দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রিটার্নিং অফিসারের দায়িত্ব জেলা প্রশাসকের পরিবর্তে জেলা জজের সমমর্যাদা সম্পন্ন যেকোনো বিশেষ জজকে দেয়ার প্রস্তাব করেছে মুসলিম লীগ।
জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কোনো আসনে ৫১ শতাংশের কম ভোট পড়লে সেই আসনে পুনঃনির্বাচনসহ নির্বাচন কমিশনকে (ইসি) ১৯ দফা প্রস্তাব দিয়েছে নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল মুসলিম লীগ।
সোমবার সকালে কমিশনের সঙ্গে সংলাপে অংশ নিয়ে মোট ১৯টি প্রস্তাব দিয়েছে দলটি।
মুসলিম লীগ নেতাদের বিশ্বাস তাদের প্রস্তাব অনুযায়ী ইসি পদক্ষেপ নিলে সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের পথ তরান্বিত হবে।
মুসলিমের লীগের দেয়া আইনি কাঠামো বিষয়ক সুপারিশের মধ্যে রয়েছে:
১. রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে যেকোনোভাবে সম্পৃক্ত কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারীকে নির্বাচনী দায়িত্বে রাখা যাবে না। এক্ষেত্রে কর্মজীবনে প্রবেশের পূর্বে ও ছাত্রজীবনের রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতাও বিবেচনায় আনতে হবে।
২. রিটার্নিং অফিসারের দায়িত্ব জেলা প্রশাসকের পরিবর্তে জেলা জজের সমমর্যাদা সম্পন্ন যেকোনো বিশেষ জজকে প্রদান করা।
৩. তফসিল থেকে শুরু করে ফলাফল গেজেট আকারে প্রকাশ করা পর্যন্ত জনপ্রশাসন, তথ্য ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নির্বাচন কমিশনের অধীনে রাখতে হবে।
৪. নির্বাচনকে অবাধ, সুষ্ঠু ও প্রভাবমুক্ত করার স্বার্থে, নির্বাচনের তিন মাস পূর্বে জাতীয় সংসদ বিলুপ্ত করতে ইসির পক্ষ থেকে সরকারের নিকট আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব রাখার অনুরোধ।
৫. বর্তমান পরিস্থিতিতে ক্ষমতাসীন দলের অধীনে সংসদ নির্বাচন নিরপেক্ষ, অবাধ ও সুষ্ঠু হবে না, -একথা জনগণের বড় একটি অংশ দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে। অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে, বিগত এগারটি সংসদ নির্বাচনে, সংসদে একাধিকবার প্রতিনিধিত্বকারী সক্রিয় এবং নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলগুলোর মনোনীত প্রতিনিধি নিয়ে, নির্বাচনকালীন সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তনের প্রস্তাব নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে সরকারের নিকট দেওয়ার সুপারিশ।
৬. ভোটার ও ভোটকেন্দ্রের নিরাপত্তা নিশ্চিতের বিশেষ দায়িত্ব দিয়ে, নির্বাচনকালীন সময়ের জন্য প্রতিটি নির্বাচনী এলাকায় একজন জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ করতে হবে।
৭. কাস্টিং ভোট ৫১ শতাংশের কম হলে গণতন্ত্রের স্বার্থে সংশ্লিষ্ট আসনে পুনঃনির্বাচনের প্রস্তাব করছি।
খ. নির্বাচন প্রক্রিয়া বিষয়ক সুপারিশ
৮. নির্বাচনে প্রার্থীদের বিপুল অর্থ ব্যয় নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব না হলে, লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরি হবে না। প্রার্থীর আয় ব্যয়ের হিসাব তদন্ত করার কার্যকরী পদ্ধতি ও দল কর্তৃক প্রার্থীর মনোনয়ন প্রক্রিয়া কঠোর নজরদারির আওতায় আনার প্রস্তাব করছি।
