জুলাই গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী পরিবর্তিত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে আগামী ১৩ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। মঙ্গলবার (১০ ফেব্রুয়ারি) সকালে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রচারণা শেষ হওয়ার পর যশোর-৩ (সদর) আসনে এখন বইছে ভিন্ন হাওয়া। দীর্ঘ ১৭ বছর পর আওয়ামী লীগমুক্ত পরিবেশে এই আসনে বিএনপির শক্তিশালী প্রত্যাবর্তনের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। মাঠপর্যায়ের বিশ্লেষণে ধানের শীষের প্রার্থী অনিন্দ্য ইসলাম অমিতের অবস্থান অনেকটা সুবিধাজনক বলে মনে করছেন স্থানীয় ভোটার ও রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা।
যশোর সদর আসনে মোট ৬ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলেও মূল লড়াই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে বিএনপির অনিন্দ্য ইসলাম অমিত ও জামায়াতে ইসলামীর আব্দুল কাদেরের মধ্যে। তবে সংগঠিত প্রচারণা এবং উন্নয়নভিত্তিক অঙ্গীকারের কারণে অমিত জনসমর্থনে এগিয়ে রয়েছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। অন্যান্য প্রার্থীরা হলেন— রাশেদ খান (সিপিবি), নিজামউদ্দিন অমিত (জাগপা), মাওলানা শোয়াইব হোসেন (ইসলামী আন্দোলন) এবং মো. খবির গাজী (জাতীয় পার্টি)।
তরিকুল ইসলামের ‘উন্নয়ন লিগ্যাসি’ ও অমিতের অঙ্গীকার
যশোর সদরের ভোটারদের মুখে আজও ঘুরেফিরে আসছে সাবেক মন্ত্রী প্রয়াত তরিকুল ইসলামের নাম। ২০০১ সালে বিএনপি জোট সরকারের সময় যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল কলেজ এবং করোনারি কেয়ার ইউনিটের মতো মেগা প্রকল্পগুলো তার হাত ধরেই বাস্তবায়িত হয়েছিল।
পিতার সেই উন্নয়নের ধারাকে রাজনৈতিক পুঁজি হিসেবে ব্যবহার করছেন অনিন্দ্য ইসলাম অমিত। তিনি তার নির্বাচনী অঙ্গীকারকে ‘সামাজিক চুক্তি’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। অমিতের প্রতিশ্রুতিগুলোর মধ্যে রয়েছে:
* যশোরকে সন্ত্রাস ও মাদকমুক্ত করা।
* ৫০০ শয্যার হাসপাতাল ও কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন।
* আধুনিক মডেল শহর ও হার্ট ফাউন্ডেশন গড়ে তোলা।
* চাকরির ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও মেধাভিত্তিক নিয়োগ নিশ্চিত করা।
জামায়াতের অবস্থান ও অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগ
জামায়াত প্রার্থী আব্দুল কাদেরও শহর ও গ্রামগঞ্জে ব্যাপক গণসংযোগ চালিয়েছেন। দুর্নীতি ও দখলদারমুক্ত ‘ইনসাফভিত্তিক’ সমাজ গঠনের ডাক দিয়েছেন তিনি। তবে প্রচারণার শেষ মুহূর্তে অমিত অভিযোগ তুলেছেন যে, জামায়াত কর্মীরা ধর্মকে ব্যবহার করে অপপ্রচার চালাচ্ছে। অন্যদিকে জামায়াত প্রার্থীর দাবি, মানুষ এবার নতুন ও সৎ নেতৃত্ব চায়।
যশোর সদরের ১৪টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভার ৬ লাখ ১৩ হাজার ৪৬২ জন ভোটার এবার নির্ধারণ করবেন তাদের ভবিষ্যৎ প্রতিনিধি। স্থানীয় বাসিন্দা হৃদয় মন্ডল ও গৃহবধূ নাজমুন নাহারের মতো অনেকের মতে, তরিকুল ইসলামের অসমাপ্ত কাজগুলো তার সুযোগ্য উত্তরসূরি অমিতই সম্পন্ন করতে পারবেন—এমন বিশ্বাস থেকে ধানের শীষের জনসমর্থন বাড়ছে। বিশেষ করে তরুণ ভোটাররা অমিতের আধুনিক কর্মসংস্থান ও উন্নয়নের প্রতিশ্রুতিতে উদ্বেলিত।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সাংগঠনিক দৃঢ়তা, তরিকুল ইসলামের ব্যক্তিগত ইমেজ এবং দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ থেকে বিএনপির ভোটব্যাংক এবার অনেক বেশি সক্রিয়। ২০১৮ সালের নির্বাচনে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড না থাকার আক্ষেপ ঘুচিয়ে এবার আসনটি পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যেই এগোচ্ছে বিএনপি।
এখন দেখার বিষয়, আগামী বৃহস্পতিবার ব্যালট যুদ্ধের চূড়ান্ত ফলাফলে যশোর-৩ আসনে রাজনৈতিক পালাবদলের এই সম্ভাবনা কতটা বাস্তব রূপ নেয়।

