যশোর-বেনাপোল মহাসড়কে বিষফোঁড়া শতবর্ষী রেইন্ট্রি গাছ

আরো পড়ুন

শাহ জামাল শিশির, ঝিকরগাছা: যশোর-বেনাপোল মহাসড়কের যান ও জনচলাচল এখন চরম ঝুঁকির মধ্যে। শতবর্ষী রেইনট্রি গাছের শুকনা ডাল মাথায় ভেঙে পড়ার আতঙ্ক নিয়েই এই সড়কে চলাচল করছে সাধারণ মানুষ। সড়কটির দুইপাশে অবস্থিত গাছগুলোর অবস্থা নাজুক। সড়কে রয়েছে অনেক মৃত, অর্ধমৃত গাছ। এছাড়া অধিকাংশ শতবর্ষী রেইন্ট্রি গাছের কান্ডের ভেতর ‘খোড়ল’(গর্ত) সৃষ্টি হয়ে গাছগুলো ভেঙে পড়ার ঝুঁকি রয়েছে।

জনজীবনে এত ঝুঁকি থাকলেও আইনী জটিলতায় গাছগুলো কাটা যাচ্ছেনা। এর আগে যশোর-বেনাপোল মহাসড়ক চার লেনে উন্নিতকরণের জন্য দু’পাশের প্রায় দু’শ বছরের পুরনো তিন শতাধিক রেইনট্রিসহ ২৩’শ গাছ কেটে ফেলার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। তবে গাছ রক্ষায় পরিবেশবাদীরা হাইকোর্টে একটি রিট আবেদন করেন। সেই আবেদনের প্রেক্ষিতে সড়কের কোন গাছ না কাটতে আদালত নিষেধাজ্ঞা জারি করে। ফলে যান ও জন চলাচলের জন্য হুমকির কারণ হয়ে ওঠা বেশকিছু সংখ্যক ঝুঁকিপূর্ণ গাছ কাটা অপরিহার্য হয়ে উঠলেও সেটি করতে পারছেন না সংশ্লিষ্টরা। তবে মানুষের আন্দোলনের কারণে ঝিকরগাছা বাজারের ১০টি গাছের ডাল কেটেছে জেলা পরিষদ। এছাড়া ঝিকরগাছা বাজার ও পারবাজার থানার মোড়ে সড়কের মাঝখানে গাছ রেখেই মহাসড়ক প্রশস্ত করা হয়েছে।

যশোর বেনাপোল মহাসড়ক 2

সরেজমিনে দেখা যায়, যশোর-বেনাপোল মহাসড়কের ঝিকরগাছা অংশে শতবর্ষী ও নতুন রোপন করা অন্তত ৩০টি রেইন্ট্রি গাছ মৃত হয়ে আছে। এর মধ্যে ঝিকরগাছা উপজেলা মোড়ে আছে চারটি, বাসস্ট্যান্ডে চারটি, পারবাজার চারটি, হাজিরালি মোড়ে তিনটি, বেনেয়ালি বালিখোলায় তিনটি, দেশের বৃহৎ ফুলের বাজার গদখালী পাঁচটি, নবীবনগর একটি, চারাতলা দুইটি, কলাগাছি দুইটি, নাভারণ পূরাতন বাজারে সড়কের পাশে তিনটি গাছ মরে গেছে। প্রতিনিয়ত এসব গাছের ডাল ভেঙে মানুষ আহত হচ্ছে। আতঙ্ক নিয়েই মানুষকে চলাচল করতে হচ্ছে। এসব মৃত গাছ ছাড়াও ডালপালা বিহীন অন্তত বিশটি মৃত গাছের শুকনো ধড় দাঁড়িয়ে আছে।

এছাড়া ঘুর্ণিঝড় আম্ফানে হাজিরালি মোড়ে দুইটি, বেনেয়ালি তিনটি ও কলোনি বাজারে একটি সহ মোট ছয়টি শতবর্ষী গাছ উপড়ে পড়ে গেছে। এই গাছ উপড়ে ফল ব্যবসায়ী কলোনি গ্রামের জাহাঙ্গীর হোসেনের পুরো বসতভিটা ভেঙে পড়েছিল। তিনি জানান, মহসড়ক তৈরীর সময় গাছের বড় বড় শেকড় কেটে ফেলার কারণে এসব গাছ পড়ে গেছে। অন্য গাছগুলোও ঝুকিতে আছে।

