জাগো বাংলাদেশ : স্বাধীনতার ৫১ বছর পার হয়ে গেলেও সংরক্ষণ করা হয়নি মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচিহ্ন মাদারীপুরের ১৫টি বধ্যভূমি। দিন দিন অযত্ন আর অবহেলায় হারিয়ে যেতে বসেছে মহান মুক্তিযুদ্ধের এই স্মৃতি। ভয়াল গণহত্যার সাক্ষী বধ্যভূমিগুলো সংরক্ষণ না করায় সেগুলো পরিণত হয়েছে গোচারণ ভূমিতে। দ্রুত এই বধ্যভূমিগুলো সংরক্ষণ না করা গেলে কালের বিবর্তনে হারিয়ে যাবে এসব চিহ্ন।
মুক্তিযুদ্ধের সময় মাদারীপুরের বিভিন্ন জায়গায় ছোট বড় মিলে রয়েছে ১৫টি বধ্যভূমি। যুদ্ধের শুরু থেকে ১০ ডিসেম্বর পর্যন্ত জেলার বিভিন্ন জায়গায় হত্যাযজ্ঞ চালিয়ে অসংখ্য সাধারণ মানুষ ও বীর মুক্তিযোদ্ধাকে হত্যার পরে মাটিচাপা দেওয়া হয় বধ্যভূমিগুলোতে। এর মধ্যে ১টি বধ্যভূমিও সংরক্ষণ করা হয়নি। ফলে দিন দিন অবহেলা আর অযত্নে দখল হয়ে যাচ্ছে বধ্যভূমি।
স্থানীয় বীর মুক্তিযোদ্ধারা জানান, মাদারীপুরের সদর উপজেলায় ৭টি এবং রাজৈর উপজেলায় রয়েছে ৮টি বধ্যভূমি। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন বধ্যভূমির মধ্যে মাদারীপুর সদর উপজেলার ইটেরপোল এলাকার এ আর হাওলাদার জুট মিলের ভেতরে রয়েছে জেলার সবচেয়ে বড় বধ্যভূমি। এই বধ্যভূমিতে মুক্তিযুদ্ধের সময় মিলের ডি টাইপ বিল্ডিংয়ের কয়েকটি টর্চার সেলে প্রায় ৭০০ মানুষকে মাসের পর মাস নির্যাতন করে হত্যার পর মাটিচাপা দেয় পাকিস্তানিরা।
কেন্দুয়া ইউনিয়নের পূর্ব কলাগাছিয়া সুষেন হালদারের বাড়ির পুকুর পাড়ের বধ্যভূমি, একই ইউনিয়নের বাহাদুরপুর গ্রামের তারাপদ শিকারি বাড়ির পুকুর পাড়ের বধ্যভূমি, দুধখালী ইউনিয়নের মিঠাপুর শিকদার বাড়ি বধ্যভূমি, একই ইউনিয়নের মিঠাপুর গোপী ঠাকুরের বাড়ির পেছনের বধ্যভূমি, কেন্দুয়া ইউনিয়নের চৌহদ্দি হাটখোলা বধ্যভূমি ও মাদারীপুর পৌরসভার কুলপদ্বী সাবেক সরকারি শিশু সদন ভবনের পূর্ব পাশের বধ্যভূমি।
রাজৈর উপজেলার বাজিতপুর ইউনিয়নের কমলাপুর গ্রামের কেষ্ট বৈদ্যর বাড়ির পুকুর পাড়ের বধ্যভূমি, আমগ্রাম ইউনিয়নের পাখুল্লা গ্রামের রাসু গাটিয়ার বাড়ির পুকুর পাড়ের বধ্যভূমি, কদমবাড়ি ইউনিয়নের গণেশ পাগলের সেবা আশ্রমের পূর্ব পাশে পুকুর পাড়ের বধ্যভূমি।
