যশোরের সুমিষ্ট নলেন গুড়

আরো পড়ুন

নলেন গুড়ের সৌরভে কার না জিভে জল আসে। কুয়াশাচ্ছন্ন সকালে খেজুরের রসের সাথে মুড়ি মিশিয়ে খাওয়ার মজাই আলাদা। দেশের বিভিন্ন স্থানে খেজুরের রস সংগ্রহ করা হয়, কিন্তু যশোরের মত সুমিষ্ট রস ও রসের তৈরি নলেন গুড় আর কোথাও হয় না।

যে কারণে ‘যশোরের যশ খেজুরের রস’ একটি প্রবাদে রূপান্তরিত হয়েছে। গাছিরা খেজুরগাছ থেকে রস বের করার কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে । দুপুরের পরে তারা গাছিদা ধার দিয়ে মাজায় ঠুঙ্গি দড়া বেঁধে বাঁকে ঠিলে নিয়ে গাছ কাটার জন্য যায়।

ভোরে সরিষা ফুলের শিশির মেখে গাছ থেকে রস পাড়ে। মাঝে মাঝে সন্ধ্যায় রস পেড়েও খাওয়া হয়। দিনের প্রথমভাগের এ রস বেশি মিষ্টি হওয়ায় সন্ধ্যা রসের বিশেষ কদর রয়েছে। সকালে পরিবারের মহিলাদের সহযোগিতায় গাছি চুলায় রস জাল দিয়ে তৈরি করে গুড়।

শীত মৌসুমে সারা দেশের মানুষ যশোরের খেজুরের রস, গুড় এবং পাটালির প্রত্যাশা করে। মৌসুম শুরু হলে বিভিন্ন এলাকার মানুষ যশোরে আসে মূলত রস গুড়ের আকর্ষণে।

গাছিদের সাথে কথা বলে জানা গেছে নলেন গুড় কয়েক নামে চলে। বাটিগুড়, ঝোলা গুড়, দানাগুড়, মোটা পাটালি এবং পাতলা পাটালি প্রভৃতি। খেজুরের রস ও গুড় দিয়ে নানা প্রকারের সুস্বাদু খাবার তৈরি হয়। যেমন রসের পায়েস, বিভিন্ন ধরনের শীতকালীন পিঠা, হাতে কাটা সেমাই।

পুষ্টিবিদদের ভাষায়, নলেনগুড় খেলেই শুধু মন ভালো হয় না, শরীরেও অনেক উপকার করে। কেননা গুড় পুষ্টিগুণেও ভরপুর । নলেনগুড় হজম ক্ষমতা বাড়িয়ে পেট পরিষ্কার রাখে। কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যায় দারুণ ভালো কাজ করে গুড়। রুটির সঙ্গে গুড় খেলে শরীর ভালো থাকে ।

গুড়ের মধ্যে রয়েছে প্রচুর পরিমাণ আয়রন। রোজ গুড় খেলে বা খাবারে গুড় মেশালে শরীরের আয়রনের ঘাটতি মেটে। শরীর থেকে টক্সিন দূর করতে গুড় বেশ কাজের । ঠাণ্ডা লেগে জ্বর হলে, সর্দি-কাশির সমস্যা বা মাইগ্রেনে গরম জল বা চায়ে গুড় মিশিয়ে খেলে উপকার হয়। পিরিয়ডের আগে পেট ব্যথা, বমি বমি ভাব, মুড স্যুইং হলে গুড় উপকার করে। গুড় শরীরে এন্ডরফিন বা হ্যাপি হরমোন ক্ষরণে সাহায্য করে। গুড়ের মধ্যে থাকা জিঙ্ক ও সেলেনিয়াম শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়। সংক্রমণ রোধ করে। তবে গুড়ে ক্যালরির পরিমাণ খুব বেশি । প্রতিগ্রামে রয়েছে চার কিলো ক্যালরি। তাই নিয়মিত গুড় খেলে ওজন বাড়ার সম্ভাবনাও রয়েছে।

