দেশের অন্যতম মৎস্যপল্লী খ্যাত যশোরের চাঁচড়া। দেশে মোট চাহিদার ৫০ শতাংশ রেণুপোনা উৎপাদন হয় এখান থেকে। এখানে প্রতি সপ্তাহে অন্তত ১০ প্রজাতির চার থেকে পাঁচ হাজার কেজি রেণুপোনা উৎপাদন করেন শতাধিক চাষি। দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে ক্রেতা আসায় প্রতিদিন ৩০ লাখ টাকার বেঁচাকেনা হয় বলে জানান সংশ্লিষ্টরা। তারা আশা করছেন, পদ্মা সেতু চালু হলে বাড়বে ব্যবসার পরিধি, আমুল পরিবর্তন আসবে মৎস্যপল্লীতে। লাভবান হবেন মৎস্যচাষি, ব্যবসায়ী, শ্রমিকসহ সবাই। কমে যাবে ফেরিঘাটে আটকে থাকার ভোগান্তি, রক্ষা মিলবে সিন্ডকেট আর চাঁদাবাজির হাত থেকে। বাড়বে সরকারের রাজস্বও। তাই সেতু উদ্বোধনের প্রহর গুনছেন এই যশোর অঞ্চলের প্রায় পাঁচ হাজার মৎস্যচাষি। এদিকে, দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্ব ভুমিকা রাখছে যশোরের ফুল। দেশে ফুলের মোট চাহিদার ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ পূরণ করেন ঝিকরগাছা ও শার্শার ফুল চাষিরা। কিন্তু পরিবহন ব্যবস্থার অভাবের কারণে অনেক সময় ফুল পঁচে বড় ধরনের ক্ষতির সম্মুখীন হতে হয়। তবে পদ্মা সেতু চালুর খবরে আনন্দের ঢেউ বইছে এই অঞ্চলের ফুলচাষিদের মাঝেও।
যশোর জেলা মৎস্য হ্যাচারি মালিক সমিতির সভাপতি ফিরোজ খান বলেন, চাহিদার ৫০ শতাংশর বেশি রেণু-পোনা উৎপাদন হয় যশোরে। পরিবহনের দেরির কারণে ৩০ শতাংশ পোনা মারা যেত। পদ্মা সেতু চালু হলে আমরা স্বল্প সময়ে পোনা নির্দিষ্ট স্থানে পৌঁছাতে পারব। এতে আমাদের ব্যবসা দ্বিগুণ হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। আমরা যারা দীর্ঘদিন ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছি তারা ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে পারব। যশোরে মৎস্য খাতেও ব্যাপক পরিবর্তন হবে। এ খাতের আরও প্রসার হবে।
নজরুল ইসলাম নামে এক রেণু পোনা ব্যবসায়ী বলেন, পদ্মাসেতু চালু হলে চাঁচড়া মৎস্যপল্লীতে বৃদ্ধি পাবে মাছের পরিমাণ। বাইরের জেলা থেকে এই জেলায় অর্থাৎ বরগুনা বরিশালের পোনা মাছ সহজে আসবে; আবার যশোরের বিভিন্ন পোনা মাছ খুলনাসহ ঢাকা-বরিশাল চট্টগ্রামেও যাবে।
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি আরো বলেন, অনেক সময় যশোর থেকে রেনূপোনা ঢাকায় নিতে ফেরিঘাটে জ্যামে আটকে থাকতে হতো। এতে পানি গরম হওয়ার ফলে পোনা মারাযেত। এমন বিড়ম্বনায় বেশির ভাগ ব্যবসায়ীই পড়েছেন। এজন্য যশোরের পোনার মান ভালো হলেও অন্য জেলার ব্যবসায়ীরা নিতে আসতে চান না। এবার পদ্মাসেতু চালু হলে এই সমস্যা থাকবে না। কয়েক ঘন্টায় পদ্মা সেতু পাড়ি দিয়ে নির্দিষ্ট সময় ও স্থানে সহজে রেনূপোনা সরবরাহ করতে পারবো। সেই সাথে খরচও কমবে; একই সাথে আমাদের ব্যবসার পরিধিও বাড়বে।
এদিকে, বাংলাদেশে ফুল উৎপাদনের জন্য বিখ্যাত এলাকা যশোরের ঝিকরগাছা উপজেলা। সেখানে গদখালীতে উৎপাদিত ফুল দেশের অর্ধেকের বেশি চাহিদা মেটায়। কিন্তু পরিবহন ব্যবস্থার কারণে অনেক সময় ফুল পঁচে বড় ধরনের ক্ষতির সম্মুখীন হন চাষি ও ব্যবসায়ীরা। এখন পদ্মা সেতু চালুর খবরে উচ্চসিত এ অঞ্চলের ফুল চাষিরা। তারা বলছেন, এখন আর ফেরিঘাটে আটকা পড়ে তাদের ফুল নষ্ট হবেনা। সকালে ফুল তুলে বাসে বা ট্রাকে তারা সেই ফুল ঢাকা-চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় পাঠাতে পারবেন। ভাল ফুল পাঠাতে পারলে ভাল দামও পাবেন।
গদখালীর ফুলচাষি মঞ্জরুল ইসলাম বলেন, পদ্মা সেতু চালু হলে ক্রেতা বেশি আসবে। আমরা ফুলের দাম বেশি পাব। এখন যেখানে প্রতি পিস ফুল ৫ টাকা বিক্রি হয়, সেতু চালু হলে সেখানে আমরা হয়তো ৭ টাকা বিক্রি করতে পারব। পদ্মা সেতু চালু হলে আগে লাগতো ১০ ঘণ্টা এখন ৪ ঘণ্টায় ফুল যাবে। এ সেতুতে আমাদের ভাগ্যের পরিবর্তন হবে বলে আশা করছি। গদখালীর ফুলচাষি ও বাংলাদেশ ফ্লাওয়ার সোসাইটির সভাপতি আব্দুর রহিম বলেন, দেশের চাহিদার শতকরা ৬০ থেকে ৭০ ভাগ ফুল যশোর থেকে সরবরাহ করা হয়ে থাকে। যশোরে ফুলচাষি রয়েছেন প্রায় ৬ হাজার। তারা অন্তত ১৫শ’ হেক্টর জমিতে বিভিন্ন প্রকার ফুল চাষ করেন। সারা দেশে এখানকার ফুলের চাহিদা থাকলেও পরিবহন ব্যবস্থার সমস্যার কারণে আমরা ক্ষতিগ্রস্ত হই। অনেক সময় ঘাটে (দৌলতদিয়া) যানজটের কারণে ফুল নষ্ট হয়ে যায়। পদ্মা সেতু হলে এই সমস্যা থাকবে না। খুব কম সময়ে আমরা ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলায় ফুল পাঠাতে পারব। দ্রুত ফুল পাঠাতে পারলে ফুলটাও ভালো থাকবে। এতে দামটাও বেশি পাওয়া যাবে। ফুল বিদেশে রফতানি সহজ হবে। এতে ফুল চাষিরাও উপকৃত হবেন।