এ ছাড়া খালিয়া ইউনিয়নের সেনদিয়া গ্রামের আলেক ফকিরের বাঁশঝাড় সংলগ্ন ৩ খালের সংযোগ স্থানের বধ্যভূমি, একই গ্রামের সিদ্দিক মাতুব্বরের বাড়ির দক্ষিণ পূর্ব কোণের বধ্যভূমি, শচীন বারিকদারের বাড়ির দক্ষিণ পাশে খালপাড় বধ্যভূমি, ডা. রাসু বারিকদারের বাড়ির পাশে বাগানের ভেতরের খালপাড় দক্ষিণ পূর্ব কোণে বধ্যভূমি ও ছাতিয়ানবাড়ি গ্রামের পূর্ণ চন্দ্র বৈদ্য বাড়ির উত্তরপাড় পুকুরের মধ্যে বধ্যভূমি।
রাজৈরের বীর মুক্তিযোদ্ধা জানিয়েছেন, উপজেলার খালিয়া ইউনিয়নের সেনদিয়া, ছাতিয়ান বাড়ি, উল্লাবাড়ি ও পলিতা গ্রামের চারটি বধ্যভূমিতে ১২৭ শহীদের লাশ রয়েছে। এছাড়াও বাজিতপুর ইউনিয়নের কমলাপুর গ্রামের কেষ্ট বৈদ্যর বাড়ির পুকুর পাড়ের বধ্যভূমিতে পাকিস্তানি সেনা ও তাদের দোসররা ওই চার গ্রামে তাণ্ডব চালিয়ে অসংখ্য মানুষকে হত্যা করে গণকবর দেয়।
জেলা প্রশাসন ও গণপূর্ত বিভাগ সূত্রে জানা যায়, সরকারিভাবে ২০১৩ সালে মাদারীপুরের ১০টি বধ্যভূমি উন্নয়ন ও সংরক্ষণের জন্য কর্মসূচির অন্তর্ভুক্ত করা হয়। মাদারীপুর গণপূর্ত বিভাগ সমীক্ষা শেষে ২০১৪ সালে একটি তালিকা মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে পাঠায়। মন্ত্রণালয় পরে চারটি বধ্যভূমিতে স্মৃতিসৌধ নির্মাণের অনুমোদন দেয়। এগুলো হলো- মাদারীপুর এ আর হাওলাদার জুট মিল বধ্যভূমি, কলাগাছিয়া বধ্যভূমি, মিঠাপুর বধ্যভূমি ও রাজৈর বধ্যভূমি। এর মধ্যে এন আর হাওলাদার জুট মিলের মালিকপক্ষ তাদের ব্যক্তি মালিকানা জায়গা হওয়ার মামলা করেছেন। ফলে মাদারীপুর জেলার বড় বধ্যভূমির কাজ এগোতে পারছে না। কেন্দুয়া ইউনিয়নের কলাগাছিয়া বধ্যভূমির জন্য যখন প্রকল্পটি অনুমোদন পাঠানো হয় মন্ত্রণালয়ে তখন জায়গাটি ফাঁকা ছিল, মালিকপক্ষ বধ্যভূমি সংরক্ষণের জন্য স্মৃতিসৌধ নির্মাণে রাজি হয়েছিলেন। প্রকল্পটি পাস হয়ে আসতে কয়েক বছর সময় লেগেছিল। কিন্তু এর মধ্যেই মালিকপক্ষ সেখানে পাকা বাড়ি নির্মাণ করে ফেলেন। তাছাড়া বাকি দুটি বধ্যভূমি নির্মাণে ভূমি অধিগ্রহণের জটিলতার জন্যই বাস্তবায়ন হয়নি স্মৃতিসৌধ নির্মাণ।
