নিত্যপণ্যের লাগামছাড়া মূল্যবৃদ্ধির কারণ দেখিয়ে রাজধানীর হোটেল-রেস্টুরেন্টগুলোতে খাবারের দাম বেড়েছে। এর প্রভাবে হোটেলগুলোতে কমেছে ক্রেতা ও বিক্রির পরিমাণ।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, জিনিসের দাম বাড়ানোর পর থেকে ৩০ শতাংশ বিক্রি কমে গেছে। যারা প্রায়ই বাইরে খেতেন তারা এখন হোটেল ও রেস্টুরেন্টে কম আসছেন। অনেকে অর্থ সাশ্রয়ের জন্য খরচের পরিমাণ কমিয়েছেন।
শনিবার রাজধানীর তালতলা, আগারগাঁও ও কাওরানবাজারের কয়েকটি হোটেল-রেস্টুরেন্ট ঘুরে দেখা গেছে, অধিকাংশ জায়গায় খাবারের দাম বেড়েছে। তবে দুই-একটি হোটেল পরিমাণে খাবার কম দিয়ে আগের দামই রাখছে। আগারগাঁওয়ের শাহী কাবাব হোটেলে সব পণ্যের দাম ৫ থেকে ২০ টাকা পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। ৫ টাকার পরোটা রাখছে ১০ টাকা। পাঙ্গাশ মাছের পিস ১০ টাকা বেড়ে ৬০ টাকা হয়েছে।
হাফ তেহারি আগে যেখানে ছিল ৭০ টাকা, সেটা এখন হয়েছে ৯০ টাকা। আর ফুল প্লেট তেহারি ২০ টাকা বেড়ে হয়েছে ১৮০ টাকা। গরুর কাচ্চি ফুল ২০ টাকা বেড়ে হয়েছে ২০০ টাকা। হাফ কাচ্চি ১০ টাকা বেড়ে হয়েছে ১০০ টাকা। চিকেন খিচুড়ি হাফ ১০ টাকা বেড়ে ১০০ টাকা। ডিম পোলাও হাফ ১০ টাকা বেড়ে ৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
হোটেলটির স্বত্বাধিকারী আমির হোসেন বলেন, দাম বাড়িয়েও আমাদের লাভ তেমন থাকছে না।
আমাদের বিক্রি অর্ধেক কমে গেছে। কাওরানবাজারের আল মদিনা হোটেলে একটি ডিম ৩০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, যেখানে আগে একটি ডিমের দাম ছিল ২০ টাকা। অন্যদিকে ২০ টাকার সবজি ২৫ টাকা, ৭০ টাকার ব্রয়লারের মাংস ৮০ টাকা, ১২০ টাকার গরুর মাংস ১৩০ টাকা, ১৫ টাকার ভাজি ২০ টাকা, ১০ টাকার ভাত ১৫ টাকা, ৯০ থেকে ১০০ টাকার রুই মাছ ১১০ টাকা এবং ৬০ টাকার কই ও তেলাপিয়া মাছ ৭০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
হোটেলটির স্বত্বাধিকারী তানভীর বলেন, খাবারের দাম না বাড়িয়ে কোনো উপায় নেই। আমাদেরকে তেল, গ্যাস, চিনি, মাছ, মাংস থেকে শুরু করে সব জিনিসই বেশি দামে কিনতে হচ্ছে। পশ্চিম আগারগাঁওয়ের মায়ের দোয়া হোটেলে ভাতের দাম ৫ টাকা বাড়িয়ে ১৫ টাকা করা হয়েছে। আলু ভর্তা ১০ টাকা ছিল এখন ১৫ টাকা হয়েছে। ৫ টাকার ডাল পুরি ১০ টাকা। পরোটা ছিল ৫ টাকা, এখন ১০ টাকা হয়েছে। এদিকে এই হোটেলে মুরগির হাফ গ্রিল আগে ছিল ১৮০ টাকা, এখন ২০০ টাকা করা হয়েছে। ২০ টাকার নান রুটি ২৫ টাকা, ১০ টাকার ডালপুরি ১৫ টাকা, ১০ টাকার চা ১৫ টাকা, আর ১৫ টাকার ভর্তা ২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। অন্যদিকে, ৩০ টাকা বাটি শাকের দাম রাখা হচ্ছে ৩৫ টাকা।