প্রসংগত, ১৮৪২ সালে এ রেইনট্রি গাছগুলো লাগিয়েছিলেন যশোরের তৎকালীন জমিদার কালী পোদ্দার। যা এ মহাসড়কে ছায়া দেয়ার পাশাপাশি কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তবে বর্তমানে এসব গাছের অধিকাংশই অর্ধমৃত। মৃত গাছের সংখ্যাও কম নয়।

কিছুদিন আগেও গাছের ডাল ভেঙে পড়ে গদখালী ফুল মার্কেটের শ্রমিক পটুয়াপাড়া গ্রামের আল আমিন আহত হয়েছেন। তার চারটি দাঁত ভেঙে গেছে, এছাড়া মাথায় প্রচন্ড আঘাত পেয়েছেন। তিনি যশোর জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসা নিলেও এখনো সুস্থ্য হননি। ঝড় বৃষ্টির দিনে ডালপালা ভেঙে পড়ায় এরকমভাবে আরো বহুসংখ্যক মানুষ আহত হচ্ছেন। যান চলাচলও ঝুঁকির মধ্যে পড়ছে।

গদখালী ফুল মার্কেটের মুদি দোকানি হাবিবুর রহমান বলেন, আমাদের বাজারে পাঁচটা গাছ মরে গেছে। বাতাস হলেই শুকনো ডাল ভেঙে পড়ে। ঝড় বৃষ্টির দিনে আমরা খুব আতঙ্কে থাকি।

ঝিকরগাছা সেবা সংগঠনের সভাপতি ও নাগরিক অধিকার আন্দোলন কমিটির আহবায়ক মাষ্টার আশরাফুজ্জামান বলেন, উন্নয়ন কাজ ব্যাহত করার জন্য কথিত পরিবেশবাদীরা ২০১৭ সালে গাছ মারার বিপক্ষে আদালতে রিট করে। আদালত মাত্র ছয়মাসের জন্য গাছ মারতে স্টে আর্ডার দিলেও পাঁচ বছর ধরে গাছ মারার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়নি। মানুষের নিরাপত্তা আর উন্নয়নের স্বার্থে ঝুকিপূর্ণ এই গাছগুলো কেটে তিনি নতুন গাছ লাগানোর আবেদন জানান।

যশোর জেলা পরিষদ সূত্র জানায়, সড়কটির পাশের প্রাচীন গাছগুলো তাদের মালিকানাধীন। সূত্রমতে, সড়কটির দুই পাশে বিভিন্ন প্রজাতির ১৭৩৭টি গাছ আছে। এসব গাছের মধ্যে শতবর্ষী পুরাতন রেইন্ট্রির সংখ্যা ৭৪৫টি, নতুন রেইন্ট্রি ৬৮টি, মেহগনি ৫৮৮টি, বট ১৭টি, শিশু ১৫টি, ঝাউ ২টি, আম ৫টি, কাঠাল ২৫৭টি, বাবলা ১৩টি, দেবদারু ১৬টি, শিমুল ১টি ও সেগুন ১০টি। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায় শতবর্ষী বেশ কিছু গাছ মারা গেছে ও যশোর বেনাপোল সড়ক পুনঃনির্মাণ ও সম্প্রসারণের সময় অনেক গাছের শেকড় কাটা পড়েছে। সেগুলো ভেঙে ও উপড়ে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে ।

এপ্রসঙ্গে যশোর জেলা পরিষদের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আরিফ উজ জামান জানান, যশোর বেনাপোল মহাসড়কের প্রাচীন গাছগুলো জেলা পরিষদের মালিকানাধীন। আইনী জটিলতার কারণে অনেক গাছ যানবাহন ও পথচারিদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হলেও সেগুলো আপাতত কাটা যাচ্ছেনা। গাছ কাটার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতের নিষোধাজ্ঞা রয়েছে।

জাগো/এমআই

আরো পড়ুন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

সর্বশেষ