৯. প্রার্থী পরিচিতির জন্য প্রচারের দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের। এজন্য সংশ্লিষ্ট নির্বাচনী এলাকায় সকল প্রার্থীর নাম, প্রতীক, দল, সংক্ষিপ্ত পরিচিতি ইত্যাদি সম্বলিত যৌথ পোষ্টার, ব্যানারের মত প্রচার সামগ্রী নির্দিষ্ট পরিমাণে নির্বাচন কমিশন কর্তৃক ছাপানো ও সমহারে প্রার্থীদের নিকট বণ্টন করতে হবে। প্রার্থীরা নিজ দায়িত্বে, নির্বাচনী বিধি মোতাবেক তা লাগানো বা বিলির ব্যবস্থা করবেন। নির্বাচন কমিশনের সরবরাহকৃত সামগ্রীর বাইরে প্রার্থীর নিজস্ব কোনো প্রচার সামগ্রী ব্যবহারের সুযোগ থাকবে না।
১০. প্রতিটি নির্বাচনী এলাকায় রিটার্নিং অফিসার/ নির্বাচন/ উপজেলা কর্মকর্তার ব্যবস্থাপনায় কমপক্ষে পাঁচটি ভিন্ন ভিন্ন নির্বাচনী জনসভা আয়োজনের করতে পারে। যেখানে আচরণ বিধি মেনে প্রত্যেক প্রার্থীর বক্তব্য দেওয়ার সমান সুযোগ থাকবে। অনুমতি সাপেক্ষে একটিমাত্র একক জনসভা করার অনুমোদন থাকবে।
১১. বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রের জন্য এবসেন্টিং ব্যালট, মেইলিং পোলিং, এডভান্স পোলিং, অনলাইন পোলিং সিস্টেম ইত্যাদি আধুনিক নির্বাচনী পদ্ধতি চালু করার প্রস্তাব করা হয়েছে। এতে প্রবাসী ও নির্বাচনী এলাকায় অনুপস্থিত থাকা ভোটারদের, বিশেষ করে নির্বাচন সংশ্লিষ্ট দায়িত্বে নিয়োজিত ভোটারদের ভোটাধিকার প্রয়োগের দ্বার উন্মুক্ত হবে।
১২. ইভিএম ব্যবহার করে ভোটাধিকার প্রয়োগের জন্য জাতি প্রস্তুত নয়। তাছাড়া পদ্ধতিটি সারা বিশ্বের মত আমাদের দেশেও বিতর্কিত ও এখন পর্যন্ত জনগণের আস্থা অর্জন করতে সক্ষম হয়নি। তাই বাংলাদেশ মুসলিম লীগ ইভিএম ব্যবহার সমর্থন করে না।
১৩. প্রবাসে অবস্থানরত আনুমানিক ৭ শতাংশ জনগণ ভোটাধিকার বঞ্চিত থাকায় নির্বাচন পদ্ধতি কোনোভাবেই শতভাগ অংশগ্রহণমূলক থাকছে না। প্রবাসীদের নাম দ্রুততম সময়ে ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্তির ব্যবস্থা নিতে ও তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগের বাস্তবসম্মত ব্যবস্থা গ্রহণ করার সুপারিশ করা হয়।
১৪. ভোট দেওয়ার সুবিধার্থে ভোটারের ক্রমিক নম্বর, ভোট কেন্দ্রের নাম, বুথ নাম্বার ইত্যাদি তথ্য ভোটারদের সহজে জেনে নেওয়ার জন্য এন্ড্রয়েড ও ওয়েব বেসড এপ্লিকেশন তৈরির বিষয়টি চিন্তা করা যেতে পারে।
১৫. ভোটার তালিকা পিডিএফ (সফট কপি) ও ছাপানো (হার্ড কপি) উভয় প্রকরণে বিনামূল্যে প্রার্থীদের সরবরাহ করার প্রস্তাব করছি।
১৬. প্রতিটি ভোট কেন্দ্র, ভোট গণনা কক্ষ ও ফলাফল ঘোষণা কক্ষ সি. সি/ আই.পি ক্যামেরার আওতায় নিয়ে আসার সুপারিশ করছি। প্রতিটি নির্বাচনী এলাকার সি.সি/ আই.পি ক্যামেরা মনিটরিং সেলের সঙ্গে প্রোজেক্টর সংযুক্ত করে উন্মুক্ত স্থানে, সর্বসাধারণকে প্রদর্শনের ব্যবস্থা রাখার সুপারিশ করছি।
১৭. বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়া এখন বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই একটি সাজানো নাটক। তাই পরিস্থিতি বিবেচনায় স্থানীয় সরকার নির্বাচন ব্যবস্থায় দলীয় মনোনয়ন ও প্রতীক পদ্ধতি বাতিল করার এবং বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়ার সর্বনাশা সংস্কৃতি রুখে দিতে ‘না’ ভোট প্রচলন করা।
১৮. একাধিক প্রতীকে ভোট প্রদান করা হলে ভোটটি বাতিল ঘোষণা না করে বরং ‘না’ ভোট হিসাবে গণ্য করার প্রস্তাব।
১৯. জোটবদ্ধভাবে নির্বাচনের ক্ষেত্রে নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলগুলোর প্রার্থীদের নিজ নিজ দলের নিবন্ধিত প্রতীক নিয়ে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করা বাধ্যতামূলক করতে হবে।

