সাদেক গোল্লা: যে গল্পের শুরু ৬৭ বছর আগে, এখন সুনাম কুড়াচ্ছে বিদেশে

আরো পড়ুন

মুনতাসীর আল ইমরান, যশোর: আজ থেকে ৬৭ বছর আগের কথা। তখন সালটি ছিলো ১৯৫৫। যশোরের শার্শার জামতাল নামকস্থানে ছোট্ট একটি দোকানে দুধ চা বিক্রি করতেন শেখ সাদেক আলী (মরহুম)। সকাল হলেই গোয়ালারা তার দোকানে এসে দুধ দিয়ে যেতেন। হঠাৎ একদিন গোয়ালারা প্রতিদিনের চেয়ে দুধ একটু বেশি দিতে চায়লেন। কিন্তু তিনি অতিরিক্ত দুধ নিতে অনীহা প্রকাশ করেন। তার দোকানে চা পানরত অবস্থায় কুমিল্লার এক ব্যক্তির অনুরোধে অতিরিক্ত দুধ রেখে দিলেন তিনি। সেই অপরিচিত লোকটি শেখ সাদেক আলীকে রসগোল্লা তৈরি কৌশল শিখিয়ে দেন।

এরপর থেকে শেখ সাদেক আলী চায়ের দোকানদার থেকে হয়ে উঠলেন একজন রসগোল্লার দোকানি। আসতে আসতে তিনি ‘সাদেক গোল্লা’ হিসেবে পরিচিত লাভ শুরু করেন। ১৯৫৫ সাল থেকে ১৯৯৯ সাল জীবিত থাকা অবধি তার হাতেই এই রসগোল্লা খেয়েছেন দেশের মানুষ। তার ছয় সন্তানের হাত ধরে রসগোল্লা দেশের গন্ডি পেরিয়ে বিদেশেও সুনাম কুড়াচ্ছে।

জামতলার সাদেক মিষ্টি 01

বাদামি রঙের ছানার তৈরি এই মিষ্টির শ্লোগানে ‘যে চেনে সে কেনে, সাদেকের সৃষ্টি জামতলার মিষ্টি’। যশোর শহর থেকে ৩৮ কিলোমিটার দূরে শার্শা উপজেলার জামতলায় তৈরি হওয়া বিখ্যাত এই মিষ্টি ছয়টি স্থানে বিক্রি হচ্ছে। এখান থেকে সঠিক স্বাদের মিষ্টি ক্রেতারা নিয়ে যাচ্ছেন। মিষ্টির সাইজ অনুযায়ী দামে কম হওয়ায় খুশি ক্রেতারা।

জামতলার রসগোল্লা প্রস্তুত করতে প্রথমে গরুর খাঁটি দুধ বড় চুলাতে পাতিলের মধ্যে জ্বালাতে হয়। পরে এর থেকে ছানা সংগ্রহ করা হয়। ছানা চেপে পানি ঝরিয়ে কিছুক্ষণ টেবিলের ওপরে রাখা হয়। পরে সেই ছানা দিয়ে ছোট ছোট গোল্লা (বল) তৈরি করে নেয়া হয়। এরপর কাঠের অল্প আঁচে এই ছানার বলগুলোকে চিনির সিরায় ফুটানো হয়। ৪০ মিনিট সময় নিয়ে ফুটানোর পরে গোল্লাগুলো বাদামি বর্ণ ধারণ করলে তৈরি হয়ে যায় যশোরে বিখ্যাত সেই সাদেক গোল্লা (জামতলার মিষ্টি)। এখানে ২০ টাকা, ১০ টাকা ও ৫ টাকার সাইজের মিষ্টি তৈরি করা হয়। মিষ্টি তৈরি কারখানা থেকে আউটলেট গুলোতে মিষ্টি পৌঁছানোর ৩ থেকে ৪ ঘণ্টার মধ্যে সব মিষ্টি বিক্রি হয়ে যায়।

ক্রেতা হান্নান আহমেদ বলেন, যশোর মেডিকেল কলেজে পড়াশুনা করে তার বড় মেয়ে হুমায়রা তাবাসুম। যশোরে মেয়ের সাথে দেখা করা শেষে বাড়ির জন্য বড় সাইজের মিষ্টি নিচ্ছেন। তিনি আরো বলেন, আমি নাটোরে বসবাস করি। যখন যশোর আসা হয়, তখনই পরিবারের জন্য জামতলার এই মিষ্টি নিয়ে যাওয়া হয়।

আমিরুল ইসলাম নামে এক বেসরকারি চাকরিজীবী বলেন, আমি ৪০ পিচ বড় সাইজের মিষ্টি নিয়েছি। ঢাকায় অবস্থানরত বড় ভাগ্নির জন্য এই মিষ্টি নেয়া হয়েছে।

তিনি আরো বলেন, জামতলার এই মিষ্টিটা খেতে অনেক নরম সুস্বাদু। অন্য মিষ্টির তুলনায় গুণগতমানও আলাদা।

খালাতো ভাইয়ের অনুপ্রেরণায় জামতলার মিষ্টি তৈরির কারিগরের কাজ নেন মুত্তাজুর রহমান। তিনি বলেন, এক যুগ ধরে কাজ করছেন এই প্রতিষ্ঠানে। প্রতিদিন ১শ’ ৮০ কেজি দুধ জ্বালানো হয়। ২০, ১০ ও ৫ টাকার সাইজের মিলিয়ে ২৪শ’ পিচ মিষ্টি তৈরি হয় প্রতিদিন।

যশোর শহরের অবস্থিত জামতলার সাদেক ভান্ডারের সত্ত্বাধিকারী শাজাহান কবীর (মরহুম শেখ সাদেক আলীর পঞ্চম ছেলে) বলেন, ১৯৫৫ সাল থেকে পিতার হাতের তৈরি মিষ্টি বিক্রি শুরু হয়। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে মিষ্টি খেতে আসেন ক্রেতারা। এই মিষ্টি আত্মীয়-স্বজনের জন্য বিদেশেও পাঠান অনেকে।

এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, বংশ পরম্পরায় যাতে তাদের উত্তরাধিকারীরা এই শিল্পকে ধরে রাখে এজন্য উৎসাহিত করবেন। তাদের ব্যবসায়ীক সুনামের কারণে ভবিষ্যত প্রজন্ম অনুপ্রাণিত হয়ে এ শিল্পকে ধরে রাখবেন বলে আশা করি।

জাগো/এস

আরো পড়ুন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

সর্বশেষ