কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ীতে একটি সেলুনে ইয়াবা উদ্ধারের ঘটনায় আটক এক কলেজ শিক্ষককে স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যানের জিম্মায় ছেড়ে দিলেও নরসুন্দরকে (নাপিত) পুলিশে দেয়ার অভিযোগ উঠেছে বিজিবি সদস্যদের বিরুদ্ধে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, ইয়াবা ব্যবসায় ওই শিক্ষক ও নরসুন্দর দুই জনই জড়িত থাকলেও অর্থের বিনিময়ে ওই কলেজ শিক্ষককে ছেড়ে দেয়া হয়েছে। তবে বিজিবি এ অভিযোগ অস্বীকার করেছে। গত শনিবার (১৪ মে) দিবাগত রাত সাড়ে ১২ টার দিকে উপজেলার সীমান্তবর্তী বালারহাট বাজারে এ ঘটনা ঘটে।
আটক নরসুন্দরের নাম নিমাই চন্দ্র শীল (৪২) এবং কলেজ শিক্ষকের নাম তৈয়ব আলী (৪২)। তারা দুজনই বাল্যবন্ধু বলে জানা গেছে।
নিমাই চন্দ্র শীল উপজেলার নাওডাঙা ইউনিয়নের নাওডাঙা গ্রামের মৃত পোয়াতু চন্দ্র শীলের ছেলে। আর তৈয়ব আলী একই ইউপির কুরুষাফেরুষা গ্রামের মৃত ময়নুদ্দিনের ছেলে। তিনি বালারহাট আদর্শ স্কুল এন্ড কলেজের ব্যবস্থাপনা বিভাগের প্রভাষক হিসেবে কর্মরত।
স্থানীয়রা জানান, শনিবার দিবাগত রাত সাড়ে ১২ টার দিকে উপজেলার বালারহাট বাজারে নরসুন্দর নিমাই চন্দ্র শীল তার দোকানে একই এলাকার বালারহাট আদর্শ স্কুল এন্ড কলেজের প্রভাষক তৈয়ব আলীসহ সেলুনের সাটার বন্ধ করে ভেতরে অবস্থান করছিলেন। এসময় বিজিবি ওই সেলুনে অভিযান চালায়। সেলুনে তল্লাশি চালিয়ে সেলুনের বৈদ্যুতিক সুইচ বোর্ডের ফাঁকে একটি প্যাকেটে মোড়ানো অবস্থায় ২৬ পিচ ইয়াবা উদ্ধার করে বিজিবি। এ ঘটনায় নিমাই চন্দ্র ও তৈয়ব আলীকে আটক করে বিজিবি। খবর পেয়ে স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান ও বালারহাট আদর্শ স্কুল এন্ড কলেজের ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি হাসেন আলী ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে মুচলেকা দিয়ে প্রভাষক তৈয়ব আলীকে নিজ জিম্মায় ছাড়িয়ে নেন। পরে বিজিবি নরসুন্দর নিমাইকে আটক করে ফুলবাড়ী থানা পুলিশে হস্তান্তর করে। পুলিশ রবিবার দুপুরে নিমাইকে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠায়।
স্থানীয়দের অভিযোগ, শিক্ষক তৈয়ব আলীর মামার বাড়ি উপজেলার খালিশাকোটাল সীমান্তে। তৈয়ব আলী ওই সীমান্ত পথে ভারত থেকে ইয়াবা এনে তার বন্ধু নরসুন্দর নিমাইয়ের মাধ্যমে বিক্রি করেন। এ ঘটনায় চেয়ারম্যানের মাধ্যমে আর্থিক লেনদেন হওয়ায় বিজিবি শিক্ষক তৈয়ব আলীকে ছেড়ে দিয়েছে। বলির পাঠা হয়েছে শুধু নরসুন্দর নিমাই।
নিমাইয়ের ছোট ভাই নিরঞ্জন চন্দ্র শীল বলেন, আমার ভাইকে ফাঁসানো হয়েছে। টাকার বিনিময়ে তৈয়বকে ছেড়ে দিয়ে বিজিবি শুধু আমার ভাইকে ফাঁসিয়েছে। অথচ এলাকার অনেকে বলছে, তৈয়ব আলী মাদক কারবারের সাথে জড়িত।
