সাতক্ষীরা প্রতিনিধি : একপাশে খেয়াঘাট, অন্যপাশে সুবিস্তৃত নদী। সঙ্গে আছে কপোতাক্ষ নদও। তবুও নেই তৃষ্ণা মেটাতে পানের যোগ্য এক ফোটা পানি! সুপেয় পানির জন্য এলাকাভেদে যেতে হয় অন্তত তিন থেকে চার কিলোমিটার দূরে!
দক্ষিণাঞ্চলের ভারতীয় সীমান্ত ঘেঁষা জেলা সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার দৃশ্য ঠিক এমনটাই। এই এলাকায় পানযোগ্য পানি সন্ধান করা যেন খড়ের গাদায় সূঁচ খোঁজার মতো।
শ্যামনগর উপজেলার একপাশে রয়েছে নীলডুমুর খেয়াঘাট। এছাড়া দক্ষিণ-পশ্চিমে আছে খোলপেটুয়া নদী। আর তার উত্তর-দক্ষিণে কপোতাক্ষ নদের অবস্থান। বিশাল উপজেলার একদিকে আছে বুড়িগোয়ালিনী আর অন্যদিকে ছোট্ট দ্বীপ গাবুরা ইউনিয়ন।
সুন্দরবন ঘেরা এই উপজেলার এসব ইউনিয়নে পর্যাপ্ত পানি থাকলেও নেই বিশুদ্ধ খাওয়ার পানি। ফলে সাতক্ষীরার উপকূলীয় উপজেলা শ্যামনগরেও সুপেয় পানির জন্য এলাকাভেদে তিন থেকে চার কিলোমিটার দূরে যেতে হয়। নয়তো বর্ষাকালে জমানো পানি খেতে হয় সারা বছরজুড়ে। কেউ কেউ প্রতিনিয়ত কিনেও পানি পান করেন।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, শ্যামনগর উপজেলার জীবন্ত সমস্যা বিশুদ্ধ সুপেয় পানি। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সাগরকূলে বসবাসরত এই জনপদের মানুষকে প্রতিনিয়ত লোনা পানির সঙ্গে যুদ্ধ করে টিকে থাকতে হয়। উপর্যুপরি বেড়িবাঁধ ভাঙনের কারণে একসময়ের সবুজ শ্যামল জনপদ বর্তমানে প্রায় গাছগাছালি শূন্যও হয়ে পড়েছে। কৃষি উৎপাদন নেমে এসেছে শূন্যের কোটায়। ফলে এলাকায় কর্মসংস্থানের সংকটও মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। আর সুপেয় পানির সংকটে জনজীবনও বিপর্যস্ত।
স্থানীয় বাসিন্দা অনিতা মন্ডল জানান, পাঁচ সদস্যের হতদরিদ্র পরিবার নিয়ে নিত্যদিনের সুপেয় পানি জোগানের দায়িত্ব তার। প্রতিদিন খুব সকালে বাড়ি থেকে তিন কিলোমিটার দূরের বুড়িগোয়ালিনী থেকে খাওয়ার পানি সংগ্রহ করেন তিনি। রান্না ও খাওয়ার পানির জন্য প্রতিদিনই মাইলের পর মাইল পথ পাড়ি দিতে হয় তাকে। অনিতা মন্ডলের মতো এভাবেই প্রত্যেককে পানির জন্য জীবনসংগ্রাম চালিয়ে যেতে হয় সাতক্ষীরার উপকূলীয় বুড়িগোয়ালিনী ইউনিয়নে।
সুপেয় পানির সংকট এত প্রবল যে নিত্যদিন যদি বিশাল এই পথ পাড়ি না দেন তাহলে শেষ ভরসা হবে ঘরের পাশের নদীর লবণাক্ত পানি। তাইতো চারিদিকে পানি থাকতেও পানের উপযোগী এক ফোঁটা পানির জন্য বাড়ি থেকে প্রায় তিন কিলোমিটার দূরের বুড়িগোয়ালিনী গ্রামে ছুটতে হয় স্থানীয়দের। এত কষ্ট করে পানি আনার পর তৃষ্ণা মেটাতে গিয়েও ভাবতে হয় শতবার। কারণ, পানি শেষ হলে আবারও ছুটতে হবে! তাই পানি পানেও মিতব্যয়ী এসব অঞ্চলের মানুষ।
