পরিবারের স্বপ্ন পূরণের আশায় ইউরোপ–আমেরিকাসহ বিভিন্ন দেশে অবৈধ পথে পাড়ি দিতে গিয়ে অসংখ্য বাংলাদেশি প্রাণ হারিয়েছেন। অনেকের লাশ পর্যন্ত ফেরত আসেনি। মানবপাচারকারীদের প্রতারণা, ভয়াবহ যাত্রা আর মৃত্যু—এসবের পরেও তাদের বিরুদ্ধে করা বেশিরভাগ মামলাই শেষ হয়েছে খালাসে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি সাম্প্রতিক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, গত সাড়ে চার বছরে মানবপাচার মামলার প্রায় ৯৫ শতাংশেই অভিযুক্তরা খালাস পেয়েছেন।
এই বাস্তবতা পরিবর্তনে সরকার নতুন আইন এনেছে। গত বৃহস্পতিবার উপদেষ্টা পরিষদ মানবপাচার ও অভিবাসী পাচার প্রতিরোধ ও দমন অধ্যাদেশ–২০২৫ এর খসড়া অনুমোদন করেছে—যা পাচার রোধ ও অপরাধীদের জবাবদিহিতে আরও কঠোর ব্যবস্থা প্রবর্তন করবে।
২০২০: নিষ্পত্তি ১৪ মামলা, ১৩টিতেই খালাস (৪৩ অভিযুক্ত)
২০২১: নিষ্পত্তি ২ মামলা—দুটিতেই খালাস
২০২২: নিষ্পত্তি ৩৪ মামলা—সবকটিতেই খালাস (১৫০ অভিযুক্ত)
২০২৩: নিষ্পত্তি ৪৩৬ মামলা, খালাস ৪১৫—মোট খালাস ১,৬১৭ অভিযুক্ত
২০২৪: নিষ্পত্তি ৩৬৩ মামলা—৩৪২ খালাস (১,২৫০ অভিযুক্ত)
২০২৫ সালের প্রথম ছয় মাস: নিষ্পত্তি ১৪১ মামলা—১৩২ খালাস (৫৩৫ অভিযুক্ত)
ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে বৈঠক শেষে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম সাংবাদিকদের বলেন—
“মানবপাচার বাংলাদেশে গভীর উদ্বেগের বিষয়। এটি শুধু মানবিক ট্র্যাজেডি নয়, জাতির ভাবমূর্তির জন্যও ক্ষতিকর। ভুক্তভোগীদের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করাই আইনের মূল লক্ষ্য।”
তিনি জানান, আন্তর্জাতিক মান পূরণে এবং স্থল–সমুদ্র–আকাশপথে বাড়তে থাকা পাচার রোধে নতুন অধ্যাদেশ অত্যন্ত জরুরি।
নতুন আইনে পাচারে সন্দেহভাজনদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ থাকছে। এর মধ্যে রয়েছে—
- আদালতের আদেশে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট জব্দ
- সম্পদ জব্দ
- তদন্তকালীন বিদেশ ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা
- অনিয়মিত পথে বিদেশে পাঠানোর অপরাধে কঠোর শাস্তির বিধান
- অনলাইন মাধ্যমে পাচার নিয়োগ দমনে ডিজিটাল নজরদারি–ভিত্তিক ব্যবস্থা
পাচারে অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার বেড়ে যাওয়ায় নতুন আইনে ডিজিটাল চোরাচালান থামানোর বিশেষ শর্তও যুক্ত হয়েছে।
অধ্যাদেশে অভিবাসীদের চোরাচালান (Smuggling of Migrants–SOM) সংজ্ঞায়িত করে আলাদা অধ্যায় যুক্ত করা হয়েছে। আগের আইনে এই অপরাধ স্পষ্ট সংজ্ঞায়িত না থাকায়—
- বহু SOM মামলা মানবপাচার মামলা হিসেবে দায়ের করতে হতো
- ফলে প্রয়োজনীয় প্রমাণের অভাবে আসামিরা একের পর এক খালাস পেয়ে যেত
নতুন আইনে এর সমাধান এসেছে।
অভিবাসী চোরাচালানে জড়িত বা সহযোগী হলে ৩–১০ বছর কারাদণ্ড
- ন্যূনতম ১ লাখ টাকা জরিমানা
- সংগঠিত পাচার গোষ্ঠীর ক্ষেত্রে মৃত্যুদণ্ড বহাল
- অভিবাসী চোরাচালানের তীব্র রূপে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড
- পাচারে সহায়ক অনলাইন–ইলেকট্রনিক–মুদ্রিত বিজ্ঞাপন প্রচার করলেও ৩–৭ বছর কারাদণ্ড ও জরিমানা
২০১৯ সালে সবুজবাগ থানায় এক যুবককে ইরাকে চাকরির প্রতিশ্রুতি দিয়ে লিবিয়ায় পাচারের অভিযোগে মামলা হয়। বিপুল টাকা হাতিয়ে নেওয়ার পর তাকে দেশে ফেরত পাঠানো হয়। ২০২৪ সালের ৩১ জানুয়ারি আদালত ছয়জন অভিযুক্তকে খালাস দেন—কারণ, মানবপাচারের কোনো প্রমাণ আদালতে উপস্থাপন করতে পারেনি তদন্ত সংস্থা।
এ ধরনের ঘাটতি দূর করতেই নতুন আইন তদন্তের ধাপ, সক্রিয় নজরদারি এবং বিচারের কাঠামো আরও স্পষ্ট ও শক্তিশালী করেছে।