অভিযুক্ত শিক্ষক তৈয়ব আলী মাদকের সাথে নিজের সম্পৃক্ততার বিষয়টিকে ভিত্তিহীন বলে দাবি করেছেন। তিনি বলেন, সীমান্তে আমার মামার বাড়ি হলেও আমি দুই মাসেও একবার সীমান্তের দিকে যাই না। মাদক বিষয়ে আমার কোনো ধারণাও নেই।
মধ্যরাতে সেলুনে থাকার বিষয়ে তৈয়ব আলী বলেন, সেদিন আমার স্ত্রীর জন্য ট্রেনের টিকিটের টাকা পাঠানোর জন্য বাজারে অপেক্ষা করছিলাম। নিমাই আমার বাল্যবন্ধু। তাই তার দোকানে অপেক্ষা করছিলাম। হঠাৎ ঝড় বৃষ্টি শুরু হলে দোকানের সাটার নামিয়ে দেয়া হয়েছিল।
সেলুন থেকে ইয়াবা উদ্ধারের ঘটনা স্বীকার করলেও এ ঘটনায় তার বন্ধু নিমাই জড়িত কিনা তা নিশ্চিত নন বলে জানান তিনি।
বিজিবি ১৫ ব্যাটালিয়নের কোম্পানি কমান্ডার সুবেদার আশরাফ আলী সাটার বন্ধ থাকা অবস্থায় দোকানের ভেতর থেকে শিক্ষক ও নরসুন্দরকে আটকের বিষয়টি স্বীকার করেছেন। তবে তিনি আর্থিক লেনদেনের বিষয়টি অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, ওই রাতে দোকানের ভেতর নিমাই ও তৈয়ব আলী দুই জনকেই পাওয়া গেছে। তাদের দেহ তল্লাশি করে কোনো কিছু পাওয়া না গেলেও দোকানের সুইচ বোর্ডের আড়ালে ২৬ পিচ ইয়াবা পাওয়া যায়। পরে স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যানসহ অনেকে কলেজ শিক্ষককে ছেড়ে দেয়ার অনুরোধ করলে চেয়ারম্যানের জিম্মায় তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়। যেহেতু সেলুনের ভেতর ইয়াবা পাওয়া গিয়েছে এজন্য নরসুন্দর নিমাইয়ের বিরুদ্ধে মামলা দিয়ে তাকে পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
চেয়ারম্যানসহ অনেকে বলছিলেন ওই কলেজ শিক্ষক বৃষ্টির কারণে ভেতরে অপেক্ষা করছিলেন। তিনি মাদকের সাথে জড়িত নন। আমরাও নির্দোষ কাউকে হয়রানী করতে চাইনি। এজন্য তাকে চেয়ারম্যানের জিম্মায় ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। এখানে অন্য কোনো বিষয় নেই। যোগ করেন সুবেদার আশরাফ।
ইউপি চেয়ারম্যান হাসেন আলী বলেন, কোনো আর্থিক লেনদেনের ঘটনা ঘটেনি। ওই প্রভাষক যে কলেজের শিক্ষক আমি সে কলেজের সভাপতি। তার বিরুদ্ধে আগে কখনও মাদকের সাথে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ পাইনি। সে ওই দোকানে বৃষ্টির কারণে আটকা পড়েছিল। এজন্য বিজিবিকে অনুরোধ করে তাকে ছাড়িয়ে নিয়েছি।
ওই শিক্ষকের বিরুদ্ধে স্থানীয়দের অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে চেয়ারম্যান বলেন, এসব বিষয়ে জানতে ওই শিক্ষককে শোকজ করার নির্দেশ দিয়েছি। কলেজের শিক্ষক প্রতিনিধিকে আহবায়ক করে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি করা হয়েছে। কমিটিকে সাত কর্মদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে।
সার্বিক বিষয় নিয়ে জানতে চাইলে লালমনিরহাট বিজিবি ১৫ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেনেন্ট কর্নেল এসএম তৌহিদুল আলম বলেন, বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হবে।