যশোর সদরের ফুলবাড়ী গ্রামের গাছি হাসেম আলী বলেন, গাছে রস আসা কেবল শুরু। প্রতিদিন ২-৩ ঠিলে করে রস হচ্ছে । শুরুতে গুড়ের সুভাষ খুব বেশি হয়। গুড় বিক্রি করছি প্রতিকেজি ৩’শ এবং পাটালি প্রতিকেজি ৪শ করে।

তেজরোল গ্রামের গাছি আব্দুল মান্নান লস্কার বলেন, মৌসুমের শুরুতে গুড়ের দাম মোটামুটি ভালো যাচ্ছে । এবার চিনির দাম বেশি, হয়তো গুড়ের দামও বেশি থাকবে । কেবল মাত্র খেজুর গাছে রস আসছে, সব গাছে এখনো রস আসেনি । নতুন রস জ্বালাতে জ্বালাতে লাল হওয়ার আগেই ঘ্রাণ আসে।

গাছি মিলন জানান, শুরুতে গুড়, পাটালির দাম ভালোই। ১০-১২ দিনের মধ্যেই দাম কমে যাবে । এখন আমরা নির্ভেজাল পাটালি বিক্রি করছি ৫শ টাকা আর চিনি মিশানো পাটালি ৩শ টাকা। সন্ধ্যা রাতের রস বিক্রি করি এক ঠিলে ৫শ আর সকালে বিক্রি করি এক ঠিলে রস ৪শ টাকা। খেজুরের গুড় বানাতে কষ্ট হলেও লাভ আছে।

খাজুরা বাজারে খেজুরের গুড়, পাটালির খুচরা বিক্রেতা ইউসুফ বলেন, ২৫০ টাকা থেকে ৫শ টাকা পর্যন্ত বিক্রি করছি। এখনো বাইরের ক্রেতারা আসেনি। তারপরেও মোটামুটি বেচাকেনা হচ্ছে। ১০-১২ দিনের মধ্যে পুরোদমে বেচাকেনা শুরু হয়ে যাবে।

গুড় ও পাটালির খুচরা বিক্রেতা নুর হোসেন বলেন, নির্ভেজাল পাটালি সাড়ে ৪শ থেকে ৫শ টাকা বিক্রি করছি । বেচাকেনা একদম কম । চিনি মিশানো পাটালি আড়াইশ টাকা করে বিক্রি হচ্ছে।

খেজুরের গুড় ও পাটালির খুচরা বিক্রেতা ইমন বলেন, বেচাকেনা এখনো তেমন শুরু হয়নি। বাইরের ক্রেতারা আসলে বেচাকেনা ভালো হবে। এখন দিনে একদেড় কেজিও বিক্রি হয়, আবার কোনো দিন ৮-১০ কেজিও বিক্রি হয়।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের অতিরিক্ত উপপরিচালক সেলিম হোসেন বলেন, আমরা গাছিদের সচেতন করার জন্য ইতোমধ্যে বিভিন্ন কর্মসূচি হাতে নিয়েছি। এ বছর গাছিদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার জন্য মহেশপুর এবং ঝিকরগাছায় দুইটা গ্রুপ করা হয়েছে। এখানে প্রতিটা গ্রুপে ৩০ জন করে মোট ৬০ জনকে প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে। যাতে তারা নিরাপদ গুড় তৈরি করতে পারে এবং গুড়ের স্বাদ ও মান ধরে রাখতে পারে।

তিনি বলেন, চিনি সবাই মেশায় না । আর যারা মেশায় তাদের অভ্যাস পরিবর্তন করার জন্য গাছিদেরকে বিভিন্নভাবে বুঝানোর চেষ্টা করছি। গুড়ে চিনি মেশাবে না বলে অনেকে আমাদের নিকট ওয়াদাবদ্ধ হয়েছে ।

আরো পড়ুন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

সর্বশেষ