উচ্চ মূল্যস্ফীতি, রাজস্ব আদায়ের চ্যালেঞ্জ, বিপর্যস্ত আর্থিক খাত সংস্কার এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার প্রেক্ষাপটে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট ঘোষণা করেছে অন্তর্বর্তী সরকার। সোমবার (২ জুন) বিকেল ৩টায় বাংলাদেশ টেলিভিশনে বাজেট উপস্থাপন করেন অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ।
মূল শিরোনাম ও বাজেটের আকার
এবারের বাজেট বক্তৃতার শিরোনাম ছিল: ‘বৈষম্যহীন ও টেকসই অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গড়ার প্রত্যয়’। প্রস্তাবিত বাজেটের আকার নির্ধারণ করা হয়েছে ৭ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা, যা জিডিপির ১২.৭ শতাংশ। এ বাজেট চলতি অর্থবছরের মূল বাজেট থেকে ৭ হাজার কোটি টাকা কম।
মূল চ্যালেঞ্জ ও রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা
প্রস্তাবিত বাজেটের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো রাজস্ব আদায়। বর্তমানে কর-জিডিপি অনুপাত ৮ শতাংশের নিচে। বাজেটে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ৫ লাখ ৬৪ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে এনবিআরের লক্ষ্যমাত্রা ৪ লাখ ৯৯ হাজার কোটি টাকা।
বাজেট ঘাটতি ও অর্থায়ন
প্রস্তাবিত বাজেটে ঘাটতি ধরা হয়েছে ২ লাখ ২৬ হাজার কোটি টাকা, যা জিডিপির ৩.৬ শতাংশ। এ ঘাটতি মেটাতে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ১ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকা এবং বৈদেশিক উৎস থেকে ১ লাখ ১ হাজার কোটি টাকা ঋণের পরিকল্পনা করা হয়েছে।
জিডিপি প্রবৃদ্ধি ও মূল্যস্ফীতি লক্ষ্যমাত্রা
২০২৫-২৬ অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ৫.৫ শতাংশ। সরকার আশা করছে, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে নেমে আসবে ৬.৫ শতাংশে, যদিও এপ্রিল মাসে তা ছিল ৯.১৭ শতাংশ।
উন্নয়ন ও অনুন্নয়ন ব্যয়
নতুন অর্থবছরে পরিচালন ব্যয় বাড়িয়ে ৫ লাখ ৪৫ হাজার কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। অন্যদিকে, বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) কমিয়ে রাখা হয়েছে ২ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা।
সুদ পরিশোধ ও ঋণ
বাজেটে ঋণের সুদ পরিশোধে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ১ লাখ ২২ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে অভ্যন্তরীণ ঋণের সুদ ১ লাখ কোটি এবং বৈদেশিক ঋণের সুদ ২২ হাজার কোটি টাকা।
ব্যক্তিশ্রেণির কর
বর্তমান মূল্যস্ফীতির প্রেক্ষাপটে ব্যক্তিশ্রেণির করমুক্ত আয়সীমা ৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা অপরিবর্তিত থাকছে। তবে জুলাই গণঅভ্যুত্থান ২০২৪-এ আহত ‘জুলাই যোদ্ধাদের’ জন্য করমুক্ত আয়সীমা বাড়িয়ে ৫ লাখ ২৫ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
কালো টাকা সাদা করার সুযোগ
এবারের বাজেটেও ফ্ল্যাট কেনা ও ভবন নির্মাণে অপ্রদর্শিত অর্থ সাদা করার সুযোগ অব্যাহত রাখা হয়েছে। তবে করের হার কিছুটা বাড়ানো হয়েছে।
সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি ও ভাতা বৃদ্ধি
বাজেটে সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীতে বরাদ্দ ও ভাতা বৃদ্ধি পেয়েছে। যেমন:
- বয়স্ক ভাতা: ৬০০ → ৬৫০ টাকা
- বিধবা ও স্বামী পরিত্যক্তা: ৫৫০ → ৬৫০ টাকা
- প্রতিবন্ধী ভাতা: ৮৫০ → ৯০০ টাকা
- মা ও শিশু সহায়তা: ৮০০ → ৮৫০ টাকা
- অনগ্রসর জনগোষ্ঠী ভাতা: ৬৫০ টাকা নির্ধারণ
এই বাজেটের মাধ্যমে সরকার মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, দারিদ্র্য হ্রাস, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, বিনিয়োগ ও শিল্পায়ন উৎসাহিত করতে চায়, একই সঙ্গে উন্নয়ন ব্যয় কিছুটা কমিয়ে সুশাসন ও আর্থিক শৃঙ্খলা রক্ষায় গুরুত্ব দিয়েছে।

