বর্তমান সরকারের পদত্যাগ ও তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রতিষ্ঠাসহ ১০ দফা দাবিতে যুগপৎ আন্দোলন করছে বিএনপি। এরই অংশ হিসেবে ইতোমধ্যে বড় ৫টি কর্মসূচি পালন করেছে বিএনপিসহ সমমনা দলগুলো।
এবার সরকার পতন আন্দোলনে কেন্দ্রের পাশাপাশি তৃণমূলেও জোর দিয়েছে বিএনপি। আগামী ১১ ফেব্রুয়ারি দেশের সকল ইউনিয়নে পদযাত্রা করবেন দলটির নেতাকর্মীরা। একই দাবিতে ঢাকার দুই মহানগরে পদযাত্রা কর্মসূচি ঘোষণা দিয়েছে বিএনপি।
মঙ্গলবার গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত এক সংবাদ সম্মেলনে দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এ কর্মসূচি ঘোষণা করেন।
বিএনপি মহাসচিব বলেন, ৯ ফেব্রুয়ারি ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির আয়োজনে গোপীবাগ ব্রাদার্স ক্লাব মাঠ থেকে জাতীয় প্রেস ক্লাব পর্যন্ত পদযাত্রা কর্মসূচি পালিত হবে। ১২ ফেব্রুয়ারি ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির আয়োজনে শ্যামলী ক্লাব মাঠ থেকে রিং রোড, শিয়া মসজিদ, তাজমহল রোড, নূরজাহান রোড, মোহাম্মদপুর বাসস্ট্যান্ড হয়ে বসিলা পর্যন্ত কর্মসূচি পালিত হবে। সোমবার রাতে অনুষ্ঠিত দলটির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম স্থায়ী কমিটির বৈঠকের সিদ্ধান্ত জানাতে এ সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। সংবাদ সম্মেলন পরবর্তী সময়ে পদযাত্রা কর্মসূচির অনুমতি চেয়ে ডিএমপি কমিশনারকে চিঠি দিয়েছে বিএনপি।
সংবাদ সম্মেলনে আগামী ১১ ফেব্রুয়ারি সারাদেশে ইউনিয়ন পর্যায়ে বিএনপির পদযাত্রা কর্মসূচির দিন আওয়ামী লীগের ডাকা কর্মসূচি প্রত্যাহারের আহবান জানান বিএনপি মহাসচিব।
মির্জা ফখরুল ইসলাম বলেন, আওয়ামী লীগ ইচ্ছাকৃতভাবে একেবারে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে একটি সংঘাতময় পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে চায়। যেকোনো শান্তিপূর্ণ আন্দোলন আমাদের সাংবিধানিক অধিকার। সেভাবে আমরা কর্মসূচি পালন করে আসছি। আওয়ামী লীগ প্রথমদিক থেকে চেষ্টা করছে আমাদের শান্তিপূর্ণ আন্দোলনকে সংঘাতের দিকে ঠেলে দেয়ার জন্য। আমরা সেই সংঘাতকে এড়িয়ে চলেছি। আওয়ামী লীগ পাল্টা কর্মসূচি দিয়েছে ইউনিয়ন পর্যায়ে; কথা হচ্ছে এবার আমরা প্রথম আওয়ামী লীগকে রিঅ্যাক্ট করতে বাধ্য করছি। তারা ভীতসন্ত্রস্ত। তারা এখন নিজেদের রক্ষার জন্য বিভিন্নভাবে আবার ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য এই কাজগুলো করছে। ফখরুল ইসলাম বলেন, দুর্ভাগ্যজনকভাবে বিএনপি’র প্রত্যেকটি কর্মসূচিতে আওয়ামী লীগ পাল্টা কর্মসূচি ঘোষণা করছে। আবার ইউনিয়ন পর্যায়েও তারা কর্মসূচি ঘোষণা করেছে।
এতে করে আওয়ামী লীগের যে চরিত্র এটা উন্মোচিত হয়েছে। আওয়ামী লীগ হচ্ছে একটি সন্ত্রাসের দল। তারা সন্ত্রাস, ত্রাস সৃষ্টি করা, ভয় দেখানো, আক্রমণ করার ভয় দেখানো এভাবে তারা কর্মসূচিকে নস্যাৎ করার জন্য পাল্টা কর্মসূচি দিচ্ছে। এই পাল্টা কর্মসূচিতে গণতন্ত্রই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ফখরুল ইসলাম জানান, ভূমিকম্পে তুরস্ক ও সিরিয়ায় হতাহতের ঘটনায় সোমবার রাতে স্থায়ী কমিটির বৈঠকে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। নিহতদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করা হয়। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল তুরস্ক এবং সিরিয়ার এই ভয়াবহ প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে গভীর সমবেদনা জানাচ্ছে। তিনি আরও বলেন, গত ৪ঠা ফেব্রুয়ারি সারা দেশে একযোগে অনুষ্ঠিত দশটি বিভাগীয় সমাবেশ স্থায়ী কমিটির বৈঠকে পর্যালোচনা করা হয় এবং সন্তোষ প্রকাশ করা হয়। জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণের মধ্যদিয়ে বিরোধী দলের দশ দফা দাবির প্রতি পূর্ণ সমর্থন পুনরায় উচ্চারিত হয়। এই সমাবেশগুলোকে নস্যাৎ করার জন্য ফ্যাসিস্ট সরকারের পুলিশ বাহিনী কর্তৃক বিএনপি’র নেতাকর্মীদের গ্রেপ্তারের তীব্র নিন্দা জানানো হয়।
