়, নানা ধরনের দুর্ঘটনা হয়, দুর্ঘটনা বা প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় নৌবাহিনীর সদস্যরা ভূমিকা রাখে। সেজন্য আমি তাদের আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই।
নৌবাহিনীতে সংযোজন হলো আরো দুটি মেরিটাইম পেট্রল এয়ারক্রাফট (এমপিএ)। গণভবন প্রান্ত থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে নৌবাহিনীর রীতি অনুযায়ী এগুলোর নামফলক উন্মোচন করেন সরকারপ্রধান।
এর আগে ২০১৩ সালে প্রথমবারের মতো নেভাল এভিয়েশনে দুটি মেরিটাইম পেট্রল এয়ারক্রাফট নেভাল এভিয়েশনে সংযোজন করেন প্রধানমন্ত্রী। এর মধ্য দিয়ে নৌবাহিনীর নেভাল এভিয়েশন এমপিএ স্কোয়াড্রনে মোট চারটি মেরিটাইম প্যাট্রোল এয়ারক্রাফট অপারেশনাল কার্যক্রম শুরু করল।
আধুনিক সেন্সর ও মিশন ইক্যুইপমেন্ট সম্বলিত নতুন দুটি ডর্নিয়ার ২২৮ এনজি মেরিটাইম পেট্রল এয়ারক্রাফট ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ২২৩ নটিক্যাল মাইল বেগে চলতে সক্ষম। নব সংযোজিত এমপিএ দুটি প্রায় ৫ ঘণ্টা একনাগাড়ে উড্ডয়নের মাধ্যমে সম্পূর্ণ এক্সক্লুসিভ ইকনোমিক জোন সহজেই নজরদারি করতে পারবে।
এ দুটি এয়ারক্রাফটের মাধ্যমে গভীর সমুদ্রে নজরদারিতে যুক্ত রয়েছে সার্ভেইল্যান্স রাডার, ইলেক্ট্রা অপটিক ইনফ্রারেড ক্যামেরা, ট্যাকটিক্যাল ডেটা লিঙ্ক ও সার্চ অ্যান্ড রেসকিউ ডিটেকশন ফাইন্ডার।
এছাড়া আধুনিক প্রযুক্তির মিশন ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম এবং জাহাজ ও সাবমেরিনের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপনকারী আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থা রয়েছে এমপিএ দুটিতে। এমপিএ দুটি কমান্ড প্ল্যাটফর্ম হিসেবে দেশের সমুদ্রসীমার সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ, সুনীল অর্থনীতির সুরক্ষায় যে কোনো ধরনের অবৈধ অনুপ্রবেশ প্রতিহত করতে কার্যকর ভূমিকা পালন করবে।
এর আগে গণভবন প্রান্ত থেকে ভিডিও কনফারেন্সে প্রধানমন্ত্রী যুক্ত হলে তাকে স্বাগত জানান নৌবাহিনী প্রধান এডমিরাল এম শাহীন ইকবাল। এসময় নেভাল এভিয়েশনের একটি চৌকস দল প্রধানমন্ত্রীকে গার্ড অফ অনার প্রদান করে।
অনুষ্ঠানে অন্যান্যের মধ্যে নৌ সদর দফতরের পিএসও, চট্টগ্রামসহ অন্যান্য নৌ অঞ্চলের আঞ্চলিক কমান্ডার, মুক্তিযোদ্ধা নৌ কমান্ডোসহ বিশিষ্টজনরা এবং ঊর্ধ্বতন সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

