ফের পিছিয়ে যাচ্ছে ড্রাইভিং লাইসেন্স ছাড়া মোটরসাইকেল বিক্রি বন্ধ করার সিদ্ধান্ত। লাইসেন্স ছাড়া বিআরটিএ রেজিস্ট্রেশন না করার সিদ্ধান্তও পেছাচ্ছে। অংশীজনদের চাপে এই সিদ্ধান্ত আসছে বলে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে।
সড়ক পরিবহন সেক্টরের শৃঙ্খলা ফেরাতে ও দুর্ঘটনা কমাতে আজ ১৫ ডিসেম্বর থেকে লাইসেন্স ছাড়া মোটরসাইকেল বিক্রি বন্ধ করার সিদ্ধান্ত ছিল। রেজিস্ট্রেশনের বিষয়টিও একসঙ্গে কার্যকর করার কথা ছিল।
লাইসেন্স ছাড়া মোটরসাইকেল বিক্রির সিদ্ধান্ত স্থগিত করার অনুরোধ জানিয়ে গত ৫ ডিসেম্বর বিআরটিএকে চিঠি দিয়েছে মোটরসাইকেল উৎপাদকদের সংগঠন বাংলাদেশ মোটরসাইকেল অ্যাসেম্বলার্স অ্যান্ড ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিমামা)। নানা সংকটের তথ্য তুলে ধরে তারা সরকারকে তাদের সিদ্ধান্ত কার্যকর না করার অনুরোধ জানিয়েছে।
সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সচিব এ বি এম আমিন উল্লাহ নুরী বলেন, আমরা একটা আবেদন পেয়েছি এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মতামত নিচ্ছি। দুই-এক দিনের মধ্যে সিদ্ধান্ত জানানো হবে।
বিআরটিএ সূত্র জানায়, বিমামার চিঠিতে বিশ্ব ও স্থানীয় অর্থনৈতিক অবস্থার কথা তুলে ধরে বলা হয়েছে, কোভিড-১৯ অতিমারি, রুশ-ইউক্রেন যুদ্ধ, নিষেধাজ্ঞা-পাল্টানিষেধাজ্ঞা, জ্বালানি-মূল্যবৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতি- বৈশ্বিক অর্থনীতিতে যে মন্থরতার সূত্রপাত করেছে এর নেতিবাচক প্রভাব দেশের শিল্প-বাণিজ্য-বিনিয়োগ খাতকে অনেকাংশে বিপন্ন করে তুলেছে। মোটরসাইকেল শিল্প খাতে এর প্রভাব পড়েছে এবং বিদ্যমান পরিস্থিতিতে সংবেদনশীল কোনো সিদ্ধান্ত আরোপ করা হলে এ শিল্প অস্তিত্ব-সংকটে পড়বে।
পরিসংখ্যান তুলে ধরে বিমামা বলেছে, অন্যান্য বছরের তুলনায় চলতি বছর মোটরসাইকেল বিক্রি হয়েছে প্রায় অর্ধেক। চিঠিতে বলা হয়ছে, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্থরতার প্রেক্ষাপটে বিআরটিএর সিদ্ধান্ত এ শিল্পে মাত্রাতিরিক্ত নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। শিল্পের অস্তিত্ব সংকটাপন্ন হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
সংগঠনটি বলছে, কোভিডের স্বাস্থ্য ঝুঁকিপূর্ণ প্রতিকূল পরিস্থিতি মোকাবিলা করেও এ শিল্প ঘুরে দাঁড়াতে সক্ষম হয়েছিল। কিন্তু ঈদুল আজহার সময় পদ্মা সেতুসহ মহাসড়কে মোটরসাইকেল চালনায় বিধিনিষেধ আরোপ, এক জেলায় নিবন্ধিত মোটরসাইকেল অন্য জেলায় চালনা বন্ধ করাসহ মোটরসাইকেল-ক্রয়পূর্ব ড্রাইভিং লাইসেন্সের আবশ্যকতার বিষয়ে নেয়া সিদ্ধান্ত মোটরসাইকেল শিল্পকে বিপর্যস্ত করে তুলেছে।
