এতো গরম এর আগে কখনো দেখেনি ইউরোপ। যেসব দেশের গ্রীষ্মকালের তাপমাত্রা বাংলাদেশের শীতকালের তাপমাত্রার সমান ছিল, সেসব দেশে এখন মধ্যপ্রাচ্যের থেকেও বেশি গরম। প্রায় প্রতিদিনই কোনো না কোনো দেশে রেকর্ড ভাঙছে। মঙ্গলবার বৃটেনে ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ৪০ ডিগ্রি ছাড়িয়েছে তাপমাত্রা। একই অবস্থা পশ্চিম ইউরোপের সবকটি দেশেরই।
প্রচণ্ড গরমে সেখানে কয়েক গুণ বেড়েছে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা। এক লণ্ডন শহরেই এক দিনে এক ডজন অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। তবে শহরের আগুন নেভানো গেলেও বনাঞ্চলের আগুন নেভাতে হিমসিম খেতে হচ্ছে দমকল বাহিনীকে। ফ্রান্স, পর্তুগাল ও স্পেনে ছড়িয়ে পড়েছে দাবানল। গরম যত বাড়ছে, দাবানলের প্রকোপ তত ভয়াবহ হচ্ছে।
বিবিসি জানিয়েছে, জার্মানিতে এরইমধ্যে এ বছরের সবথেকে গরম দিন রেকর্ড করা হয়েছে। পর্তুগালেও বাড়ছে গরমে মৃতের সংখ্যা। এরমধ্যে পুরো ইউরোপেই দাবানল ছড়িয়ে পড়েছে। জাতিসংঘ জানিয়েছে, এখনো সবথেকে খারাপ অবস্থা দেখা বাকি। প্রতি বছরই তুলনামূলক বেশি তাপপ্রবাহ দেখা যাচ্ছে ইউরোপে। তবে এবারের অবস্থা নজিরবিহীন। এ জন্য মানুষের স্বার্থপর আচরণকেই দায়ী করছেন বিশেষজ্ঞরা। জাতিসংঘের আবহাওয়া বিষয়ক সংস্থা ডব্লিউএমও’র প্রধান পেটেরি টালাস বলেন, ভবিষ্যতে এ ধরণের তাপপ্রবাহ স্বাভাবিক অবস্থায় পরিণত হবে এবং দিন দিন এই অবস্থা আরও ভয়াবহ রূপ ধারণ করবে।
মঙ্গলবার বৃটেনে বেশ কয়েকটি বড় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। ওয়েনিংটনে বেশ কয়েকটি বাড়ি পুড়ে গেছে। স্থানীয়রা জানিয়েছেন, ৮টি বাড়ি এবং একটি চার্চে আগুন লেগেছে। দমকলকর্মীরা ওই অবস্থাকে ‘জাহান্নামের অবস্থা’ বলে বর্ণনা করেছেন। মঙ্গলবার দেশটিতে প্রথম বারের মতো তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়ে সর্বোচ্চ তাপমাত্রার নতুন রেকর্ড হয়েছে। লণ্ডনের হিথ্রো বিমান বন্দরের কাছে তাপমাত্রা মঙ্গলবার দুপুরে ৪০ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছায়। এর আগে ২০১৯ সালে ব্রিটেনে সর্বোচ্চ তাপমাত্রার রেকর্ডটি ছিল ৩৮ দশমিক ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস। লন্ডনসহ পুরো বৃটেনের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা এই তাপপ্রবাহে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে।
শত শত দমকলকর্মী বিভিন্ন জায়গায় আগুন নেভাতে নিয়োযিত রয়েছে। গত কয়েকদিনে বৃটেনে এই তাপপ্রবাহের সময় পানিতে ডুবে বা পানির কাছে দুর্ঘটনায় পাঁচজন মারা গেছে। জরুরি সেবা সংস্থাগুলোর সাহায্য চেয়ে ৯৯৯ নম্বরে কলের সংখ্যাও অনেক বেড়েছে। তীব্র গরমের কারণে এই প্রথম ‘রেড এলার্ট’ জারি করা হয়েছে সেখানে। সোমবার তীব্র তাপে লুটন বিমানবন্দরের রানওয়ে গলে গেলে সেখানে কিছু সময় ফ্লাইট চলাচল বন্ধ রাখতে হয়।
বিজ্ঞানীরা হুঁশিয়ারি দিচ্ছেন যে, জলবায়ুর পরিবর্তনের কারণেই এরকম তাপপ্রবাহ তৈরি হচ্ছে এবং সামনের বছরগুলোতে এরকম তীব্র তাপপ্রবাহ আরও ঘন ঘন ঘটতে পারে। ফ্রান্স, স্পেন, বেলজিয়াম, নেদারল্যান্ডস, জার্মানি, ইতালি এবং পর্তুগাল সহ ইউরোপের বিস্তীর্ণ অংশ জুড়েও এখন তীব্র তাপপ্রবাহ চলছে। ফ্রান্সে অন্তত ৬৪টি ভিন্ন এলাকায় তাপমাত্রা ইতিহাসের সব রেকর্ড ভেঙ্গে দিয়েছে। দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বনে গত ৩০ বছরের মধ্যে সবথেকে বড় দাবানল দেখা গেছে। গত ১২ই জুলাই থেকে দেশটির প্রায় ৫০ হাজার একর বন পুড়ে গেছে। দাবানল থেকে বাঁচাতে ৩৪ হাজার মানুষকে উদ্ধার করা হয়েছে। যদিও ফ্রান্সের ইতিহাসের সর্বোচ্চ তাপমাত্রার রেকর্ড এখনও ভাঙেনি তবে তাও ভাঙতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
বেলজিয়ামেও একাধিক স্থানে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। এতে বেশ কয়েকটি স্থানে গাড়িতে আগুন লেগে যায়। জার্মানির পশ্চিমাঞ্চলীয় শহ ডুইসবার্গে মঙ্গলবার ৩৯.৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে। নেদারল্যান্ডে রেকর্ড হয়েছে ৩৯.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। পর্তুগালের অবস্থা আরও শোচনীয়। সেখানে গরমে মৃতের সংখ্যা এক হাজার ছাড়িয়েছে।

