দুই পক্ষই পিটিয়েছে সাংবাদিকদের

আরো পড়ুন

‘গাড়ি থেকে নেমে আমরা লাইভের প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। আমার ক্যামেরাম্যান আমাকে যখন ফোকাস করছিলো, তখন চার-পাঁচজন লোক তাকে ঘিরে ধরলো। বলছিলো, তু্ই ছবি তুললি কেনো? আমাদের ছবি তুললি কেনো?’

মঙ্গলবার (১৯ এপ্রিল) নিউমার্কেটের ব্যবসায়ীদের সঙ্গে ঢাকা কলেজের ছাত্রদের দিনভর সংঘর্ষের মধ্যে পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে হামলার শিকার দীপ্ত টিভির রিপোর্টার আসিফ সুমিত বলছিলেন গণমাধ্যমের সঙ্গে।

সংঘর্ষ চলাকালে সাংবাদিকদের, বিশেষ করে যাদের হাতে ক্যামেরা ছিলো, তাদের উদ্দেশ্যমূলকভাবে পেটানোর বিষয়টি স্পষ্ট। হামলার শিকার বেশির ভাগ গণমাধ্যমকর্মী ছিলেন ব্যবসায়ীদের দিকে। তবে যারা ছাত্রদের দিকে ছিলেন, তারাও হামলার শিকার হয়েছেন।

যেসব গণমাধ্যমকর্মীর ওপর হামলা হয়েছে, তাদের মধ্যে সুমিতের ঘটনাটির ভিডিও ফুটেজ পাওয়া গেছে। এতে দেখা যাচ্ছে, তাকে ও তার ক্যামেরা পারসনকে দল বেঁধে ধাওয়া করছে একদল উত্তেজিত মানুষ, যারা ছিলেন ব্যবসায়ীদের পক্ষে।

রোড ডিভাইডারের লোহার পাত খুলে হাতে নেয় কেউ কেউ। এসব পাত দিয়েও পেটানো হতে থাকে সুমিত ও তার ক্যামেরা পারসনকে।

এই গণমাধ্যমকর্মী বলেন, আমি ক্যামেরাম্যানকে বাঁচাতে গেলাম, কিন্তু তাদের সঙ্গে কথা বলার সুযোগও পাইনি। ওরা লাঠি আর রড লোহার অ্যাঙ্গেল দিয়ে মেরে যাচ্ছিলো।

নিউমার্কেটে হামলা

সুমিত এতটাই আঘাত পেয়েছেন যে তাকে হাসপাতালে ভর্তি করতে হয়েছে। তিনি রাজধানীর পান্থপথের বিআরবি হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন।

হামলাকারীরা কি কিছু বলছিলো? কেনো তাদের এই ক্ষোভ- এমন প্রশ্নে দীপ্ত টিভির রিপোর্টার বলেন, কারণ ছাড়াই মারছে। একজন যখন মারছে, তখন আরেকজন এসে যোগ দেয়। একসময় দেখলাম আমার গাল চুয়ে রক্ত পড়ছে, তখন কোনোভাবে পারছি না।

মার থেকে রক্ষা পেতে মরিয়া সুমিত তখন হামলাকারীদের বলেন, আমি রোজা, আল্লাহর ওয়াস্তে মাফ করেন।

কিন্তু হামলাকারীরা তাতেও ক্ষান্ত হয়নি। গাউছিয়া থেকে নীলক্ষেত মোড় পর্যন্ত মারতে মারতে নিয়ে যাওয়া হয় দুইজনকে।

সুমিত চিনেছেন, হামলাকারীরা ব্যবসায়ীদের পক্ষের। তিনি বলেন, দোকানের কর্মচারী, এই শ্রেণিই বেশি মেরেছে। তবে দু-তিনজন ছিলো, আমাদের বাঁচানোর চেষ্টা করেছে।

আঘাত কতটা গুরুতর- এ বিষয়টি এখনো স্পষ্ট নন সুমিত। বলেন, গতকাল অবজারবেশনে ছিলাম। আজ কেবিনে দিয়েছে। ডাক্তার বলেছেন, সিটিস্ক্যানের পুরো রিপোর্ট এখনো আসেনি। পুরো রিপোর্টের জন্য অপেক্ষা করছে। আরো এক দিন অবজারবেশনে রাখতে চায়।

