হলের খাবারের সমস্যার সমাধান, সিট বাতিলের হুমকি বন্ধ করা, রান্নার সরঞ্জামাদি ব্যবহারের নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়াসহ ১১ দফা দাবিতে মধ্যরাতে বিক্ষোভ করেছেন খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের (খুবি) ছাত্রীরা।
মঙ্গলবার (১৬ আগস্ট) রাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাজিতা হলের আবাসিক ছাত্রীরা হলের তালা ভেঙে আন্দোলন শুরু করেন।
জানা যায়, ছাত্রীদের সঙ্গে বিভিন্ন সময় হল কর্তৃপক্ষের বাজে আচরণ, রান্নার সরঞ্জামাদি জব্দ করার প্রতিবাদসহ ১১ দফা দাবিকে সামনে রেখে আন্দোলন করেন তারা।
মঙ্গলবার রাত সাড়ে ১০টার দিকে অপরাজিতা হলের ছাত্রীরা প্রথমে হলের ভেতরের তালা ভেঙে বাইরে আসেন। পরবর্তীতে হলের গেট খুলে হলের সামনে অবস্থান নেয় এবং আন্দোলন শুরু করেন। এদিকে রাত ১২টা ১৫ নাগাদ বিশ্ববিদ্যালয়ের বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব হলের ছাত্রীরাও হলের তালা ভেঙে এ আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেন।
আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, হলের প্রভোস্ট, সহকারী প্রভোস্ট ছাত্রীদের সঙ্গে বিভিন্ন ইস্যু নিয়ে সিট বাতিলসহ নানা হুমকি ধামকি দিয়ে আসছে। মঙ্গলবার এক ছাত্রী অপরাজিতা হলে বটি দিয়ে গলা কাটার চেষ্টা করলে হাসপাতালে নিয়ে গেলে বেঁচে যান তিনি। এ পরিস্থিতিতে ছাত্রীদের রান্না করার সরঞ্জাম জব্দ করার নিদের্শ দেয় অপরাজিতা হল কর্তৃপক্ষ। বৈদ্যুতিক সরঞ্জামসহ, রাইস কুকার, হিটার এগুলো না সরালে যার রুমে এগুলো পাওয়া যাবে তার সিট বাতিল হয়ে যাবে বলে জানায় কর্তৃপক্ষ।
আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা জানান, কিছু দিন আগে ফেসবুকে মন্তব্য করাকে কেন্দ্র করে এক ছাত্রীকে ৪৫ মিনিট ধরে ধমক দেয়া এবং তাকে শাসায় অপরাজিতা হলের এক সহকারী প্রভোস্ট। এছাড়াও বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে জানালে সমস্যা সমাধান না করে উল্টো তাদের শাসানো হয়।
আন্দোলনরত ছাত্রীরা অভিযোগ করে জানান, সহকারী প্রভোস্ট ছাত্রীদের হুমকি দিয়ে বলে, হল তোমাদের সুযোগ, অধিকার নয়। যার সমস্যা সে হল থেকে নেমে যাও।
এসময় আন্দোলনরত ছাত্রীরা এসময় স্লোগান দিয়ে বলেন, ‘হল আমাদের সুযোগ না, অধিকার অধিকার’, ‘প্রশাসনের প্রহসন, জবাব চাই জবাব চাই’, ‘আমাদের দাবি মানতে হবে।’
