আসন্ন কোরবানিতে আশীর্বাদ পদ্মা সেতু

আরো পড়ুন

মুসলমানদের অন্যতম বৃহৎ ধর্মীয় উৎসব কোরবানির ঈদ আসন্ন। এবারে কোরবানির ঈদে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে ২১ জেলায় খামারিদের কাছে আশীর্বাদ পদ্মা সেতু। রাজধানী ঢাকাসহ চট্টগ্রাম কিংবা অন্য বড় শহরে যাতায়াত হবে দ্রুত। সময়ের সাথে অর্থও বাঁচবে খামারিদের।

ফেরি ঘাটের দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান হতে যাচ্ছে এতেই খুশি পশু ব্যবসায়ী ও খামারিরা। শুধু তাই নয় প্রচণ্ড গরম আর দীর্ঘ সময় ট্রাকে থেকে পশু অসুস্থ হয়ে মারা যাওয়ার আশঙ্কাও কমিয়ে দিচ্ছ উদ্বোধনের অপেক্ষা থাকা সেতুটি।

আগামী ২৫ জুন উদ্বোধন হতে যাচ্ছে স্বপ্নের সেই পদ্মা সেতু। উদ্বোধনকে কেন্দ্র করে সম্ভাবনাময় ভবিষ্যতের স্বপ্নে গোটা দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ৫ কোটি মানুষ এখন উজ্জীবিত। সেখানে আরো বেশি উচ্ছ্বসিত পশু ব্যবসায়ী ও খামারিরা। কেননা উদ্বোধনের দ্বিতীয় সপ্তাহে ঈদুল আযহা বা কোরবানির ঈদ অনুষ্ঠিত হবে। চাঁদ দেখা সাপেক্ষে আগামী ১০ বা ১১ জুলাই ঈদুল আজহা উদযাপিত হবে। এবারের ঈদে কোরবানির জন্য এক কোটি ২১ লাখ গবাদি পশু প্রস্তুত রয়েছে, যা গত বছরের চেয়ে দুই লাখের বেশি। ঈদে একটা বড় অঙ্কে পশু আসে পদ্মা নদীর ওপার থেকে।

খুলনা ও বরিশাল বিভাগের জেলাগুলো থেকে প্রচুর পশু ঢাকা ও চট্টগ্রামসহ অন্যান্য বড় বাজারে যায়। খুলনা বিভাগে কোরবানিযোগ্য পশু রয়েছে ৮ লাখ ৭৯ হাজার ২৫১টি পশু। আর বরিশাল বিভাগে কোরবানিযোগ্য পশু রয়েছে ৩ লাখ ৭৪ হাজার ৫৪৩টি পশু। স্থানীয় শহরের পাশাপাশি বড় অঙ্কের পশু যায় ঢাকা-চট্টগ্রামে। এই পশু পরিবহনে বড় অঙ্কের অর্থও খরচ হয়।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, শরীয়তপুর, মাদারীপুর, ফরিদপুর, মাগুরা, ঝিনাইদহ, নড়াইল, সাতক্ষীরা, যশোর থেকে পশু নিয়ে খামারিরা সরাসরি রাজধানীতে আসেন ভালো দামের আশায়।

পরিবহন খরচ কমাতে ফরিদপুর অঞ্চলের অধিকাংশ পশু ব্যবসায়ী ট্রলারে পশু নিয়ে রাজধানীতে আসেন। অন্যরা ট্রাকে নিয়ে আসেন পশু। পরিবহনে পশু আনতে গিয়ে রাস্তায় ঘন্টার পর ঘন্টা অপেক্ষা করতে হয়। কখনো জানযট লাগে আর ফেরিঘাটের দীর্ঘ অপেক্ষাতো আছেই। এই দীর্ঘ অপেক্ষায় প্রচণ্ড গরমে অনেক পশু অসুস্থ হয়ে যায়, কখনও আবার মারা যায়।

তবে পদ্মা সেতু চালু হলে রাজধানীতে আসতে খুব বেশি সময় লাগবে না এতে পশুর সরবরাহও বেশি হবে বলে জানান ব্যবসায়ীরা।

কুষ্টিয়ার ব্যবসায়ী হাফিজুর মোবাইলে জানান, ঈদের আগেই যেহেতু খুলে দিচ্ছে সেতু আমাদের আর ঘন্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করা লাগবো না। ঈদের প্রস্তুতি নেয়া শুরু করেছি। গ্রামের হাটে গরু কিনছি। কুষ্টিয়ার আরেক ব্যবসায়ী জব্বার প্রতিবারর আফতাব নগর হাটে গরু নিয়ে আসেন। গতবার বিশটি গরুর এনছিল ঢাকায়। জব্বার বলেন, গতবার কিছু বিক্রি করতে পারিনি। আমার এক সঙ্গির একটি গরুতো মারাই গেলো। তবে গরু বেশি উঠতে পারে ঢাকায়।

কারণ হিসেবে বলেন, পদ্মা চালু হলেতো এলাকার ছোট বড় সবাই ঢাকা যাবি। যার একটি দুটি গরু আছে সেই শেয়ারে ট্রাক ভাড়া দিয়া ঢাকার হাটে তুলবো।