চন্দনা রাণী নামে আরেকজন বাসিন্দা জানান, আমাদের এলাকায় পানির সংকট খুবই। আমরা লবণ-পানি খেয়ে বেঁচে আছি। আগে সরাসরি পুকুরের পানি খেতাম। এখান ফিল্টার হওয়ার কারণে কিছুটা হলেও নিরাপদ পানি পান করছি। তারপরও আমাদের পানিতো লবণাক্ত। আমরা আর লবণ-পানি খেয়ে জীবন ধারণ করতে পারছি না। আমাদের গ্রামে যারাই আসে, তাদের কাছেই আমরা মিষ্টি পানির দাবি জানাই।
একটি বেসরকারি সংস্থার উদ্যোগে আমাদের গ্রামে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছিল জানিয়ে চন্দনা রাণী বলেন, ওই কমিটির মাধ্যমে জেলা পরিষদে যোগাযোগ করলে সেখান থেকে এখানে পুকুর খনন করে দেওয়া হয়। ঘূর্ণিঝড়-আইলার সময় আমাদের এই পুকুরটি লবণ-পানিতে ডুবে যাওয়ার কারণে পানিতেও লবণাক্ত হয়ে যায়। পরবর্তীতে আবারও জেলা পরিষদ খনন করে দেয়। কিন্তু আগের মতো আর ভালো পানি পাওয়া যায় না।
চন্দনা রাণী আরও জানান, পানখালী, তালবারিয়াসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে ফিল্টার করা পানি আগে প্রায় তিন থেকে চারশো পরিবার নিত। তবে লবণাক্ততা বৃদ্ধির কারণে এখন দুই থেকে আড়াইশ পরিবার পানি নেয়। আমাদের ফিল্টারের আনুষঙ্গিক খরচ আছে। যে কারণে সবাইকে মাসে ২০ টাকা করে দিতে হয়।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০০৭ সালে ১১ নভেম্বর ঘূর্ণিঝড় সিডর ও ২০০৯ সালের ২৫ মে ঘূর্ণিঝড় আইলার তাণ্ডবের পর থেকে উপকূলীয় এলাকায় সুপেয় পানির এই সংকট কাটছে না। আইলার আঘাতে সমুদ্রের লবণাক্ত পানিতে প্লাবিত হয় বিস্তীর্ণ অঞ্চল। এই অঞ্চলের প্রায় সব বিশুদ্ধ পানির উৎস ধ্বংস হয়ে যায়। লবণাক্ত পানি লোকালয়ে ঢুকে পড়ায় দেখা দেয় সুপেয় পানির তীব্র সঙ্কট। উপকূলের মানুষ সেই সংকট এখনও কাটিয়ে উঠতে পারেনি। যদিও গত একযুগে সরকার ও বিভিন্ন বেসরকারি উদ্যোগে নানা পদক্ষেপ নিয়েছে। তবুও এই সংকট যেন পিছু ছাড়ছে না এই জনপদের।
এ ব্যাপারে সাতক্ষীরার পানি কমিটির সভাপতি অধ্যক্ষ আশেক-ই-এলাহী বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের উপকূলীয় জেলা সাতক্ষীরায় খাবার পানির মারাত্মক সংকট। খাওয়ার সঙ্গে ব্যবহারের পানিরও তীব্রতা রয়েছে। যার কারণ, লবণাক্ত পানির মাত্রটা অনেক বেড়েছে। আশির দশক থেকে এই এলাকায় পানির এই তীব্র সংকট মারাত্মকভাবে বাড়ে। যদিও এর আগে উপকূলের মানুষ পুকুরের বা বিভিন্ন পানি ব্যবহার করতেন।
অধ্যক্ষ আশেক-ই-এলাহী বলেন, ২০০৯ সালে আইলা আঘাত আনলে শ্যামনগর উপকূলের কৈখালী, মুন্সিগঞ্জ, পদ্মপুকুর, গাবুরা ছাড়াও পার্শ্ববর্তী কয়রার বেতকাশী, উত্তর বেতকাশী- এই পুরো অঞ্চলটা প্লাবিত হয়ে যায়। এতে পানির যত আধার ছিল, মানুষগুলো যে পানি ব্যবহার করত, সেই পানিগুলো সব লবণাক্ত পানিতে ডুবে যায়। পাশাপাশি এই এলাকায় মারাত্মকভাবে আশির দশকের পর থেকে বাণিজ্যিক চিংড়ি মাছ চাষ শুরু হয়ে যায়। ফলে পুরোপুরিভাবে এই এলাকার পানি চিংড়ি চাষের কারণে আশপাশের কৃষি জমিগুলো লবণাক্ত পানিতে ভরে যায়।