হোটেলটির কর্মচারী রাশেদ বলেন, বাজারে প্রতিটি পণ্যের দাম অনেক বেড়েছে। আটা, চাল, ডাল, চিনি, তেলসহ এমন কোনো জিনিস নেই যেটির দাম বাড়েনি। এমন পরিস্থিতিতে খাবারের দাম না বাড়িয়ে উপায় নেই। তবে আমরা খাবারের দাম অনেক কম বাড়িয়েছি। তিনি বলেন, আমাদের বিক্রি কমেছে ৫০ শতাংশ। কোনো উপায় না পেয়ে কর্মচারী ছাঁটাই করতে বাধ্য হয়েছি।
ক্যাফে সৌদিয়ার স্বত্বাধিকারী শাকিল বলেন, এক সপ্তাহের মধ্যে গরুর খিচুড়ি, মোরগ পোলাও ও গরুর সাদা পোলাও-এর দাম ১০ টাকা বাড়িয়েছি। দাম বাড়ানো নিয়ে বারবার জবাবদিহি করতে হচ্ছে। অথচ বাজারে সব ধরনের কাঁচামালের দাম বেশি। এতে লাভের অঙ্ক কমে এসেছে। ক্রেতার সংখ্যাও আগের তুলনায় অনেক কমেছে। তবে কিছু হোটেলে খাবারের দাম এখনো বাড়েনি। খাবারের পরিমাণ কম দিয়ে এসব হোটেল চলছে।
ক্যাফে রুচিরা হোটেলের স্বত্বাধিকারী আকবর আলী বলেন, আগের দামেই খাবার বিক্রি করছি। জিনিসের দাম বাড়ায় এমনিতেই মানুষ ভোগান্তিতে আছে। এখন যদি খাবারের দাম বাড়ানো হয়, তাহলে হোটেলে কেউ খেতে আসবে না। এমনিতেই মানুষ খাওয়ার পরিমাণ কমিয়ে দিয়েছে। আগে যেখানে দিনে ৩৫ হাজার টাকার খাবার বিক্রি হতো, এখন সেটা ২৩ হাজারে নেমেছে। ভোজ্যতেল, গ্যাস, চাল, ময়দা, মাছ, মাংসসহ সব জিনিসের দাম বেড়ে যাওয়ায় আমাদের লাভের পরিমাণও অনেক কমেছে। তবে এভাবে বেশি দিন চলা যাবে না। আমরা দাম বাড়ানোর জন্য মিটিং করবো।
বিসমিল্লাহ হোটেলের মালিক জনি বলেন, জিনিসের দাম বাড়ানো হয়নি। তবে চিন্তা আছে বাড়ানোর। কারণ, না বাড়ালে ব্যবসা করা সম্ভব হচ্ছে না। তিনি বলেন, বিক্রি অনেক কমে গেছে। কোনো রকম চালিয়ে নিচ্ছি। এদিকে হোটেল-রেস্টুরেন্টে খাবারের দাম বাড়ায় স্বল্প আয়ের যেসব মানুষ ঘরের বাইরে খাবার খান তারা বিপাকে পড়েছেন। অনেকে সকালের নাস্তায় পরোটার সঙ্গে ডিমের বদলে পাতলা ডাল খাচ্ছে। দুপুরে যারা মাছ অথবা মুরগি খেতেন তাদের কেউ কেউ সবজি দিয়ে খাচ্ছেন।
সিএনজি চালক রায়হান বলেন, আগে ১৭০ থেকে ১৮০ টাকার মধ্যে দুই বেলা খেতে পারতাম। এখন সেই খাবার খেতে ২৫০ টাকা লাগভে। তেলাপিয়া মাছের পিস যেটি ৬০ টাকায় বিক্রি হতো সেটি এখন ৮০ টাকা করা হয়েছে। ভাতের দামও ৫ টাকা বাড়ানো হয়েছে। ২০ টাকার সবজি নেয়া হচ্ছে ৩০ টাকা। তালতলা বাসস্ট্যান্ডে কথা হয় গার্মেন্টস ব্যবসায়ী সামাদ হোসেনের সঙ্গে। তিনি বলেন, ১৫ দিন আগে ১১০ টাকায় দুপুরে ভাত খেতাম এক পিস মাছ দিয়ে। এখন সেই খাবার খেতে খরচ হচ্ছে প্রায় ১৫০ টাকা। খরচ বাচাতে ভাতের সঙ্গে শুধু ডাল আর সবজি খাই।
বাংলাদেশ রেস্তোরাঁ মালিক সমিতির মহাসচিব ইমরান হাসান বলেন, আমাদের বিক্রি ৩০ শতাংশ কমে গেছে। যারা প্রায়ই বাইরে খেতেন তারা এখন হোটেল ও রেস্তোরাঁয় কম যাচ্ছেন। অনেকে অর্থ সাশ্রয়ের জন্য কম খরচ করছেন। আগে যারা ভাতের সঙ্গে মাছ কিংবা মাংসের তরকারিসহ কয়েকটি পদ খেতেন, তারা এখন এক পদ দিয়েই ভাত খাচ্ছেন। অন্যদিকে যারা রুটির সঙ্গে কাবাব নিতেন তারা এখন সবজি নিচ্ছেন। মানুষের আয় তো বাড়েনি, এজন্য বেঁচে থাকার জন্য যতটুকু দরকার ঠিক ততটুকুই খাচ্ছেন।

