তর্জনী উচিঁয়ে রেসকোর্স ময়দানে ভাষণ দিয়েছিলেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। কেমন ছিল সেই দিনটি? সেদিনের বঙ্গবন্ধুকে সেই আবহে, সেই জায়গায় এখনকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ২৬ ফুট উচ্চতার ভাস্কর্যের মাধ্যমে স্থাপন করা হবে। পিতলের তৈরি সেই ভাস্কর্যে খুঁজে পাওয়া যাবে একাত্তরের ঐতিহাসিক ৭ মার্চ উত্তাল জনসমুদ্রে তর্জনী তুলে ভাষণরত বঙ্গবন্ধুকে।
গত জুনের মধ্যে ভাস্কর্যটি স্থাপনের কাজ শেষ করার কথা থাকলেও তা হয়নি। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে স্বাধীনতা স্তম্ভ নির্মাণে তৃতীয় পর্যায়ের প্রকল্পের মেয়াদ ২০২৪ সালের জুন মাস পর্যন্ত বাড়াতে যাচ্ছে সরকার। একই সঙ্গে এই প্রকল্পের ব্যয়ও বাড়ছে।
মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় সূত্র বলছে, ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণের স্থানে বঙ্গবন্ধুর একটি ভাস্কর্য এবং একাত্তরের ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তান সেনাবাহিনীর আত্মসমর্পণের স্থানে আরেকটি ভাস্কর্য নির্মাণের নকশা দ্বিতীয় দফায় দরপত্র আহ্বানের পর চূড়ান্ত করা হয়েছে।
মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত ইতিহাস ও মর্মস্পর্শী বিষয়গুলো তুলে ধরা, ভাস্কর্যের মাধ্যমে ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ ও ১৬ ডিসেম্বরের আত্মসমর্পণের চিত্রায়ণ এবং স্বাধীনতার জন্য জীবন উৎসর্গকারীদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক বলেন, দুটি ভাস্কর্যই পিতল দিয়ে তৈরি করা হবে। ৮ ফুট বাই ১৮ ফুট বেদির ওপর বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্যটি হবে ২৬ ফুট উচ্চতার। আর ৮ ফুট বাই ১৫ ফুট বেদির ওপর আত্মসমর্পণের ভাস্কর্যটি হবে ২৩ ফুট উচ্চতার।
এসব ভাস্কর্য নির্মাণে দরপত্র আহবান করা হয়েছে জানিয়ে মোজাম্মেল হক বলেন, ভাস্কর্যের নকশা অনুমোদন দেয়া হয়েছে। তবে নির্ধারিত সময়ে এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি। এ জন্য প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানো হচ্ছে। জিনিসপত্রের দাম বেড়ে যাওয়ায় প্রকল্পের ব্যয় বাড়বে। এ জন্য পুরো প্রকল্প সংশোধন করে তা অনুমোদনের জন্য একনেকে পাঠানো হয়েছে।
সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে স্বাধীনতা স্তম্ভ নির্মাণ (তৃতীয় পর্যায়) প্রকল্পের পরিচালক হাবিবুল ইসলাম বলেন, ২০১৮ সালের জানুয়ারি থেকে গত জুন পর্যন্ত ২৬৫ কোটি ৪৪ লাখ টাকায় প্রকল্পটি বাস্তবায়নের কথা ছিল। কিন্তু জিনিসপত্রের দাম বেড়ে যাওয়ায় এবং এই প্রকল্পে বেশ কিছু নতুন বিষয় যুক্ত হওয়ায় প্রকল্পের মেয়াদ ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত বাড়ানোর পাশাপাশি ব্যয় ৪৭ শতাংশ বাড়ানোর প্রস্তাব রেখে পুরো প্রকল্প সংশোধনের প্রস্তাব করা হয়েছে।
সোহরাওয়ার্দী উদ্যান ঘুরে দেখা যায়, মিউজিয়াম প্লাজার ওপরিভাগে নতুন করে মার্বেল বসানো হচ্ছে। এ ছাড়া এই উদ্যানে এখন আর কোনো কাজ চলছে না। প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ৫০০টি গাড়ি ধারণ ক্ষমতার ভুগর্ভস্থ কার পার্কিং নির্মাণে ছাদ ঢালাই শেষ হয়েছে। এই পার্কিংয়ে প্রবেশ ও বের হওয়ার লুপ নির্মাণকাজ চলছে। কার পার্কিংয়ের উভয় পাশে শিশুপার্কের দর্শনার্থীদের জন্য আন্ডারপাস নির্মাণ করা হচ্ছে। এই প্রকল্পের আওতায় সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে একটি সাবস্টেশন জেনারেটর ভবন, সাতটি ফুড কিওস্ক, ওয়াকওয়ে এবং ওয়াটার রিজার্ভার নির্মাণ করা হবে।
কর্মকর্তারা বলছেন, বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণের ভাস্কর্য এবং পাকিস্তান সেনাবাহিনীর আত্মসমর্পণের ভাস্কর্য রড-সিমেন্ট-কনক্রিটের পরিবর্তে সম্পূর্ণ পিতল দিয়ে নির্মাণের সিদ্ধান্ত হওয়ায় প্রকল্পের ব্যয় বেড়েছে। এছাড়া ফুড কিওস্ক ও আরসিসি ওয়াকওয়ে নির্মাণকাজের পরিমাণ বৃদ্ধি ও ভুগর্ভস্থ মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের সংরক্ষণ কাজের পরিধি বাড়ায় পুরো প্রকল্পের ব্যয় বেড়েছে।
এসবের বাইরে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান থেকে শিশু পার্ক এলাকা আলাদা করতে কাঁচের দেয়াল তৈরি, উদ্যানে আনসার ব্যাটেলিয়নের জন্য স্থায়ী ক্যাম্প নির্মাণ, শাহবাগ থানা ভবন নির্মাণের সংস্থান রাখা, ভুগর্ভস্থ মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণের হলোগ্রাফিক ডিসপ্লের ব্যবস্থা সংযোজন এবং ভূ-গর্ভস্থ কার পার্কিংয়ে প্যাসেঞ্জার লিফট সংযোজনের জন্য প্রকল্পের ব্যয় বাড়বে বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

