যশোর প্রতিনিধি
যশোরের মনিরামপুর উপজেলার সালেহা বেগম কুষ্ঠরোগে আক্রন্ত। দেবরে শরীরে থাকা এই রোগ সালেহাসহ পরিবারে ৫জন সদস্য আক্রন্ত হন।
কুষ্ঠরোগে জন্য তারা বাড়ি থেকে বের হলে প্রতিবেশিরা দূর দূর করে তাড়িয়ে দিতো। রাস্তায় চলাফেরা করলে অনেকে পাশ দিয়ে হেটে যেত না। বরং বাজে মন্তব্য করতো লোকে। লজ্জা-ভয়ে বাহিরে যেতা না। তবে আল্লাহর রহমতে সরকারি চিকিৎসায় সুস্থ হয়ে উঠেছি পরিবারে সকল সদস্য।
শুধু যশোরের মনিরামপুর উপজেলার কাশিমনগর ইউনিয়নের ইত্তে গ্রামের সালেহা বেগম নয়; তাদের মতো কষ্ঠ রোগে চিকিৎসা নিয়ে জেলায় গত ২০২২ সালের ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত ৫১ জন কুষ্ঠরোগী সুস্থ হয়েছেন। বর্তমানে ১৬ জন কুষ্ঠরোগী সরকারি চিকিৎসার আওতায় রয়েছেন বলে জানান সিভিল সার্জন বিপ্লব কান্তি বিশ্বাস।
রবিবার (২৯ জানুয়ারী) সকালে যশোর সিভিল সার্জন কার্যালয়ের সম্মেলন কক্ষে ‘বিশ্ব কুষ্ঠ দিবস’ উপলক্ষে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় নিজেদের রোগমুক্তির কথা প্রকাশ করতে উপস্থিত হন সালেহা বেগম’র পরিবার। ‘এখনই কাজ শুরু করি, কুষ্ঠ রোগ নির্মূল করি’ এই প্রতিপাদ্যে আলোচনা সভায় ডেপুটি সিভিল সার্জন নাজমুস সাদিকের সভাপতিত্বে আরো উপস্থিত ছিলেন বিভিন্ন সরকারি চিকিৎসা কেন্দ্রের চিকিৎসক স্বাস্থ্যকর্মী ও বাঁচতে শেখা এনজিওর কর্মকর্তারা।
সালেহা বেগম দেবর কষ্ঠরোগী মোকসেদ আলী বলেন, ‘আমি আজ থেকে ৩০ বছর আগে কুষ্ঠরোগে আক্রান্ত হই। প্রথমে বুঝতে পারিনি। একে একে আমার পরিবারের সকলেই কুষ্ঠ রোগে আক্রান্ত হয়ে পড়ে। একদিন রাস্তায় বাঁচতে শেখা এনজিওর এক মাঠকর্মীর সাথে দেখা হয়। তিনি আমার শরীরের ক্ষত দেখে কুষ্ঠরোগ নির্নয় করে এবং চিকিৎসা কেন্দ্রে নিয়ে পরীক্ষা নিরিক্ষা করায়। এরপর আমাদের সপরিবারকে যশোর বক্ষব্যাধী হাসপাতালে নিয়ে সরকারিভাবে চিকিৎসা সেবা প্রদান করে। বিগত এক বছর সরকারি চিকিৎসার তত্বাবধানে আমার পরিবার এখন সুস্থ।
তিনি আরও বলেন, ‘আমরা আগে শুনেছি কুষ্ঠরোগ হলে মানুষকে সমাজ বঞ্চিত হতে হয়। এ রোগ কোনদিন নির্মূল হয় না। তবে আমাদের পরিবারকে দীর্ঘ ২০-২৫ বছর সামাজিকভাবে কোনঠাসা করে রাখা হয়। পথে বের হলে নানান লোকে নানা কথা বলতো। কেউ বলতো পরিবার সহ পাপের সাজা পাচ্ছে। আরও কত আজে বাজে কথা বলতো। কিন্তু প্রকৃত পক্ষে এ রোগ হলে ভয়ের কিছু নেই। চিকিৎসা গ্রহন করতে পারলে এ রোগ নির্মূল করা সম্ভব।
সালেহা বেগম বলেন, ‘আমরা বাড়ি থেকে বের হতে পারতাম না। রাস্তায় চললে অনেকে পাশ দিয়ে হেটে যেত না, দূর থেকে হেঁটে যেত। পথে যেতে দেখলে আজে বাজে মন্তব্য করতো লোকে। কোনদিন ভাবিনি যে এর থেকে পরিত্রান পাবো। তবে চিকিৎসা পেয়ে এখন আল্লাহর রহমতে সুস্থ।
বাচতেঁ শেখা এনজিও’র মনিটরিং অফিসার মুকুট ফ্রান্সিস হালদার বলেন, বাঁচতে শেখা এনজিওর মাঠকর্মীরা কুষ্ঠ রোগীদের খুজে খুকে বের করে শনাক্ত করে, অতপর তাদের যশোর বক্ষব্যাধী হাসপাতালে নিয়েসে পরীক্ষা নিরিক্ষা করে রোগ নির্নয় করে সরকারি খরচে চিকিৎসা সেবা দেওয়া হয়। কুষ্ঠরোগ রোগীর হাঁচি কাশিতে সংক্রমিত হয় একারণে এ রোগে আক্রান্ত সন্দেহভাজন কাউকে দেখলে অবশ্যই তাকে নিকটস্থ স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে যোগাযোগ করতে হবে। এবং সকলকে এ রোগ সম্পর্কে সচেতন থাকতে হবে। সুচিকিৎসায় যক্ষার মতো এ কুষ্ঠরোগেরও মুক্তি মেলে।
অনুষ্ঠানে ডেপুটি সিভিল সার্জন নাজমুস সাদিক বলেন, ‘কুষ্ঠরোগ কোন ভয়ের কারণ নয়। এটি নিরাময়যোগ্য। সরকারি চিকিৎসায় এটি পরিপূর্ণভাবে নির্মুল করা সম্ভব। কুষ্ঠরোগ নির্মূল করতে মাঠপর্যায় থেকে জনগনকে সচেতন করতে হবে, মাঠপর্যায় থেকে রোগ নির্ণয় করে দ্রুত চিকিৎসার আওতায় আনতে হবে। কুষ্ঠরোগ সম্পর্কে সকলে সচেতন হয়ে এগিয়ে আসলে এ রোগ নির্মূল করা সম্ভব এবং আমরা একটি সুস্থ জাতি পাবো বলে আশা করি।’
সিভিল সার্জন বিপ্লব কান্তি বিশ্বাস বলেন, ‘জেলায় গত ২০২২ সালের ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত ৫১ জন কুষ্ঠ রোগী সুস্থ হয়েছেন। এবং বর্তমানে ১৬ জন কুষ্ঠরোগী সরকারি চিকিৎসার আওতায় রয়েছেন। কুষ্ঠরোগ থেকে মুক্তি লাভ করতে সকলকে সচেতন হতে হবে।’
জাগো/আরএইচএম

