ছয় সন্তানের মা জোহরা বেগম। রাজধানীর মোহাম্মদপুরে চার ছেলের যৌথ পরিবার জীবনের শেষ সময় পার করছেন তিনি। ইতোমধ্যে জীবনের ১১১টি বছর পার করে ফেলেছেন। চল্লিশ বছর আগে হারিয়েছেন স্বামীকে। এখন চোখে দেখেন না, কানেও ঠিকঠাকভাবে শোনেন না।
বর্তমানে তিন ছেলের সঙ্গে বসবাস করলেও তার ছোট ছেলে এখন কারাগারে। সেই ছেলেই যেন তার প্রাণের আলো। চোখে অন্ধকার দেখলেও তিনি মনের চোখ দিয়ে ছোট ছেলেকে দেখতে ছুটে এসেছেন ঢাকার আদালতে। পেয়েছেন আদরের ছোট ছেলের দেখা!
সম্প্রতি ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের বটতলায় বৃদ্ধা মা বসেছিলেন। দুপুর বেলায় তার দুই ছেলে ও এক ছেলের স্ত্রী বৃদ্ধাকে চা বিস্কুট খাইয়ে দিচ্ছিলেন। এমন সময় বৃদ্ধার ছোট ছেলেকে আদালতের গারদ থেকে বের করে নিয়ে আসা হয়।
কারণ তাকে কারাগারে পাঠানোর জন্য প্রিজন ভ্যানে তোলা হবে। তখন বৃদ্ধ মা প্রিজন ভ্যানের কাছে যেতেই ছোট ছেলে সাব্বির তার বৃদ্ধা মাকে জড়িয়ে ধরেন। সঙ্গে ছিলেন অপর দুই ছেলেও৷ একপর্যায়ে ছোট ছেলে মাকে ধরে কাঁদতে থাকেন। সঙ্গে মায়ের চোখ দিয়েও পড়তে থাকে অঝোরে ভালোবাসার জল।
পরিবার সূত্রে জানা যায়, দুই মেয়ে ও চার ছেলের জননী এই বৃদ্ধা। তার আদরের ছোট ছেলের নাম সাব্বির। গাড়িতে শ্রমিকের কাজ করতেন। তবে প্রতিবেশীর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের এক মামলায় চার বছর ধরে কারাগারে আটক রয়েছেন। বর্তমানে মামলাটি সাক্ষ্যগ্রহণ পর্যায়ে রয়েছে। ঢাকার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-৬ এ মামলার বিচার কাজ চলছে।
বৃদ্ধার মেজো ছেলে চুন্নুর বয়স ৭০ বছর। রিকশা চালান। চার বছর ধরে ভাই কারাগারে আছে। কিন্তু অর্থের অভাবে আইনজীবী নিয়োগ করতে পারেননি। তবে লিগ্যাল এইড নিযুক্ত আইনজীবী তার ভাইয়ের পক্ষে মামলার বিষয়ে তদারকি করে।
চুন্নু বলেন, অভাবের সংসার। ১১১ বছরের মাকে নিয়ে চার ভাই এক সঙ্গেই থাকি, এক জায়গায় খাই। কিন্তু ছোট ভাই কারাগারে রয়েছে। তাকে দেখার জন্যে মা অনেক কান্নাকাটি করে। মা কানে কম শোনেন। চোখেও ভালোভাবে দেখেন না। এখন মায়ের একমাত্র চাওয়া যাতে তার ছেলেকে ফিরে পান৷
বৃদ্ধার সেজো ছেলের স্ত্রী রাজিয়া বলেন, আমার শাশুড়ি ছোট ছেলেকে দেখবেন বলে সারাদিন কান্নাকাটি করতেন। তাকে কোনোভাবেই বুঝানো যায় না। ছোট ছেলের প্রতি তার খুব মায়া। দরজার সামনে বসে সারাক্ষণ তার কথা বলেন। আল্লাহর কাছে হাত পেতে তাকে ভিক্ষা চান।
বৃদ্ধার সেজো ছেলে সেলিম বলেন, মা রাত-দিন ২৪ ঘণ্টা ছোট ভাইয়ের কথা বলেন। আমাকে কাজ করতে দেন না। সারাদিন দরজার কাছে বসে আল্লাহর কাছে ছেলে ভিক্ষা চান। খুব কান্না কাটি করেন। এ জন্য তাকে আদালতে ছোট ভাইয়ে সঙ্গে দেখা করতে নিয়ে এসেছি।
লিগ্যাল এইডের নিযুক্ত আইনজীবী মনিরা বেগম মনি বলেন, আসামি সাব্বির চার বছর ধরে কারাগারে রয়েছে। তার বিরুদ্ধে করা মামলাটি সাক্ষ্যগ্রহণ পর্যায়ে আছে। দীর্ঘদিন জামিন না হওয়ায় তার বৃদ্ধা মাকে আদালতে হাজির করা হয়েছিল। আদালতের কাছে মানবিক দিক বিবেচনা করে জামিন আবেদন করা হয়েছিল। কিন্তু আদালত জামিন নামঞ্জুর করেছেন।