সরজমিনে দেখা যায়, বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে এ আর হাওলাদার জুট মিল মাঠ। মাঠের অবস্থান অনুযায়ী পূর্ব দিকে রয়েছে র্যাব-৮ ব্যাটালিয়ন ক্যাম্প, পশ্চিম রয়েছে জজকোর্ট থেকে থানতলি যাওয়ার রাস্তা। উত্তরে আড়িয়াল খা নদীর কোলঘেঁষা কিছু জনপদ। দক্ষিণে মাদারীপুর- শরীয়তপুর মহাসড়ক। মাঠের ঠিক উত্তর পূর্ব কোণায় দাঁড়িয়ে আছে কয়েকটি রেন্ট্রি ও অনেকগুলো খেজুর গাছ। এই জায়গাটিই মূলত বধ্যভূমি। তার নিচেই অবাধে গরু ছাগলকে ঘাস খাওয়ার জন্য বেঁধে রেখে গেছেন স্থানীয়রা। একটি জায়গায় ইট দিয়ে চারকোণা আকৃতির একটি গাঁথুনি নির্মাণ করা হয়েছে। মূলত এ জায়গাটিই মহান মুক্তিযুদ্ধ ইতিহাস বহনকারী বধ্যভূমি। বর্তমানে দাঁড়িয়ে থাকা বর্তমানে কয়েকটি রেন্ট্রি আর খেজুর গাছ ছাড়া আর কিছুই নেই জায়গাটিতে।
স্থানীয় লাল মিয়া মোল্লা বলেন, যুদ্ধের সময় আমার বয়স ছিল ১১ বছর। জুটমিলের পাশে বাড়ি থাকায় দেখতাম, আর্মিরা মানুষদের হত্যা করে এখানে গণকবর দিতো। তবে একটা ব্যাপার খারাপ লাগে শুধু ২৬ মার্চের সময় বড় বড় অফিসাররা অনেক গাড়ি নিয়ে আসে বাতি জ্বালাতে। তারা চাইলেই তো সরকারকে বলে এখানে স্মৃতিসৌধ বানাতে পারেন।
মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন কমান্ডার খলিলুর রহমান খান বলেন, বাংলাদেশ স্বাধীনতার ৫১ বছরে পা দিলেও মাদারীপুর একটি বধ্যভূমি সংরক্ষণ করা হয়নি। যা আমাদের জন্য অত্যন্ত লজ্জা ও দুঃখজনক। আমি চাই মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি চিহ্নগুলো এভাবে হারিয়ে যাওয়ার আগে, সরকার যেন তা দ্রুত সংরক্ষণের ব্যবস্থা গ্রহণ করে।
মাদারীপুর গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী কামরুল ইসলাম খান বলেন, জমি সংক্রান্ত ঝামেলা থাকায় আমরা এতদিন কাজগুলো শুরু করতে পারিনি। এখন আমরা বধ্যভূমিগুলোর লোকেশন ফাইনাল করতে পেরেছি। এখন জমি অধিগ্রহণের জন্য যে প্রস্তাব তার ফাইলটি রেডি হলেই প্রকল্প পরিচালকের কাছে পাঠাবো। আমার সাথে এই ব্যাপারে প্রকল্প পরিচালকের কথা হয়েছে। তিনি জানিয়েছেন ফাইলটি তার কাছে পৌঁছানোর পরেই তিনি অনুমোদন দিয়ে দিবেন। অনুমোদন আসার পরেই আমরা দ্রুত স্মৃতিসৌধ নির্মাণের কাজ শুরু করে দেবো।
মাদারীপুর জেলা প্রশাসক ড. রহিমা খাতুন বলেন, আমরা বধ্যভূমি সংরক্ষণের জন্য কাজ করছি। জমি অধিগ্রহণের একটা বিষয় থাকায় দেরি হচ্ছে। আমরা তথ্য রেডি করে ভূমি মন্ত্রণালয়ে পাঠাবো। বরাদ্দ আসার পরেই দ্রুত স্মৃতিসৌধ নির্মাণ কাজ শুরু করবো।

