রাজগঞ্জে ‘মিনি মেডিকেল কলেজে’ ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান: ৫০ হাজার টাকা জরিমানা ও প্রতিষ্ঠান বন্ধের নির্দেশ

আরো পড়ুন

যশোরের মনিরামপুর উপজেলার রাজগঞ্জ বাজারে অবস্থিত বিতর্কিত ‘সুপারস্টার মেডিকেল অ্যান্ড টেকনোলজি ইনস্টিটিউট’ নামে একটি ‘মিনি মেডিকেল কলেজ’-এ ভ্রাম্যমাণ আদালত অভিযান চালিয়েছে। এ সময় প্রতারণার দায়ে প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক কথিত ডাক্তার ডিএম মনিরুজ্জামান মনিকে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। একই সঙ্গে পরবর্তী নির্দেশনা না দেওয়া পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটি বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আজ বৃহস্পতিবার (৩১ জুলাই) দুপুরে মনিরামপুর উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) নিয়াজ মাখদুমের নেতৃত্বে এ অভিযান পরিচালিত হয়।

প্রতারণার কৌশল ও পূর্ব ইতিহাস

জানা গেছে, ছয় মাস আগে কথিত ডাক্তার মনি কেশবপুরে অবস্থিত ‘সুপারস্টার মেডিকেল অ্যান্ড টেকনোলজি ইনস্টিটিউটের’ প্রধান কার্যালয় থেকে ৫০ হাজার টাকার বিনিময়ে এই ‘মিনি মেডিকেল কলেজ’ পরিচালনার অনুমতি নিয়ে আসেন। গত ২৫ মে কেশবপুর উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট শরিফ নেওয়াজের নেতৃত্বে একটি টিম ওই প্রতারণার দায়ে প্রতিষ্ঠানটিতে অভিযান চালায়। সে সময় প্রতিষ্ঠানটি পরিচালনার জন্য কোনো বৈধ কাগজপত্র দেখাতে ব্যর্থ হওয়ায় সেটি বন্ধ ঘোষণা করা হয় এবং পরিচালক মিলন হোসেনকে ৩০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়।

এতে শাখা অফিস নিয়ে বিপাকে পড়ে যান কথিত ডাক্তার মনি। এরপর প্রতিষ্ঠান পরিচালনার জন্য তিনি নতুন কৌশল অবলম্বন করেন। গত ১৬ জুন বগুড়ার আরও একটি বিতর্কিত প্রতিষ্ঠান ‘সিট ফাউন্ডেশন’ থেকে অনুমতি নিয়ে একই কারবার শুরু করেন। গ্রামে তিনি প্রচার করতেন যে, তিনি ‘ডিপ্লোমা ইন মেডিকেল ফ্যাকাল্টি’, ‘ডিপ্লোমা ইন নার্সিং’, ‘ডিপ্লোমা ইন মেডিকেল অ্যাসিস্ট্যান্ট’, ‘মাদার অ্যান্ড চাইল্ড হেলথ কেয়ার’, ‘ডেন্টাল কেয়ার’, ‘ল্যাব টেকনোলজি’, ‘পল্লী চিকিৎসা’, ‘ইউনানী মেডিসিন প্র্যাকটিস’, এমনকি ‘ফ্রিল্যান্সিং’ ও ‘ফার্মেসি’ কোর্সেও শিক্ষার্থী ভর্তি করছেন। অথচ ২০১০ সালের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের চিকিৎসা শিক্ষা শাখার এক প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, এসব কোর্স ম্যাটস্ (মেডিকেল অ্যাসিস্ট্যান্ট ট্রেনিং স্কুল) ছাড়া কেউ করাতে পারবে না।

দীর্ঘদিন ধরে মনি নিজের নামের আগে ‘ডাক্তার’ পদবি ব্যবহার করলেও তিনি কোনো রকম এমবিবিএস ডিগ্রিধারী নন। তিনি নিজেই শিক্ষকের ভূমিকায় ক্লাস নিচ্ছিলেন, অথচ এসব কোর্সে শিক্ষাদান করার কথা এমবিবিএস ডাক্তারদের। একই সাথে, রাজগঞ্জ এলাকায় তিনি নারী মাঠকর্মী নিযুক্ত করে একটি শক্তিশালী নেটওয়ার্ক তৈরি করেছেন। ওই মাঠকর্মীরা তার শিক্ষার্থী ও চেম্বারের জন্য রোগী সংগ্রহ করে আসছিলেন। এই কথিত ডাক্তারের অপচিকিৎসায় এক নারীর গর্ভের সন্তান নষ্ট হয়ে গেছে বলেও গ্রামে প্রচার আছে।

অভিযানের সময় প্রতিষ্ঠানটির সাইনবোর্ডে ‘সুপারস্টার মেডিকেল অ্যান্ড টেকনোলজি ইনস্টিটিউট’ লেখা থাকলেও, অনুমোদনের কাগজপত্রে লেখা ছিল ‘জামান মেডিকেল টেকনোলজি অ্যান্ড নার্সিং ইনস্টিটিউট’। নামের এই অসঙ্গতিও আদালত প্রতারণার প্রমাণ হিসেবে চিহ্নিত করে।

এ বিষয়ে মণিরামপুরের সহকারী কমিশনার নিয়াজ মাখদুম বলেন, নামের আগে ‘ডাক্তার’ ব্যবহার করে একজন ব্যক্তি নিজেই শিক্ষকতা করছেন, আবার রোগীও দেখছেন এমন অভিযোগের ভিত্তিতে অভিযান চালানো হয়। প্রাথমিকভাবে অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় তাকে জরিমানা করা হয়েছে এবং প্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখতে বলা হয়েছে।

একই দিনে রাজগঞ্জ বাজারে অন্যান্য অপরাধের বিরুদ্ধেও অভিযান চালানো হয়:

* লাইসেন্সবিহীনভাবে ক্লিনিক চালানোর অপরাধে ‘তকী ক্লিনিক অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টারকে’ ২০ হাজার টাকা জরিমানা ও বন্ধ ঘোষণা করা হয়।

* পরিবেশ সংরক্ষণ আইনে একটি দোকানে অভিযান চালিয়ে ২ হাজার টাকা জরিমানা ও ৪২ কেজি পলিথিন জব্দ করা হয়।

* মৎস্য রক্ষা ও সংরক্ষণ আইনে ৩ কেজি কারেন্ট জাল জব্দ ও ২ হাজার টাকা জরিমানা করা হয় অপর এক দোকানিকে।

* অত্যাবশ্যকীয় পণ্য নিয়ন্ত্রণ আইনে এক ব্যবসায়ীকে ১ হাজার ৫০০ টাকা জরিমানা করা হয়।

সর্বমোট এ দিনে ৭৫ হাজার ৫০০ টাকা জরিমানা আদায় করা হয়েছে।

অভিযানে মনিরামপুর উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট নিয়াজ মাখদুম, মনিরামপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের কনসালটেন্ট ডাক্তার খালেদুজ্জামান মুজাহিদসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা

উপস্থিত ছিলেন।

আরো পড়ুন

সর্বশেষ