মাগুড়া, ঝিনাইদহ, নড়াইলের একাধিক ব্যবসায়িরাও জানান এই সেতু খুলে দিলে তাদের সুবিধার কথা। মাদারীপুর, শরীয়তপুর ও ফরিদপুরের ব্যবসায়ীরা বলছেন অন্য কথা। তারা বলছেন হাটের সিন্ডিকেটের ব্যবসা শেষ এবার।

মাদারিপুরের ফরিদ মিয়া বলেন, প্রতিবছর ঈদের একদিন আগে শহরের হাটে হঠাৎ গরু সংকট দেখা যায়। ঢাকা থেকে ফোন আসে সেই গরু নিয়া আবার যাইতে যাইতে কয়েক ঘন্টা এতে করে হাটের গরুগুলো দাম অনেক বেশি হয়ে যায়। সারা বছর শুইনা আইলাম সিন্ডিকেটে নাকি দাম বাড়ে এবার সেই কাম শেষ।

কারণ উল্লেখ করে এই ব্যবসায়ী বলেন, গাড়ি ছাড়লে মুহুর্তেই ঢাকা। গরু নিয়া আইতে সময় লাগবো না। আর হাটে গরু কমা শুরু হলে আশপাশের জেলার গরু আসা শুরু হইবো। এখন সেই আশ পাশের জেলার তালিকায় মাদারীপুর, শরীয়তপুর ও ফরিদপুর থাকবো।

প্রাণিসম্পদ অধিদফতর মহাপরিচালক মনজুর মোহাম্মদ শাহাজাদ কোরবানির আগে পদ্মা সেতু খুলে দেয়ায় বিষয়টিকে আশীর্বাদ হিসেবে দেখছেন। তিনি বলেন, আমাদের পর্যাপ্ত পশু আছে কোরবানির জন্য। ঈদের আগে আমাদের সবার স্বপ্নের এই পদ্মা সেতু খুলে দেয়াতে কি হবে আমাদের খামারি আমাদের পশু ব্যবসায়ীদের জন্য আশীর্বাদ। তারা রওনা দিবে দিনে দিনে যেখানে যেতে যান যেতে পারবেন। ২১টি জেলার খামারি ব্যবসায়ীরা এই সুবিধা পাচ্ছে। তাদের সময় অর্থ বাঁচবে। কোন মার্কেট তার গবাদি পশু ভালো দাম পাবে সেটি সে নির্দিষ্ট করে যেতে পারবে। এবছরতো বটেই সারাবছরই কোরবানিতে এটি একটি বিশেষ আশীর্বাদ। হঠাৎ পশু সংকটও হবে না। অন্য এলাকা থেকে এক টানে দ্রুত চলে আসতে পারবে।

প্রাণিসম্পদ অধিদফতর মহাপরিচালক (ডিজি) মনজুর মোহাম্মদ শাহাজাদ আরো বলেন, এই কোরবানিতে যে টাকা লেনদেন হয় এটি কিভাবে হয় বিত্তবানদের পকেট থেকে প্রান্তিক পর্যায়ের খামাড়িদের কাছে। যারা এই গবাদি পশু লালন পালন করে জীবিকা নির্বাহ করে থাকে। এর সাথে তারা গ্রামীণ অর্থনীতির ভিতকে মজবুদ করছে।

পাশাপাশি গ্রামীণ পর্যায়ে নারীদের একটি বৃহৎ অংশ এই গবাদি পশু লালন পালনে যুক্ত থাকে। প্রাণি সম্পদ গবাদি পশু লালন পালনের মাধ্যমে কিন্তু নারীর কর্মের ব্যবস্থা একই সাথে আয়ের ফলে তার ক্ষমতায়ন সৃষ্টি হচ্ছে। নারীরা আয় করছে আয় করলে তার একটা আলাদা মূল্যায়ন হচ্ছে। গ্রামীণ অর্থনীতির ভিত্তি যদি মজবুদ হয় তবে জাতীয় অর্থনীতির ভিত অনেক মজবুদ হয়। সেক্ষেত্রেও এটি বিরাট ভূমিকা রাখছে। কোরবানি আসলে বুঝা যায় প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষ এই গবাদি পশু লালন পালনে স্বাবলম্বি হচ্ছে সেটি। আমাদের দেশের পশুতেই কোরবানি হচ্ছে কয়েক বছর ধরে। খামাড়িদের বিভিন্ন প্রশিক্ষণ, সরকারের নানা পদক্ষেপ বিভিন্ন প্রকল্প গ্রহণে এই খাত অনেক এগিয়ে গেছে।

এদিকে পদ্মার ওপারে যোগাযোগ করে জানা গেছে, কম সময়ে রাজধানীতে যাতায়াত করা যাবে বলে রাজধানীর বাজারে পশু বিক্রি করে দ্রুত ফিরেও যেতে পারবেন ব্যবসায়ীরা। এছাড়াও ওই সড়কে পরিবহনের চালকরা মনে করেন আগে সময় বেশি লাগায় ট্রিপ হতো কম। এখন একাধিক ট্রিপ নিয়ে যাতায়াত করা যাবে। এতে করে ট্রাক মালিকদের বাড়তি আয়ের সুযোগ তৈরি হতে যাচ্ছে।

আরো পড়ুন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

সর্বশেষ