ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইবি) পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক দফতরে শিক্ষার্থীদের ভোগান্তি যেন শেষ হওয়ার নয়। কর্তৃপক্ষের অবহেলা, সমন্বয়হীনতা, জায়গা ও লোকবল সংকটের ফলে বছরের পর বছর ধরে সনদ উত্তোলনসহ জরুরি কাজ করতে গিয়ে চরম দুর্ভোগের শিকার হচ্ছেন শিক্ষার্থীরা। ফলে শিক্ষার্থীদের কাছে হয়রানি ও ক্ষোভের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে দফতরটি। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, সুনির্দিষ্ট নিয়মের চর্চা না থাকায় কাজের জন্য দিনের পর দিন টেবিলে টেবিলে ঘুরতে হয়। হজম করতে হয় কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের বাজে ব্যবহার।
জানা যায়, সনদ, নম্বরপত্রসহ গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন কাগজ উত্তোলনের জন্য সব শিক্ষার্থীকেই পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক দফতরের দ্বারস্থ হতে হয়। প্রশাসন ভবনের উত্তর ব্লকের তিনতলায় অবস্থিত এই দফতরের কাউন্টার ও অফিস কক্ষগুলোতে সব সময় ভিড় থাকে শিক্ষার্থীদের। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অপেক্ষায় কাটে তাদের অধিকাংশ সময়। অভিযোগ রয়েছে, কর্মকর্তাদের অনেকে অফিসে না বসে আমতলাসহ বিভিন্ন স্থানে আড্ডায় সময় পার করেন। এ ছাড়া কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে দ্রুত কাজ করার কথা বলে নিয়মবহির্ভূতভাবে অর্থ নেয়ার অভিযোগও করেন শিক্ষার্থীরা।
সংশ্লিষ্ট দফতর সূত্রে জানা যায়, সাধারণভাবে আবেদনের ১৫ দিনের মধ্যে এবং জরুরি ভিত্তিতে পাঁচ দিনের মধ্যে কাগজপত্র দেওয়ার নিয়ম রয়েছে। তবে শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, নিয়ম মেনে আবেদনপত্র দেয়ার পর নির্দিষ্ট সময় কেটে গেলেও কাঙ্ক্ষিত কাগজপত্র মেলে না। অনেক সময় মাসের পর মাসও কেটে যায়। ঘটে আবেদনপত্র হারিয়ে ফেলার মতো ঘটনা। আবেদন ও সত্যায়নের জন্য ব্যাংক, বিভাগ ও আবাসিক হলে ঘুরতে হয় শিক্ষার্থীদের। এসব কাজের জন্য পদে পদে পোহাতে হয় দুর্ভোগ। এ ছাড়া দীর্ঘ সময় ব্যয় হওয়ায় সব গুছিয়ে দফতরে এলেও সময়মতো পাওয়া যায় না কর্মকর্তাদের। ফলে একরকম অসহায় হয়ে পড়েন শিক্ষার্থীরা। এতে গোপনীয় শাখাসহ অন্য কক্ষগুলোতে অনায়াসে প্রবেশ করে হাতে হাতে কাজ করতে দেখা যায় শিক্ষার্থীদের।
সম্প্রতি কয়েক দিনে দফতরের কাউন্টার ও অফিসগুলোর সামনে অপেক্ষমাণ শিক্ষার্থীদের সঙ্গে প্রতিবেদকের কথা হলে শতভাগ শিক্ষার্থী পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক দফতরের সেবার মান নিয়ে অসন্তোষ ও তিক্ত অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। ঝিনাইদহ থেকে স্বামীকে সঙ্গে নিয়ে কাগজপত্র উত্তোলন করতে আসা লোকপ্রশাসন বিভাগের সদ্যঃসাবেক এক ছাত্রী বলেন, তিন দিন ধরে টেবিলে টেবিলে ঘুরছি। এখনো কয়েকটি কাগজ হাতে পাওয়া বাকি। জানি না আরো কত দিন ঘুরতে হবে। মনে হচ্ছে, পাঁচ বছর পড়াশোনা করে সনদ অর্জনে যে কষ্ট হয়েছে, তার চেয়ে সনদ উত্তোলনে বেশি কষ্ট হচ্ছে।
