দিন বদলে অনেক কিছুই কালের গর্ভে হারিয়ে যায়, কিন্তু কিছু স্মৃতি মনের মণিকোঠায় অমলিন হয়ে থাকে। তেমনই এক স্মৃতিময় নাম মণিহার সিনেমা হল, যা আভিধানিকভাবে ‘রত্নধারণকারী’ অর্থে ব্যবহৃত হয়। নামের মতোই, এই সিনেমা হলটি যেন যশোরের রত্ন ছিল, যা দেশকে ছাড়িয়ে গোটা এশিয়ায় এক অনন্য পরিচিতি এনে দিয়েছিল। সম্প্রতি মণিহার বন্ধ হয়ে যাওয়ার খবর অগণিত মানুষের মনে রক্তক্ষরণ ঘটিয়েছে।
১৯৮২ সালে যশোরের ব্যবসায়ী সিরাজুল ইসলাম সুস্থ বিনোদনের জন্য একটি মানসম্মত সিনেমা হল নির্মাণের উদ্যোগ নেন। পত্রিকার মাধ্যমে নাম আহ্বান করা হলে শত শত মানুষের পাঠানো নামের মধ্যে থেকে ‘মণিহার’ নামটি চূড়ান্ত করা হয়। প্রায় চার বিঘা জমির ওপর নির্মিত চারতলা শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত এই হলটি যাত্রা শুরুর দিন থেকেই সারা দেশে আলোচিত ছিল। ঢাকার স্থপতি কাজী মোহাম্মদ হানিফ এর নকশা করেন এবং বরেণ্য চিত্রশিল্পী এস এম সুলতান এর শোভাবর্ধনের কাজ করেন। সিনেমার রিলের আদলে বানানো র্যাম্প সিঁড়ি, ঝরনা, মনোমুগ্ধকর ঝাড়বাতি, উল্টো ঘড়ি এবং স্বয়ংক্রিয় পর্দা ছিল এর অন্যতম আকর্ষণ। বিশেষ করে র্যাম্প সিঁড়ি দিয়ে মোটর সাইকেল বা প্রাইভেট কার চালিয়ে তিনতলায় ড্রেস সার্কেল রুমে যাওয়া যেত। খুলনা বেতারে মণিহার নিয়ে প্রচারিত অনুষ্ঠানগুলো হলটিকে দর্শকের কাছে আরও জনপ্রিয় করে তোলে।
১৯৮৩ সালের ৮ ডিসেম্বর দেওয়ান নজরুল পরিচালিত সোহেল রানা ও সুচরিতা অভিনীত ‘জনি’ সিনেমা দিয়ে মণিহারের প্রদর্শনী শুরু হয়। সেই প্রথম ম্যাটিনি শোতে মাত্র পাঁচ টাকা দিয়ে টিকিট কেটে ছবিটি দেখেছিলেন আবু কালাম। তখন তার বয়স ছিল মাত্র ১১ বছর। তিনি স্মৃতিচারণ করে বলেন, সে সময় মণিহারের টিকিট ছিল সোনার হরিণের মতো। হলের বাইরে যত লোক অপেক্ষা করত, তার চেয়ে বেশি লোক টিকিট না পেয়ে ফিরে যেত। কাউন্টার থেকে টিকিট কেনার জন্য লম্বা লাইনে দাঁড়িয়ে প্রতিযোগিতা চলত, এবং ব্লাকে টিকিট কেনা-বেচা ছিল রমরমা ব্যবসা। পুরোনো দিনের এসব গল্পে টিকিট না পেয়ে অসৎ উপায় অবলম্বন করার কথাও উঠে আসে, যেমন চোখে গুল ছিটিয়ে বা ব্লেড মেরে টিকিট ছিনিয়ে নেওয়া। সবার একটাই উদ্দেশ্য ছিল: একবার হলেও হলের ভেতরে গিয়ে ছবি দেখা।
মণিহার ভাঙ্গার খবরে হৃদয় ভাঙছে অনেকের