একইসঙ্গে চুয়াডাঙ্গা, মেহেরপুর ও যশোরে সমাবেশে যোগদানের উদ্দেশ্যে নেতাকর্মীদের গাড়ি ভাঙচুর ও হামলায় অনেকে আহত হওয়ার ঘটনায় তীব্র নিন্দা জানানো হয়। অবিলম্বে মামলা প্রত্যাহার এবং গ্রেফতারকৃতদের মুক্তি দাবি জানায় দলটির নীতিনির্ধারণী ফোরাম।
মির্জা ফখরুল বলেন, স্থায়ী কমিটি মনে করে সরকারের লাগামহীন দুর্নীতি, চরম অব্যবস্থাপনা এবং সরকারের জনগণের প্রতি দায়িত্বহীনতার কারণেই আজ এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। শুধুমাত্র ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য জনগণকে উন্নয়নের ভ্রান্ত স্বপ্ন দেখিয়ে জনগণের মৌলিক চাহিদা মেটাতে ব্যর্থ হচ্ছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্যের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি, গ্যাস, বিদ্যুতের মূল্য বৃদ্ধি অন্যদিকে সরকারের সর্বস্তরে সীমাহীন দুর্নীতি অর্থনীতিতে চরম সংকটের মধ্যে ফেলছে। সভায়, মূল্যস্ফীতি রোধ করতে না পারা, জনগণের মৌলিক চাহিদা মেটাতে না পারা এবং একইসঙ্গে গণতান্ত্রিক অধিকার হরণ করার কারণে এই অবৈধ অনির্বাচিত সরকারের পদত্যাগ দাবি করা হয়।
তিনি আরো বলেন, চলতি বছরে জ্বালানি পণ্যে সবধরনের ভর্তুকি প্রত্যাহার করার সিদ্ধান্তে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) দাম একলাফে ২৬৬ টাকা বৃদ্ধির ঘোষণা; ১২ কেজি গ্যাসের সিলিন্ডারের বাজার মূল্য ১ হাজার ৫৫০ থেকে ১ হাজার ৮০০ টাকা; অন্যদিকে এক মাস পার হওয়ার আগেই আবারো খুচরা এবং পাইকারি বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির কারণে সাধারণ মানুষ চরম দুর্ভোগে পড়েছে। ফখরুল ইসলাম আরো বলেন, সম্প্রতি ঢাকাস্থ মার্কিন দূতাবাসের আয়োজনে খসড়া তথ্য সংরক্ষণ আইনের বিষয়টি স্থায়ী কমিটির বৈঠকে আলোচনা করা হয়। এই আইন প্রণয়ন করা হলে মার্কিন ব্যবসায়ীরা ব্যবসা ছেড়ে চলে যাবে মার্কিন রাষ্ট্রদূতের এমন ঘোষণায় উদ্বেগ প্রকাশ করে বিএনপি। দলটির স্থায়ী কমিটি মনে করে এই প্রস্তাবিত আইন স্বাধীনতা, গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও মুক্ত ব্যবসায় পরিপন্থি। বেআইনি, কর্তৃত্ববাদী সরকার ক্ষমতাকে কুক্ষিগত করার লক্ষ্যে সরকার একের পর এক নিবর্তনমূলক আইন প্রণয়নের মাধ্যমে দেশকে পুরোপুরি ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্রে পরিণত করছে।
এর আগে গত ৬ ফেব্রুয়ারি রাতে বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির ভার্চ্যুয়াল সভা অনুষ্ঠিত হয়।
সভায় সভাপতিত্ব করেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। সভায় উপস্থিত ছিলেন স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার, মির্জা আব্বাস, বাবু গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, ড. আব্দুল মঈন খান, নজরুল ইসলাম খান, মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, বেগম সেলিমা রহমান, ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু।