পাশে দাঁড়িয়ে থাকা ওই শিক্ষার্থীর স্বামী বলেন, এই দফতরটি এখনো সেই পুরনো আমলে পড়ে আছে। গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্রগুলো যেভাবে চারপাশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে, তাতে মনে হচ্ছে দেশ ডিজিটাল হলেও এই দপ্তরে তার ছোঁয়া লাগেনি।
বাংলা বিভাগের সাবেক এক শিক্ষার্থী বলেন, চাকরি থেকে ছুটি নিয়ে কাগজপত্র তুলতে ক্যাম্পাসে এসে দ্বিগুণ টাকা দিয়ে জরুরি ভিত্তিতে আবেদন করেছি, তবুও নাকি পাঁচ দিন লাগবে। আজ দ্বিতীয় দিন চলছে, এখনো কোনো কাগজ পাইনি। চাকরি বাদ দিয়ে পাঁচ দিন আমি কিভাবে থাকব আর ক্যাম্পাসে থাকবই বা কোথায়? এর ওপর কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের যে ব্যবহার, মনে হয় আমরা তাদের গৃহপালিত প্রাণী! জরুরি ভিত্তিতেও কেন পাঁচ দিন লাগবে কর্তৃপক্ষের কাছে এমন প্রশ্ন রাখেন তিনি।
এম বিল্লাহ নামের সদ্যঃস্নাতকোত্তর সম্পন্ন করা এক শিক্ষার্থী বলেন, জানুয়ারিতে সনদ ও নম্বরপত্রের জন্য আবেদন করেছি। মাস পেরোলেও সনদ না পেয়ে যোগাযোগ করলে কর্মকর্তারা জানান আবেদনপত্র হারিয়ে গেছে। এরপর কয়েক দফায় খোঁজ নিয়েছি, এখনো কাগজ পাইনি।
সুষ্মিতা ঘোষ নামের চতুর্থ বর্ষে অধ্যয়নরত এক শিক্ষার্থী বলেন, আমি গত জানুয়ারিতে প্রথম বর্ষের মার্কশিট উত্তোলনের জন্য আবেদন করেছিলাম। পাঁচ মাস পার হলেও পাচ্ছিলাম না। পরে আমার এক পরিচিতের সাহায্যে গত ২২ তারিখে মার্কশিট হাতে পেয়েছি। উনি সাহায্য না করলে হয়তো আরো কয়েক মাসেও হয়তো পেতাম না। এটা না দিতে পারায় আমি হলে আবাসিক হতে পারিনি। অফিসে গেলে দেখতাম কর্মকর্তারা নেই।
এভাবে ভোগান্তির শিকার হয়ে বর্তমান ও সাবেক শিক্ষার্থীদের অনেকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এই দফতর নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। কর্তৃপক্ষের কাছে বারবার অভিযোগ করা হলেও সমাধানে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নিচ্ছে না কর্তৃপক্ষ। এই দফতরটিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘নরক’ হিসেবেও আখ্যা দেন শিক্ষার্থীদের অনেকে।
ভারপ্রাপ্ত পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক একে আজাদ লাভলু বলেন, সময়ের সাথে বিভাগ ও শিক্ষার্থী বাড়লেও এই দফতরের লোকবল বাড়েনি। তা ছাড়া পর্যাপ্ত জায়গাসংকটের কারণে আমরা কাঙ্ক্ষিত সেবা দিতে পারছি না। পিয়ন ও তৃতীয় শ্রেণির কমপক্ষে ১৫ জন নতুন জনবল দরকার। আমরা বারবার নোট দিলেও কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছে না। কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অসদাচরণ বা অর্থ গ্রহণের অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেয়া হবে।
উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. মাহবুবুর রহমান বলেন, পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক দফতরে শিক্ষার্থীরা ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন বিষয়টি আমার জানা নেই। আমার কাছে কেউ অভিযোগ করেনি। বিশ্ববিদ্যালয়ে জনবলের কোনো সংকট আছে বলে আমার কাছে মনে হয় না। যে জনবল আছে তা দিয়েই সেবা নিশ্চিত করার চেষ্টা করতে হবে। আমরা সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলব, কেন শিক্ষার্থীরা ভোগান্তির শিকার হচ্ছে।

