রাজাকারদের তালিকা তৈরিতে বিদ্যমান সংসদীয় সাব-কমিটি বাতিল করে নতুন কমিটি গঠন করা হয়েছে। আগের কমিটির নিয়মিত কোরাম না হওয়ায় আকার ছোট করতে নতুন এই সাব-কমিটি গঠন করা হয়।
বুধবার জাতীয় সংসদ ভবনে অনুষ্ঠিত মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটিতে নতুন কমিটি গঠন করা হয়েছে।
কমিটির সভাপতি শাজাহান খান বলেন, আমাদের আগের কমিটির আকার বড় ছিল, যার কারণে বৈঠকে কোরাম পূরণ হতো না। এজন্য আমরা ওই কমিটি ভেঙে তিন সদস্যের সাব-কমিটি গঠন করেছি।
আগের সাব-কমিটির মতো শাজাহান খান নতুন কমিটির আহবায়ক হয়েছেন। দুই সদস্য হলেন- জাতীয় পার্টির কাজী ফিরোজ রশীদ ও আওয়ামী লীগের ক্যাপ্টেন (অব.) এবি তাজুল ইসলাম। এর আগে রাজাকারদের তালিকা তৈরিতে ২০২০ সালের ৯ আগস্ট সাব-কমিটি গঠন করা হয়েছিল।
শাজাহান খানের নেতৃত্বাধীন ওই সাব-কমিটির অন্য সদস্যরা ছিলেন- স্থায়ী কমিটির সদস্য রফিকুল ইসলাম বীরউত্তম, রাজিউদ্দিন আহমেদ রাজু, ক্যাপটেন (অব) এবি তাজুল ইসলাম, ওয়ারেসাত হোসেন বেলাল ও মোসলেম উদ্দিন আহমেদ।
কমিটির সভাপতি জানান, সাব-কমিটি গঠনের পর রাজাকার, আলবদর, আলশামসদের তালিকা চেয়ে জেলা প্রশাসকদের চিঠি দেয়া হয়েছিল; কিন্তু জেলা থেকে যে তালিকা সরবরাহ করা হয়েছিল, তার বেশিরভাগই আমাদের কাছে গ্রহণযোগ্য মনে হয়নি। অনেক জেলায় রাজাকার নেই- এমন তথ্য জানানো হয়। এটি কোনোভাবেই বিশ্বাসযোগ্য নয়।
এদিকে সরকারি ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির সভাপতি ও রাজাকারদের তালিকা তৈরিতে গঠিত সাব-কমিটির প্রধান শাজাহান খান তার নিজস্ব ব্যবস্থাপনায়ও তৃণমূল পর্যায় থেকে রাজাকারদের তালিকা সংগ্রহ করছেন। এক্ষেত্রে সম্মিলিত মুক্তিযোদ্ধা সংসদের মাধ্যমে এই তালিকা সংগ্রহ করছেন। ওই সংগঠনের পক্ষ থেকে মুক্তিযুদ্ধকালীন কমান্ডারদের চিঠি দিয়ে তাদের অধিক্ষেত্রের রাজাকারদের তালিকা সরবরাহের অনুরোধ করা হয়। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়নে গঠিত সংগঠন সম্মিলিত মুক্তিযোদ্ধা সংসদের আহবায়ক শাজাহান খান। ওই সংগঠনের মাধ্যমে ১৩০টি উপজেলা থেকে রাজাকারদের তালিকা সংগ্রহ করা হয়েছে বলেও বুধবারের বৈঠক শেষে শাজাহান খান জানান। তিনি বলেন, ‘ওই তালিকা অধিকতর যাচাইয়ের জন্য আবার তাদের কাছে পাঠিয়েছি। ওই তালিকা এলে সেটি যাচাই-বাছাই করে সংসদীয় কমিটির মাধ্যমে মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে। পরে মন্ত্রণালয় থেকে পর্যায়ক্রমে রাজাকারদের তালিকা প্রকাশ করা হবে।
