জাহিদ হাসান সোহান, চৌগাছা: যশোরের চৌগাছার কপোতাক্ষ পাড়ের মানুষের দীর্ঘদিনের স্বপ্ন পূরণের পথে, কপোতাক্ষ নদ খনন প্রকল্প শুরু হলেও খননের কার্যক্রম নিয়ে রীতিমত নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে জনমনে। গড়ে মাত্র ৪২ মিটার নদের প্রস্থে (আড়) খনন করা হচ্ছে। নদ পাড়ের বাসিন্দারা উচ্চস্বরে অভিযোগ করছেন নদের চিত্র পাল্টে যেন বানানো হচ্ছে খাল।
কয়েক শত কোটি টাকা ব্যয়ে নদ খননের এমন কার্যক্রম কতটুকু টিকবে তা নিয়ে দেখা দিয়েছে শংকা। ধারণা করা যাচ্ছে, একটি বা দুটি বর্ষাকাল অত্রিক্রান্ত হলেই দুই পাড়ের মাটি পুনরায় ধ্বসে যাবে নদে। এই অবস্থায় আরো সঠিক পরিকল্পনা ও প্রয়োজীয় ব্যবস্থা নিতে কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি কামনা করেছেন এলাকাবাসি।
মহাকবি মাইকেল মধুসুদন দত্তের কপোতাক্ষ নদ এক সময় ছিল প্রমত্তা। চুয়াডাঙ্গার মাথাভাঙ্গা নদী থেকে কপোতাক্ষের উৎপত্তি হয়ে উপজেলার উপর দিয়ে বয়ে গেছে। পর্যায়ক্রমে বিভিন্ন উপজেলা পার হয়ে দক্ষিণে বঙ্গোপসাগরে মিলিত হয়েছে নদটি। মরা খালে পরিনত হওয়া নদটি বর্জ্য নিরোসন প্রকল্পের আওতায় খননের উদ্যোগ গ্রহণ করেন সরকার। ২০২০-২০২১ অর্থবছরে প্রধমধাপের কার্যক্রম উদ্বোধন করা হয়েছিল। বর্তমানে চলছে দ্বিতীয় ধাপের কাজ।
যশোর পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, উপজেলার হাকিমপুর ইউনিয়নের তাহেরপুর গ্রাম থেকে মনিরামপুরের খদ্দেরঘাট পর্যন্ত ৭৯ কিলোমিটার কপোতাক্ষ নদটি খননের আওতায় রয়েছে।
নদের প্রস্থে (আড়) গড়ে ৪২ মিটার আর গভীরতা গড়ে ৮ ফিট পর্যন্ত খনন করা হচ্ছে। গত অর্থ বছরের শেষ সময়ে এসে পৌরসভার হুদা-চৌগাছা মহল্লার নিচ থেকে নদ খনন কাজ শুরু হলেও বৃষ্টি কারনে তা বন্ধ হয়ে যায়। চলতি অর্থ বছরে নদের পানি কমতে থাকলে পুনরায় শুরু হয় খননকাজ। বর্তমানে উপজেলার ধুলিয়ানী ইউনিয়নের অংশ থেকে নদ খনন শুরু করে চৌগাছা পৌর এলাকা হয়ে পাশ্ববর্তী হাকিমপুর অভিমুখে খনন কাজ চালানো হচ্ছে।
চৌগাছা বাজারের পাশে নদের অংশেও খননের কাজ শুরু হয়েছে। দেখা গেছে পৌর এলাকার বাবুঘাট থেকে শুরু করে জেলা পরিষদ ডাকবাংলো পর্যন্ত নদের জমি দখলে রয়েছে। অবৈধ দখলদারদের কবলে হতে উদ্ধার হচ্ছে না নদীর জমি।
সরেজমিন নদ খননের দৃশ্য ঘুরে দেখা গেছে, নদের মধ্যে পানি থাকার কারনে শুকনা জমিতে এক্সেমিটার বসিয়ে নদ থেকে কাদামাটি তুলে স্তুপ করা হচ্ছে। পানি থাকার কারনে সঠিক ভাবে খনন হচ্ছে কিনা সেটি নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন নদ পাড়ের বাসিন্দরা। তারা বলেন, পানির মধ্যে এক্সেমিটার দিয়ে খনন কাজ অন্ধকারে সুই খোঁজার মত অবস্থা। কারন পানির মধ্যে দেখে মাটি কাটা সম্ভব না। ফলে অনায়াসে ফাঁকি দেয়া সম্ভব।
নদ পাড়ের বাসিন্দা স্বপন কুমার, কৃষ্ণ কুমার, হায়দার আলী, রাশিদুল ইসলাম, আজগর আলী, আব্দুস সামাদসহ একাধিক ব্যক্তি অভিযোগ করে বলেন, নদ খননে শুভঙ্করের ফাঁকি দেয়া হচ্ছে। নদের মানচিত্র পাল্টে খাল বানানো হচ্ছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন ব্যক্তি জানান, নিয়ম অনুযায়ী নদ খনন হচ্ছেনা। কতটুকু আড় কতটুকু গভীরতা তা কেউ জানেনা। বিষয়টি সঠিক তদারকি না করা হলে সরকারের কোটিকোটি টাকা লোপাট হবে। ইতোমধ্যে প্রথম ধাপের কতটাকা উত্তোলন হয়েছে বা কত টাকার কাজ হয়েছে সেটিও খতিয়ে দেখা দরকার বলে অনেকে জানান। অসন্তোষ প্রকাশ করেছে নদী বাঁচাও আন্দোলনের নেতারাও।
তথ্য সৈনিক আশারফ হোসেন বলেন, যেভাবে নদ খনন করা হচ্ছে তাতে দুই এক বছরের মধ্যে পাড়ের মাটি ধ্বসে নদে পড়বে। সে কারনে স্থায়ী পরিকল্পনার মাধ্যমে নদের পাড়ে খেজুর গাছ, সুপারি, তাল, নারিকেল গাছ লাগানো দরকার।
নদ খননের বিষয়ে যশোর পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপ-সহকারী প্রকৌশলী মোঃ ইয়াকুব আলী খানের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন. দ্বিতীয় ধাপে কপোতাক্ষ নদে খননের কাজ চলছে। চৌগাছার তাহেরপুর থেকে মনিরামপুরের খদ্দেরঘাট পর্যন্ত ৭৯ কিলোমিটার খননের আওতায় রয়েছে। নদের প্রস্থে গড়ে আমরা ৪২ মিটার পর্যন্ত খনন করছি। তিনি বলেন, আমরা উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে নিয়মমাফিক খনন কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছি। কাজে কোন অনিয়ম নেই।
জাগো/এমআই