দক্ষিণ উপকূলীয় অঞ্চলের ৬০ ভাগ মানুষ সুপেয় খাবার পানি থেকে পুরোপুরি বঞ্চিত উল্লেখ করে তিনি বলেন, নারীদের দুই থেকে তিন কিলোমিটার দূরে গিয়ে পানি সংগ্রহ করতে হয়। এই এলাকায় নারীর প্রতি সহিংসতার যে ঘটনাগুলো হয়, তার অন্যতম কারণ হচ্ছে খাওয়ার পানি সংগ্রহ করার কারণে দীর্ঘ সময় পরিবার থেকে বাইরে থাকার কারণে।
এ বিষয়ে শ্যামনগর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান এস এম আতাউল হক দোলন বলেন, দেশের সর্ব দক্ষিণের সর্ববৃহৎ উপজেলা শ্যামনগর। এই অঞ্চল সিডর, আইলা, ফণি, বুলবুল, আম্পান, ইয়াসে বারবার লণ্ডভণ্ড হয়েছে। এই উপজেলার সাধারণ মানুষের সবথেকে প্রবল সমস্যা হচ্ছে বেড়িবাঁধ ও খাওয়ার পানি।
বর্তমানে যে মৌসুম চলছে এতে এখানে পানির সংকট দেখা দিয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, আমাদের উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের মধ্য দিয়ে মানুষের কল্যাণে আমরা প্লাস্টিকের বড় পানির ট্যাংকি প্রদান করে থাকি। এর বাইরেও যে বরাদ্দ আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী প্রদান করেন সেই বরাদ্দ থেকেও আমরা স্বল্প পরিসরে পানির ট্যাংকি দিয়ে সাধারণ মানুষের পানি সংরক্ষণের ব্যবস্থা করে থাকি। তবে যে পরিমাণে পানির চাহিদা সেই পরিমাণে এই সহায়তা খুবই অপ্রতুল। সুপেয় পানির জন্য আমাদের বেশি করে রেইন ওয়াটার হারভেস্টিং প্ল্যান যদি দেওয়া হয় এবং যে এলাকাগুলো নলকূপ সাকসেসফুল, সেই এলাকাগুলোয় যদি আরও বেশি নলকূপ বরাদ্দ দেওয়া হয় তাহলে এলাকার মানুষের পানির চাহিদা মিটবে।
সার্বিক বিষয়ে উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের উপ-সহকারী প্রকৌশলী মো. মোস্তাফিজুর রহমান জানান, শ্যামনগর উপজেলার ১২টি ইউনিয়নের মধ্যে দ্বীপ ইউনিয়ন গাবুরা এবং পদ্মপুকুর ইউনিয়নে সুপয়ে পানির বেশি সমস্যা। ভুরুলিয়া, শ্যামনগর সদর, নুরনগর, ঈশ্বরীপুর ও বুড়িগোলনি- এই পাঁচটি ইউনিয়নে কোনো মিষ্টি পানির আধার নেই। বাকি ইউনিয়নগুলোয় কিছু কিছু অংশে নলকূপ বাসানো সম্ভব। যেখানে বাসানো সম্ভব হচ্ছে না, সেখানে রেইন ওয়াটার হারভেস্টিংয়ের মাধ্যমে পানি সরবরাহ করা হচ্ছে। আর যেখানে মিষ্টি পানির পুকুর আছে, সেখানে ফিল্টারে মাধ্যমে পানি দিয়ে থাকি। বর্তমানে পুরো উপজেলায় ছয় হাজারের বেশি পানির স্থাপনা রয়েছে বলেও জানিয়েছেন উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের এই কর্মকর্তা।