স্বাধীনতা যুদ্ধে বিরোধিতাকারী রাজাকারদের তালিকা প্রস্তুত করেছে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়। এসব তালিকার আংশিক সংসদীয় কমিটিতে জমা দিয়েছে মন্ত্রণালয়। সেই তালিকায় দেখা গেছে ২ হাজার ৫০৪ জন রাজাকার রয়েছে। বিভাগভিত্তিক পর্যালোচনা করে দেখা গেছে রংপুর বিভাগে ১৬০৭ জন রাজাকার রয়েছে। এ ছাড়া অন্যান্য জেলার মধ্যে মেহেরপুরে রাজাকারের সংখ্যা ২১৬ জন। তালিকা অনুযায়ী বৃহত্তর রংপুরে সবচেয়ে বেশি রাজাকার। রংপুর বিভাগের নীলফামারী জেলার ডিমলা থানায় রাজাকার রয়েছে ২৩৯, ডোমার থানায় ৩৩৬, সদর থানায় ৩২৯, জলঢাকায় ৩১২, কিশোরগঞ্জে ১৫১, সৈয়দপুরে ২২৩ এবং লালমনিরহাটের হাতীবান্ধায় রাজাকার রয়েছে ১৭ জন। মোট ১৬০৭ জন রাজাকার শুধু রংপুর বিভাগেই। অন্য জেলার মধ্যে চাঁদপুরে রাজাকার রয়েছে ৯, মেহেরপুরে ২১৬, যশোরের কেশবপুরে ১২৬, শরীয়তপুরে ৪১, বাগেরহাটে ১, নড়াইলে ৫০, রংপুরের পীরগাছায় ৩৫, ঢাকার গেন্ডারিয়ায় ২, বরিশালের বানারীপাড়ায় ৮২, সিরাজগঞ্জ সদরে ৩, ময়মনসিংহের পাগলা ও গফরগাঁও এলাকায় ২৬, চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়ায় ১৮৩, সিরাজগঞ্জ পৌরসভায় ও সাথিয়া থানায় ৩, বাগেরহাটের কচুয়ায় একজন, সাতক্ষীরার শ্যামনগরে ৭, কলারোয়ায় ৭৫, লক্ষ্মীপুরের রায়পুরায় ২৯, সুনামগঞ্জ সদরে ৪, পাবনার বেড়া উপজেলায় ২, কুড়িগ্রামের উলিপুরে ১, চাঁদপুরের মতলব উত্তরে ১ জন। রাজাকার নেই যেসব জেলায়- খাগড়াছড়ি, মাগুরা, শেরপুর, গাইবান্ধা, রাজবাড়ী, পটুয়াখালী জেলায়।
এদিকে বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণা সম্প্রচারকারী চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতারকেন্দ্রে স্মৃতিস্তম্ভ তৈরির লক্ষ্যে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়কে চারটি চিঠি দেয়া হলেও তাতে সাড়া না দেয়ায় অসন্তোষ প্রকাশ করেছে সংসদীয় কমিটি। কমিটির সভাপতি এ বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, তারা কেন চিঠির জবাব দেননি, তার ব্যাখ্যা চেয়ে চিঠি দেয়ার সুপারিশ করেছেন।
বৈঠকে সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সুপারিশগুলো বাস্তবায়ন/অগ্রগতির সুনির্দিষ্ট তথ্য না থাকায় কমিটি অসন্তোষ প্রকাশ করেছে।
শাজাহান খানের সভাপতিত্বে বৈঠকে কমিটির সদস্য মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক, আবুল হাসানাত আবদুল্লাহ, মেজর (অব) রফিকুল ইসলাম বীরউত্তম, এবি তাজুল ইসলাম ও কাজী ফিরোজ রশীদ অংশগ্রহণ করেন।

