ঢাবি ও জাবি নির্বাচনে শিবিরের জয়: তরুণদের ‘কৌশলগত ভোট’ ও জাতীয় রাজনীতির পূর্বাভাস?

আরো পড়ুন

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি) ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) ছাত্র সংসদ নির্বাচনে ইসলামী ছাত্রশিবিরের অপ্রত্যাশিত জয় রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। নির্বাচনের সময় অনিয়মের অভিযোগ উঠলেও এই ফলাফলকে একটি বড় রাজনৈতিক বার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে, যা বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক ধরনের মোড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

এমনকি প্রভাবশালী আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম দ্য ডিপ্লোম্যাট-ও এই ফলাফলকে গুরুত্ব দিয়ে দেখেছে। একটি নিবন্ধে পত্রিকাটি লিখেছে, যেভাবে ছাত্রশিবির ক্যাম্পাসে জয়লাভ করছে, একই কারণে বিএনপিও জাতীয় নির্বাচনে জয়লাভ করতে পারে। নিবন্ধে সতর্ক করা হয়েছে যে এই ফলাফল ছাত্ররাজনীতিতে ইসলামপন্থীদের আধিপত্যের প্রত্যাবর্তনের ইঙ্গিত বহন করে, যা জাতীয় রাজনীতিকেও প্রভাবিত করতে পারে।
ভোটের নতুন কৌশল: ‘জেনারেশন জেড’-এর চাল
নিবন্ধটিতে বলা হয়, এই জয় শুধুমাত্র ইসলামপন্থার উত্থান নয়। বরং এটি “জেনারেশন জেড”-এর এক নতুন ‘কৌশলগত ভোট’ দেওয়ার প্রবণতাকে তুলে ধরছে। এই কৌশলে ভোটাররা তাদের প্রথম পছন্দের প্রার্থীকে ভোট না দিয়ে, বরং সেই প্রার্থীকে ভোট দেন যিনি জেতার সম্ভাবনা বেশি। ঢাবি ও জাবি’র সাম্প্রতিক নির্বাচনে এই প্রবণতা স্পষ্ট দেখা গেছে।
ঢাবির এক শিক্ষার্থী ফল ঘোষণার পর জানান, “আমি শিবিরের সবকিছুর সঙ্গে একমত না, কিন্তু ওরাই একমাত্র জিততে পারত। তাই আমার ভোটকে অর্থবহ করেছি।”
সক্রিয় শিবির ও নিষ্ক্রিয় প্রতিদ্বন্দ্বী
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার পতনের পর থেকেই ক্যাম্পাসে একমাত্র সক্রিয় ছাত্রসংগঠন ছিল শিবির। তারা হল দখল, নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা এবং শিক্ষার্থীদের দৈনন্দিন সমস্যা সমাধানে সক্রিয় ছিল। অন্যদিকে, তাদের প্রতিদ্বন্দ্বী সংগঠনগুলো গত এক বছরে নেতৃত্ব সংকটে পড়েছে এবং দিকহীন হয়ে পড়েছে। এই পরিস্থিতিই অনেক শিক্ষার্থীর কাছে শিবিরকে একমাত্র কার্যকর বিকল্প হিসেবে তুলে ধরেছে।
জাতীয় রাজনীতির প্রতিফলন
দ্য ডিপ্লোম্যাটের নিবন্ধে বলা হয়েছে, জাতীয় রাজনীতিতেও একই প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। সানেম (সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিং)-এর জরিপে দেখা গেছে, ৩৮.৮% তরুণ মনে করে বিএনপি পরবর্তী জাতীয় নির্বাচনে জয়ী হবে। ২১.৫% সমর্থন নিয়ে জামায়াত রয়েছে দ্বিতীয় স্থানে।
ঠিক যেভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা শেষ পর্যন্ত শিবিরকে ভোট দিয়েছে, জাতীয় নির্বাচনে তরুণ ভোটাররা বিএনপির দিকে ঝুঁকতে পারেন। তাদের চোখে বিএনপিই একমাত্র সম্ভাব্য বিজয়ী দল।
ছোট দলগুলোর জন্য ঝুঁকি
এই প্রবণতা ছোট বামপন্থী দল, স্বতন্ত্র প্রার্থী এবং নতুন রাজনৈতিক শক্তিগুলোর জন্য হুমকি সৃষ্টি করছে। কৌশলগত ভোটের এই বাস্তবতায় তারা ভোটারদের কাছে গুরুত্ব হারাচ্ছে। এনসিপি (ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টি) নিজেদের মধ্যপন্থী বিকল্প হিসেবে তুলে ধরলেও তাদের ছাত্রসংগঠনের পরাজয় দলের বিশ্বাসযোগ্যতাকে ক্ষুণ্ণ করেছে। ফলে অনেক তরুণ ভোটার এখন তাদের ভোটকে “অপচয় হওয়া ভোট” হিসেবে দেখছেন।
নিবন্ধকারের মতে, বিএনপির সব ভোটারকে অনুপ্রাণিত করার দরকার নেই। তাদের কেবল এই একটি বার্তা ধরে রাখতে হবে— “আমরাই একমাত্র দল যারা ক্ষমতায় যেতে পারি।” এই “অবশ্যম্ভাবিতার ভাবনা”-ই তরুণ ভোটারদের কাছে বিএনপিকে আরও শক্তিশালী বিকল্প হিসেবে তুলে ধরছে।
ঢাকা ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ফলাফল শুধু ছাত্ররাজনীতির জয়-পরাজয় নয়, বরং এটি জাতীয় রাজনীতির আগাম ইঙ্গিত। যদি এই কৌশলগত ভোটের প্রবণতা ২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচনেও বহাল থাকে, তাহলে বিএনপি বড় ধরনের সুবিধা পেতে পারে।

আরো পড়ুন

সর্বশেষ