২০ বছর বয়সী সারাহ এখন আর কারও কাছে অপরিচিত নন। পৃথিবী ছেড়ে চলে গেলেও তিনি জীবিত সারাহর চেয়ে আরো বেশি শক্তিশালী হয়ে উঠেছেন। জীবিত সারাহকে কেউ না চিনলেও দেশের মানুষ এখন তার নাম জানে।
সারাহ ইসলাম ঐশ্বর্য নামের মেয়েটি নামের প্রতি পূর্ণ সদ্ব্যবহার করে তার জীবনকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। আরো চারজনের জীবনে ফিরিয়ে দিয়েছেন বাঁচার আশা। শুধু তা-ই নয়, তার জন্যই দেশের চিকিৎসা খাতে খুলেছে নতুন দুয়ার, নতুন করে বাঁচার আশা তৈরি হয়েছে অনেক রোগীর। আর এই অনন্য অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে সারাহকে মরণোত্তর রাষ্ট্রীয় পুরস্কার দিতে সুপারিশ করার পরিকল্পনা করছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএসএমএমইউ) কর্তৃপক্ষ।
সারাহ টিউবেরাস স্ক্লোরোসিস নামের খুব জটিল ও বিরল এক রোগে আক্রান্ত ছিলেন। মৃত্যুর আগে তিনি কিডনি ও কর্নিয়া দান করে গেছেন। তার এই দানেই সম্ভব হয়েছে দেশের প্রথম ক্যাডাভেরিক ট্রান্সপ্লান্টেশন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউর) রেনাল ট্রান্সপ্লান্ট সার্জন অধ্যাপক ডা. হাবিবুর রহমানের নেতৃত্বে একটি দল বিএসএমএমইউর আইসিইউতে মারা যাওয়া সারাহ ইসলামের দুটি কিডনি অপসারণ করেন। গত বুধবার মাঝরাতেই কিডনি দুটি অন্য দুজনের শরীরে সফলভাবে প্রতিস্থাপন করা হয়।
অধ্যাপক হাবিবুর রহমান বলেন, একজন সারাহ ইসলাম চারজন মানুষকে জীবন ফিরিয়ে দিয়েছেন। তিনি এক দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গেছেন। তার দেখানো পথে এখন অনেক মানুষ আগ্রহী হচ্ছেন। আমরা অনেক টেলিফোন পাচ্ছি, অনেকেই সারাহর দেখানো পথে চলতে চাইছেন। আর এ কারণেই আমরা পরবর্তী ধাপে যেতে পারব। ক্যাডাভেরিক ট্রান্সপ্লান্টেশনের জন্য আমরা এক ধরনের বাধার মধ্যে ছিলাম।
অধ্যাপক হাবিবুর রহমান আরো বলেন, কিন্তু সারাহ ইসলাম সেই আটকে থাকা দুয়ার খুলে দিয়েছেন। তিনি আমাদের সবার কাজকে সহজ ও সুন্দর করে দিয়ে গেছেন। সারাহ ইসলামকে তার প্রাপ্য সম্মান জানাতে উদ্যোগ নিয়েছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়। তাকে সম্মান জানাতে বিএসএমএমইউ ছয়টি পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে এবং গতকাল শনিবার বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ডা. শারফুদ্দিন আহমেদ তাতে অনুমতি দিয়েছেন।
এসব পরিকল্পনার মধ্যে রয়েছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব ক্যাডাভেরিক সেলকে সারাহ ইসলামের নামে ‘সারাহ ইসলাম ক্যাডাভেরিক ট্রান্সপ্লান্ট সেল’ নামকরণ করা। ইতোমধ্যে এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে এবং এর উদ্বোধন করবেন সারাহ ইসলামের মা শবনম সুলতানা। এ ছাড়া সারাহর নামে বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি ফলক তৈরি, বিশ্ববিদ্যালয়ের পরবর্তী সমাবর্তনে তার নামে বড় একটি পুরস্কার প্রবর্তন, সারাহর মা শবনম সুলতানার জন্য আজীবন এ হাসপাতালে বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবার ব্যবস্থা, বিশ্ববিদ্যালয়ের যেকোনো গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠানে শবনম সুলতানাকে আজীবন গুরুত্বপূর্ণ অতিথি হিসেবে আমন্ত্রণ এবং সরকারের কাছে সারাহ ইসলামের নামে মরণোত্তর যেকোনো রাষ্ট্রীয় পুরস্কারের সুপারিশ করারও পরিকল্পনা করেছে বিএসএমএমইউ।
অধ্যাপক হাবিবুর রহমান বলেন, এতে করে সারাহর প্রতি আমাদের শ্রদ্ধা নিবেদন করা হবে, পাশাপাশি মানুষ উদ্বুদ্ধ হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের পরবর্তী সিন্ডিকেট সভায় পরিকল্পনা-সংক্রান্ত প্রস্তাব পাস হলেই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে এবং এর বাস্তবায়ন হবে।
সারাহ ইসলামের দুটি কিডনি এবং দুটি কর্নিয়া চারজনের শরীরে সফল প্রতিস্থাপন করা হয়েছে। কিডনি গ্রহীতা দুজনই নারী। কর্নিয়া প্রতিস্থাপন হয়েছে একজন নারী এবং একজন পুরুষের চোখে। কর্নিয়া গ্রহীতা দুজন এরই মধ্যে ছাড়পত্র নিয়ে হাসপাতাল থেকে বিদায় নিয়েছেন। তাদের একজন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়, অপরজন সন্ধানী চক্ষু হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন। তিন সপ্তাহের মধ্যে তারা সম্পূর্ণ দৃষ্টিশক্তি ফিরে পাবেন বলে প্রত্যাশা করছেন চিকিৎসকরা।
এদিকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় এবং জাতীয় কিডনি ফাউন্ডেশনে যে দুজনের শরীরে সারাহর কিডনি প্রতিস্থাপন করা হয়েছে, তাদের দুজনেরই শারীরিক অবস্থা ভালো রয়েছে এবং ধীরে ধীরে তাদের অবস্থার উন্নতি ঘটছে বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা। নিয়ম অনুযায়ী তারা চিকিৎসাধীন রয়েছেন।