বাংলা ট্রিবিউনের রিপোর্টার শাহেদ শফিক হামলার শিকার হয়েছেন সুমিতকে বাঁচাতে গিয়ে।

তিনি বলেন, নিউমার্কেটের সামনে যে ফুট ওভারব্রিজ আছে, সেখানে দাঁড়িয়েছিলাম। দেখলাম কিছু ব্যবসায়ী সুমিত ও তার ক্যামেরাপারসনকে মারতে মারতে নিয়ে যাচ্ছিলো। তখন তাদের থামাতে গেলাম। এরপর এলোপাতাড়িভাবে লাথি, কিল, ঘুষি শুরু হয়ে যায়।

পরে মাথার ওপর হাত দিয়ে রাখছি। আমি বলছিলাম, এরা সাংবাদিক, এদের মাইরেন না। তখন তারা বলে, সাংবাদিক হইলে তো আরো মারমু।

আমার গলায় তখন আমার প্রতিষ্ঠানের কার্ড ছিলো। আরেকজন বললো, এটাও সাংবাদিক। এটাকেও মার।

আজকের পত্রিকার রিপোর্টার আল-আমিন রাজু জানিয়েছেন, তাকে পিটিয়েছে ছাত্ররা।

তিনি বলেন, হঠাৎ দেখলাম রাস্তার পাশে একটা বাচ্চা ছেলেকে মারতেছে ওরা। আমি মোবাইল দিয়ে ভিডিও নিতেছি, ভিডিও শেষ করে চলে যাচ্ছিলাম। পেছন থেকে ধরেছে।

বললাম আমি সাংবাদিক। তারা বললো, ভিডিও করা যাবে না। এটা বলতে বলতে একটা ছেলে এসে মারধর শুরু করল।… থাপ্পড় দিছে, আমার চশমা পড়ে গেছে, মোবাইল হাতে থেকে পড়ে গেছে। তখন পেছন থেকে আমাকে আরো জোরে আঘাত করছে।

কী দিয়ে মেরেছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, রামদার পেছনের অংশ দিয়ে বাড়ি দিয়েছে একজন।

পিটুনির পর রাজুকে নেয়া হয় ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে।

রাজু বলেন, শুধু আমার না, কাল ওরা প্রচণ্ড আক্রমণাত্মক ছিলো। ওরা কাউকে ছবি তুলতে দিচ্ছিলো না, ভিডিও করতে দিচ্ছিলো না। চেষ্টা করলেই চড়-থাপ্পড় দিত, গালাগাল করত। অনেকের মোবাইল ফেলে দিছে।

দুই পক্ষের ইটপাটকেলে আহতদের মধ্যে আছেন ইউএনবির ফটো জার্নালিস্ট রাকিবুল হাসান। ঢাকা কলেজের সামনে দাঁড়িয়ে যখন তিনি ছবি তুলছিলেন, তখন কলেজের ওপর থেকে ঢিল এসে লাগে তার ডান পায়ে।

সাংবাদিকদের লক্ষ্য করে ইটপাটকেল

এনটিভি অনলাইনের সাংবাদিক মাসুদ রায়হান পলাশ জানান, দুই পক্ষই গণমাধ্যমকর্মীদের উদ্দেশ্য করে ঢিল ছুড়েছে।

তিনি বলেন, ওরা লক্ষ্য করে ইট মারছিলো। যখনই ছবি তুলতে গেছি, তখনই কথা বলছি, তখনই ঠেলে বের করে দিতো।

পলাশ আহত হয়ে চিকিৎসা নিয়েছেন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে।

সাংবাদিকদের ওপর হামলার বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির সভাপতি হেলাল উদ্দিন বলেন, আমি কী বলবো বলেন তো। কাল মার্কেট বন্ধ। এখানে কর্মচারীরা কোথা থেকে আসে?

সুনির্দিষ্ট কিছু ঘটনা তুলে ধরলে তিনি বলেন, ফুটেজ দেখে সে যেই হোক তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে।

তবে এসব ঘটনার দায় নিতে চান না এই ব্যবসায়ী নেতা। বলেন, আমি এর দায় নেবো কেন? যে করছে সে নেবে। যে করেছে সে অন্যায় করেছে।

আরো পড়ুন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

সর্বশেষ