বাংলাদেশ সড়ক ও জনপথ অধিদফতরের তথ্যানুযায়ী, ঢাকা থেকে পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া হয়ে বেনাপোলের বর্তমান দূরত্ব ২৭৮ কিলোমিটার। এই পথে যেতে চলাচলে সময় লাগে অন্তত ৮ থেকে ৯ ঘণ্টা। মূলত ফেরি পারাপারেই লাগে দীর্ঘসময়। আর প্রাকৃতিক দুর্যোগ দেখা দিলে, এই সময় বেড়ে যায় আরো কয়েক ঘণ্টা। ফলে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল হয়ে ঢাকামুখী আসা পণ্য পৌঁছাতে বিলম্ব হয়। পঁচনশীল পণ্য নষ্ট হয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হোন ব্যবসায়ীরা। সময়মতো পৌঁছাতে পারে না স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত পণ্যও। পদ্মা সেতু চালু হলে এই সংকট কেটে যাবে বলে মনে করছেন ব্যবসায়ীরা। পাশাপাশি কমে যাবে দূরত্ব।
গুগল ম্যাপের মাধ্যমে দেখা যাচ্ছে, ঢাকা থেকে যশোরের বেনাপোল পর্যন্ত যে ২৭৮ কিলোমিটার পথ রয়েছে। পদ্মা সেতু খুলে দেয়া হলে এই সেতু দিয়ে মাওয়া হয়ে ঢাকা-বেনাপোলের দূরত্ব হবে মাত্র ১৮৫ কিলোমিটার। ফলে পদ্মা সেতুর কারণে এই রুটে দূরত্ব কমবে ৯৩ কিলোমিটার। সময় বাঁচবে অন্তত ৫ ঘন্টা। অর্থাৎ সেতুটি চালু হলে ঢাকা থেকে বেনাপোল পৌঁছানো যাবে মাত্র চার থেকে সাড়ে চার ঘণ্টায়।
যোগাযোগ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই রুটে শুধু দূরত্বই কমাবে না, বাড়বে আমদানি রফতানি। এ প্রসঙ্গে যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. শামসুল হক বলেন, একটি দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থা সহজ হলে অর্থনীতিতে দ্রুত সমৃদ্ধ হওয়া যায়। যোগাযোগ সহজ হওয়ায় দেশের শুধুমাত্র দক্ষিণাঞ্চল-পশ্চিমাঞ্চল দিয়ে যেসব পণ্যের আমদানি রফতানি হয়ে থাকে তা বাড়বে। পণ্য যেমন দ্রুত পৌঁছাতে পারবে, তেমনই পরিবহন খরচ কমে আসবে। কৃষকরা উৎপাদিত পণ্য কম সময়ে ঢাকাসহ অন্যান্য বাজারে বিক্রি করার সুযোগ হবে। তারা ন্যায্য দামও পাবেন। এতে প্রসারিত হবে কৃষিপণ্যের বাজার।
শুধু কাঁচা পণ্যই নয়, পদ্মা সেতু আরো অনেক কারণে গুরুত্বপূর্ণ। তৈরি পোশাক শিল্প ব্যবসায়ীরা বলছেন, গার্মেন্টস শিল্পের কাঁচামাল আমদানির সিংহভাগ যশোরের বেনাপোল বন্দর দিয়ে দেশে প্রবেশ করে। এ প্রসঙ্গে বিজিএমই এর সাবেক সভাপতি তৈরি পোশাক শিল্প ব্যবসায়ী আতিকুল ইসলাম বলেন, পোশাক শিল্পের প্রায় ৮০ থেকে ৮৫ ভাগ কাঁচামালই আমদানি করা হয়। যা বেনাপোল বন্দরের মাধ্যমে আসে। পাটুরিয়া- দৌলতদিয়া ফেরির কারণে বেশিরভাগ সময়ই ঠিক সময়ে কারখানাগুলোতে পৌঁছাতে পারে না। ঝড় বন্যা হলে তো কথাই নেই। দীর্ঘসময় কেটে যায় রাস্তায়। এতে সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, প্রচুর পরিমানে পরিবহন খরচ হয়। পদ্মা সেতু চালু হয়ে গেলে পরিবহন খরচ কমবে, যথাসময়ে পণ্য পৌঁছাবে।
পেঁয়াজ ও চাল আমদানিকারক ইসমাইল হোসেন জানান, পণ্য কিনে তা ঢাকাসহ অন্যান্য স্থানে পৌঁছানোর ক্ষেত্রে পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া ফেরি ছিল অন্যতম ভোগান্তির নাম। অন্যদিকে বেনাপোল থেকে পণ্য নিয়ে যমুনা সেতু ব্যবহার করলে আবার দূরত্ব বেড়ে যায়। তাতে বাড়ে পরিবহন খরচ। সব মিলিয়ে পদ্মা সেতু এই ভোগান্তি দূর করবে।
কাস্টমস সূত্রে জানা গেছে, প্রতিবেশী দেশ ভারত থেকে প্রতিদিন ৭ থেকে ৮শ পণ্যবাহী যানবাহন বেনাপোল বন্দর দিয়ে প্রবেশ করে বাংলাদেশে। সরকার এখান থেকে আয় করে সাড়ে ৬ হাজার কোটি টাকা। সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী ও সরকারি কর্মকর্তারা বলছেন, পদ্মা সেতু চালু হলে আমদানি রফতানি যেমন বাড়বে, তেমনই বাড়বে রাজস্ব আয়ের পরিমান।
আমদানি-রফতানির বাইরেও এই রুটে ভারত-কোলকাতার মধ্যে চলাচল করে বেশ কয়েকটি বাস। এ প্রসঙ্গে শ্যামলী পরিবহনের কর্ণধার অবনী কুমার ঘোষ জানান, সেতু চালু হলে এ পথে সময় অন্তত চার ঘণ্টা কমে আসবে। ভোগান্তি কমবে যাত্রীদের। বাড়বে যাত্রী সংখ্যাও।

