জাতীয়তাবাদী দল—বিএনপিতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে শুরু হতে যাচ্ছে ব্যাপক শুদ্ধি অভিযান। কেন্দ্রীয় থেকে তৃণমূল পর্যন্ত দলের প্রতিটি স্তরে চালানো হবে এই অভিযান। দলের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে স্পষ্ট জানানো হয়েছে—যে কোনো পর্যায়ের নেতাই হোন না কেন, শৃঙ্খলা ভঙ্গকারীদের বিরুদ্ধে নেওয়া হবে কঠোর ব্যবস্থা।
দলীয় সূত্রে জানা গেছে, চাঁদাবাজি, জমি দখল, এমনকি হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগ উঠেছে দলের একাংশ নেতা-কর্মীর বিরুদ্ধে। এতে বিব্রত দলের শীর্ষ নেতৃত্ব। এসব নেতার বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা ছাড়াও প্রয়োজনে আইনানুগ ব্যবস্থাও গ্রহণ করা হবে।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ জানিয়েছেন, জেলা ও মহানগর পর্যায় থেকে শুরু করে ইউনিয়ন পর্যন্ত ‘চেইন অব কমান্ড’ বজায় রাখতে খুব দ্রুত শুদ্ধি অভিযান শুরু হবে। তার ভাষায়, “সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে কেন্দ্রীয় নেতারাও ছাড় পাবেন না।”
এদিকে ‘মবতন্ত্র’ প্রতিরোধে মাঠে নামার ঘোষণা দিয়েছে দলের তিনটি অঙ্গসংগঠন—যুবদল, ছাত্রদল ও স্বেচ্ছাসেবক দল। গণতান্ত্রিক শৃঙ্খলা রক্ষা ও অপতৎপরতা রুখতে তারা নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলনের পথ বেছে নেওয়ার কথা জানিয়েছে।
দলীয় হাইকমান্ডের নির্দেশে ইতোমধ্যে ইউনিয়ন, উপজেলা, জেলা ও মহানগর পর্যায়ের কমিটিগুলো যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। জনগণের মধ্যে যেসব নেতাদের নিয়ে বিরূপ ধারণা তৈরি হয়েছে, তাদের বিষয়ে নেওয়া হচ্ছে বিশেষ নজরদারি। জনআস্থা হারানোদের দল থেকে বাদ দেওয়ার পরিকল্পনাও রয়েছে।
বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব ও মিডিয়া সেলের সদস্য সচিব শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানি বলেন, “দলের ইমেজ রক্ষায় কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। মবতন্ত্রে নয়, আমরা গণতন্ত্রে বিশ্বাস করি। এ বার্তা জনগণের কাছে পৌঁছে দিতে দেশজুড়ে কার্যক্রম চালানো হবে।”
দলীয় দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, ৫ আগস্টের পর বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের প্রায় পাঁচ হাজার নেতা-কর্মীর বিরুদ্ধে ইতোমধ্যে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। তবু পরিস্থিতি সামাল দিতে দলকে রীতিমতো হিমশিম খেতে হচ্ছে।
ঢাকা মহানগর বিএনপির কয়েকটি থানার নেতাদের বিরুদ্ধেও চাঁদাবাজি ও দখলের অভিযোগ উঠেছে। এসব বিষয়ে তদন্ত করে প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট কমিটিগুলো ভেঙে দেওয়ারও কথা ভাবছে হাইকমান্ড।
সম্প্রতি পুরান ঢাকার ভাঙারি ব্যবসায়ী সোহাগ হত্যাকাণ্ডকে কেন্দ্র করে তিনটি অঙ্গসংগঠন সরকারের বিরুদ্ধে প্রশাসনকে নিষ্ক্রিয় রাখার অভিযোগ এনেছে। যুবদল সভাপতি মোনায়েম মুন্না দাবি করেন, সিসিটিভি ফুটেজে অভিযুক্তদের চিহ্নিত করা গেলেও মামলায় তাদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি।
এ বিষয়ে দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, “দলের সুনাম ক্ষুণ্ন হয় এমন কোনো অভিযোগ এলেই আমরা সঙ্গে সঙ্গে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নিচ্ছি। কিন্তু দেশে গণতন্ত্র ও সুশাসন অনুপস্থিত থাকায় অনেক বিষয়েই আমরা বাধাগ্রস্ত হচ্ছি।”
বিএনপির একাধিক নেতা অভিযোগ করেছেন, দলের দুর্দিনে যাঁরা নির্লিপ্ত ছিলেন, এমন ‘হাইব্রিড’ নেতা এবং ‘নব্য বিএনপি’ নামধারী ব্যক্তিরা এখন দলে প্রভাব বিস্তার করছেন। তাদের অনেকেই নানা অপকর্মে জড়িয়ে পড়েছেন এবং বিভিন্ন কমিটিতে স্থানও করে নিয়েছেন। এতে করে প্রকৃত ত্যাগী নেতা-কর্মীরা কোণঠাসা হয়ে পড়ছেন।
বিএনপির দাবি, নির্বাচনের আগে দল ও নেতাদের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করতে একটি গোষ্ঠী পরিকল্পিতভাবে ‘মব’ তৈরি করে অপপ্রচার চালাচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে ‘মবতন্ত্র’ প্রতিরোধে দল কঠোর অবস্থান নিয়েছে এবং এর বিরুদ্ধে দেশব্যাপী ব্যাপক কর্মসূচি নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে।