আন্দোলন চলাকালে রাত ১০টা ৫০ মিনিটে আন্দোলনরত ছাত্রীদের সঙ্গে কথা বলতে ঘটনাস্থলে আসেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র বিষয়ক পরিচালক অধ্যাপক মো. শরীফ হাসান লিমন। তিনি কথা বলতে আসলে শিক্ষার্থীরা জানিয়ে দেয়, প্রভোস্টের লিখিত বক্তব্য ছাড়া তারা আন্দোলন প্রত্যাহার করবেন না।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র বিষয়ক পরিচালক অধ্যাপক শরীফ হাসান লিমন বলেন, আজকে যেহেতু একটি অনভিপ্রেত ঘটনা (আত্মহত্যার চেষ্টা) ঘটেছে, তার পরিপ্রেক্ষিতে হল কর্তৃপক্ষ এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আশাকরি প্রভোস্ট বডি আসলে সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে।
রাত ১১টা ৪০ এ ঘটনাস্থলে প্রভোস্ট বডি উপস্থিত হয়ে পরিবেশ পরিস্থিতি শান্ত করার চেষ্টা করেন। কিন্তু শিক্ষার্থীরা তাদের ১১ দফা দাবি না মানা পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেন। পরে রাত ১টা নাগাদ আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের হাদি চত্বরে অবস্থান নিলে এসময় ছাত্রীদের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষার্থীরাও যোগ দেন। এসময় তারা হল কর্তৃপক্ষের প্রহসনমূলক আচরণের প্রতিবাদ জানান এবং ১১ দফা মেনে নেওয়ার দাবিতে স্লোগান দিতে থাকেন।
আন্দোলনের তোপের মুখে রাত ১টা ৫০ নাগাদ শিক্ষার্থীদের সকল দাবি মেনে নেয় হল কর্তৃপক্ষ এবং লিখিত নথিতে স্বাক্ষর করেন। এ সময় অপরাজিতা হলের প্রভোস্ট অধ্যাপক রহিমা নুসরাত রিম্মি বলেন, তোমাদের ১১ দফা সকল দাবি মেনে নিচ্ছি।
কারও সঙ্গে হলের কেউ খারাপ আচরণ করলে প্রভোস্ট বডির পক্ষ থেকে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের কাছে ক্ষমা চান তিনি।
এ সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের বঙ্গমাতা হলের প্রভোস্ট অধ্যাপক ড. সালমা বেগম বলেন, ভবিষ্যতে হলের যেকোনো সিদ্ধান্ত নিলে শিক্ষার্থীদের মতামতকে প্রাধান্য দেয়া হবে।
এদিকে দাবি মেনে নেয়ার পর রাত ২টা ০৮ মিনিটে আন্দোলন স্থগিত ঘোষণা করেন শিক্ষার্থীরা। শিক্ষার্থীদের ১১ দফা দাবিসমূহ- ১. রাইস কুকার ও রান্নার সরঞ্জামাদি ব্যবহারের নিষেধাজ্ঞা তুলে নিতে হবে, ২. যৌন হয়রানির প্রতিবাদে সোশ্যাল মিডিয়ায় কথা বলার কারণে ব্যক্তিগত আক্রমণ ও পারিবারিক শিক্ষা তুলে কথা বলায় ক্ষমা চাইতে হবে, ৩. হলে প্রয়োজনে অভিভাবক ও মহিলা আত্মীয়দের থাকার অনুমতি দিতে হবে, ৪. পানির পোকার ও খাবারের সমস্যার স্থায়ী সমাধান করতে হবে, ৫. প্রভোস্ট তার নিজ ডিসিপ্লিনের স্টুডেটদেনকে ডেকে ব্যক্তিগত বিষয় এবং একাডেমিক বিষয়ে হয়রানি বন্ধ করতে হবে ও ক্ষমা চাইতে হবে, ৬. হলের কমকর্তা ও কমারীদের দুর্বব্যহার বন্ধ করতে হবে, ৭. যেকোনো পরিস্থিতিতে সিট বাতিলের হুমকি দেয়া বন্ধ করতে হবে, ৮. যেকোনো পরিস্থিতিতে হলের ছাত্রীদের মতামতকে প্রাধান্য দিতে হবে, ৯. আজকের ঘটনাকে কেন্দ্র করে কোনো শিক্ষার্থীকে ব্যক্তিগতভাবে হুমকি দেয়া যাবে না, ১০. হলের মিল খাওয়া বাধ্যতামূলক করা যাবে না এবং ১১. এ দাবিগুলো না মানলে প্রভোস্ট কমিটির পদত্যাগ করতে হবে।