চিঠি দেয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করে বিমামার জেনারেল সেক্রেটারি বিপ্লব কুমার রায় বলেন, সারাবিশ্বে কোথাও মোটরসাইকেল বিক্রির সময় ড্রাইভিং লাইসেন্স চেক করা হয় না। চালক যখন সড়কে গাড়ি চালাবেন তখন রেগুলেটরি অথরিটি মোটরসাইকেল চালকের ড্রাইভিং লাইসেন্স আছে কি না পরীক্ষা করতে পারেন। ড্রাইভিং লাইসেন্স মোটরসাইকেল বিক্রির সঙ্গে সম্পর্কিত নয়, এটা রাইডিংয়ের সঙ্গে সম্পর্কিত।
এর আগে, মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা বৃদ্ধির কারণে গত ১৪ সেপ্টেম্বর থেকে লাইসেন্স ছাড়া মোটরসাইকেল বিক্রি এবং রেজিস্ট্রেশন বন্ধ করতে বলা হয়েছিল। তখনো বিমামা সময় চেয়েছিল। তাদের আবেদনে ৩ মাস অর্থাৎ ১৪ ডিসেম্বর পর্যন্ত সময় বাড়িয়েছিল বিআরটিএ।
এদিকে বিআরটিএ ওই চিঠি সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছে। এ বিষয়ে বৃহস্পতিবার মন্ত্রণালয় সিদ্ধান্ত জানাতে পারে বলে সূত্র জানিয়েছে।
বিআরটিএর তথ্যমতে, বর্তমানে সারাদেশে রেজিস্ট্রেশন করা মোটরসাইকেল আছে সাড়ে ৩৯ লাখের বেশি। এর মধ্যে ২০১৮ সালে রেজিস্ট্রেশন হয়েছে তিন লাখ, ২০১৯ সালে চার লাখ। কোভিডের প্রভাবে ২০২০ সালে তা কমে ৩ লাখ ১১টি হলেও পরের বছর তা বেড়ে হয় পৌনে চার লাখ। এর মধ্যে শুধু ঢাকায় চলাচল করে ১০ লাখ ৮ হাজার ৪১৭টি।
ঢাকা ও চট্টগ্রাম শহরে ভাড়ায় চালিত অ্যাপভিত্তিক মোটরসাইকেল বৃদ্ধির কারণে এর ক্রয়-বিক্রয় এবং রেজিস্ট্রেশনের হারও বেড়েছে।
সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করা সংগঠন রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী, দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহতদের এক-তৃতীয়াংশের বেশি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় মারা যান।
রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক সাইদুর রহমান বলেন, মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা আগের চেয়ে বেড়েছে। ফলে লাইসেন্স ছাড়া মোটরসাইকেল বন্ধের সিদ্ধান্তক্ষেপণ করা আত্মঘাতী। মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় কম বয়সের ছেলেরা বেশি মারা যাচ্ছেন। তাই গণপরিবহনকে সাশ্রয়ী এবং সহজলভ্য করে মোটরসাইকেলকে এখনই নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। এ ক্ষেত্রে মোটরসাইকেল কোম্পানিগুলো আরও সময় বৃদ্ধি করার যে আবেদন করেছে তা অনুমোদন দেয়া যৌক্তিক হবে না।
তবে মোটরসাইকেল উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো বলছে, লাইসেন্স ছাড়া কেউ মোটরসাইকেল বিক্রি করছে কি না, তা মনিটর করবে কে, সে বিষয়ে কোনো নির্দেশনা নেই।
বুয়েটের অ্যাক্সিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (এআরআই) সহকারী অধ্যাপক কাজী সাইফুন নেওয়াজ বলেন, যার লাইসেন্স নেই তার কাছে মোটরসাইকেল বিক্রি করার যৌক্তিকতা দেখি না।

