বাগেরহাটে ৯ মাসের শিশু সন্তানকে হত্যার পর মায়ের আত্মহত্যার ঘটনায় এক মর্মস্পর্শী দৃশ্যের সাক্ষী হলো যশোর কেন্দ্রীয় কারাগার। শনিবার সন্ধ্যায় নিথর স্ত্রী ও সন্তানের মরদেহ যখন কারা ফটকে পৌঁছায়, তখন সেখানে সৃষ্টি হয় এক গুমোট পরিবেশ। কারাবন্দি সাবেক ছাত্রলীগ নেতা জুয়েল হাসান সাদ্দাম জীবনের সবচেয়ে নির্মম মুহূর্তটির মুখোমুখি হয়ে প্রথমবার ও শেষবারের মতো কোলে তুলে নেন তাঁর মৃত সন্তানকে।
গত শুক্রবার (২৩ জানুয়ারি) দুপুরে বাগেরহাট সদর উপজেলার সাবেকডাঙ্গা গ্রামে এই মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে। নিহত কানিজ সুবর্ণা স্বর্ণালী তাঁর ৯ মাসের শিশুকে বালতির পানিতে চুবিয়ে হত্যার পর নিজে গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেন। স্বর্ণালী সাবেক ছাত্রলীগ নেতা ও বর্তমানে কারাবন্দি জুয়েল হাসান সাদ্দামের স্ত্রী।
শনিবার সন্ধ্যার পর আইনি প্রক্রিয়া শেষে মরদেহ দুটি যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারে নিয়ে আসা হয়। কারা কর্তৃপক্ষের বিশেষ অনুমতিতে সাদ্দামকে তাঁর স্ত্রী ও সন্তানকে দেখার সুযোগ দেওয়া হয়। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, সাদ্দাম যখন তাঁর শিশু সন্তানকে কোলে তুলে নেন, তখন কারাগারে উপস্থিত কর্মকর্তাদের চোখেও জল চলে আসে। ১১ মাস কারাবন্দি থাকায় এই প্রথম তিনি সন্তানকে স্পর্শ করার সুযোগ পেলেন, কিন্তু ততক্ষণে সব শেষ হয়ে গেছে।
নিহত স্বর্ণালীর স্বজনদের দাবি, স্বামীর কারাবন্দি জীবন এবং অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ স্বর্ণালীকে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে তুলেছিল। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর থেকে সাদ্দাম চাপের মুখে ছিলেন এবং প্রায় ১১ মাস আগে গোপালগঞ্জ থেকে আটক হন।
স্বজনদের ভাষ্যমতে:
* মানসিক চাপ: স্বামীকে মুক্ত করতে স্বর্ণালী দ্বারে দ্বারে ঘুরেও কোনো কুলকিনারা পাননি।
* সাদ্দামের চিরকুট: কারাগার থেকে পাঠানো এক চিরকুটে সাদ্দাম নিজেকে দ্রুত মুক্ত করার তাগিদ দিয়েছিলেন এবং সন্তানকে দেখে রাখতে বলেছিলেন। সেই দায়বদ্ধতা ও একাকীত্ব স্বর্ণালীকে চরম হতাশার দিকে ঠেলে দেয়।
যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারের জেলার আবিদ আহম্মেদ জানান, গত বছরের ১৫ ডিসেম্বর সাদ্দামকে এই কারাগারে আনা হয়। শনিবার সন্ধ্যায় পরিবারের চারজন সদস্যসহ মরদেহ দুটি কারাগারে পৌঁছালে মানবিক কারণে সাদ্দামকে তাঁর পরিবারের সাথে শেষ দেখা করার সুযোগ দেওয়া হয়।
একটি রাজনৈতিক পরিচয়, দীর্ঘ কারাবাস এবং তার বাইরে এক নারীর নিঃশব্দ লড়াই—সব মিলিয়ে এই ট্র্যাজেডি পুরো এলাকায় শোকের ছায়া নামিয়ে এনেছে। সমাজ ও ব্যবস্থার চাপে পড়ে একটি সাজানো সংসার কীভাবে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হলো, এই ঘটনা এখন সেই বড় প্রশ্নটিই রেখে যাচ্ছে।

