নিজস্ব প্রতিবেদক
পন্যবাহী যানবাহনে ওভারলোড (অতিরিক্ত ওজন) নিয়ন্ত্রণের জন্য গতবছর যশোর খুলনা মহাসড়কের চেঙ্গুটিয়া এলাকায় সড়ক ও জনপদ বিভাগ একটি ওয়ে স্কেল স্থাপন করে। স্কেলটি চালু হওয়ার তিনদিনের মধ্যে বন্ধ হয়ে যায়। যা এখন অবধি বন্ধ রয়েছে। দীর্ঘদিন পড়ে থেকে ওয়ে স্কেলের যন্ত্রপাতি নষ্ট হচ্ছে। সওজ বিভাগ বলছে, ‘সড়কে ওভারলোড বন্ধে স্কেলটি স্থাপন করা হলেও স্থানীয় ট্রাক ও ট্রাংকলরি মালিক সমিতির আপত্তির মুখে চালু করে আবার বন্ধ করে দেওয়া হয়। এতে সরকারের গৃহীত প্রকল্পের প্রায় দেড় কোটি টাকা জলে গেছে। এদিকে, যানবাহনে ওভারলোডের কারণে এই সড়কটি দিন দিন নষ্ট হয়ে যাচ্ছে অভিযোগ স্থানীয়দের। তাদের দাবি, ওভারলোডের কারণে এই সড়কের বেশিরভাগ অংশ উঁচু নিচু হয়ে গেলেও সওজ বিভাগ কার্যকরি কোন পদক্ষেপ নেয়নি।
এই বিষয়ে জেলা নাগরিক অধিকার আন্দোলনের সমান্বয়ক শেখ মাসুদুজ্জামান মিঠু বলেন, ‘প্রথম এই সড়ক নির্মাণে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ও সড়ক বিভাগ অনিয়ম-দুনীর্তি করেছে। তার ফলে এই সড়ক সংস্কারের কিছুদিনের মধ্যে চলাচলের অনুপোযোগি হয়ে পড়েছে। তার পরেও সড়ক ঠিক রাখার টেষ্টাতে সওজ বিভাগ যে ওয়ে স্কেল নির্মান করেছিলো; সেটা চালু হওয়ার পর বন্ধ রাখা হয়েছে। ঘটনাটি দুঃখজনক। স্কেলটি চালু থাকলে অভারলোড হতো না। যানবাহনে ওভারলোডের কারণে এই সড়কটি দিন দিন নষ্ট হয়ে গেলেও সওজ বিভাগ কার্যকরি কোন পদক্ষেপ নেয়নি।’
যশোর সওজ ও স্থানীয় বাসিন্দা সূত্রে জানা গেছে, সীমার অতিরিক্ত পণ্য নিয়ে যানবাহন চলাচল ঠেকাতে ২০২০-২১ অর্থবছরে যশোর খুলনা মহাসড়কের অভয়নগর উপজেলার চেঙ্গুটিয়া এলাকায় পণ্য পরিমাপের জন্য সওজ বিভাগ একটি ওয়ে স্কেল বা ওজন নিয়ন্ত্রণকেন্দ্র স্থাপন করে। ১ কোটি ৬৩ লাখ ব্যয়ে ওয়ে স্কেলটি স্থাপন করা হয়। এর পাশেই ওয়ে স্কেলটির পরিচালনা করার জন্য ১০ জন কর্মচারীর জন্য তিন কক্ষ বিশিষ্ট একতলা একটি ভবন নির্মাণ করা হয়। কিন্তু স্কেলটি চালু হওয়ার তিনদিনের মাথায় নওয়াপাড়া এলাকার ট্রাক মালিক সমিতির লোকজন ও স্কেল টি বন্ধ করার জন্য কর্মকর্তাদের জানিয়ে আসে। এমনকি বন্ধ না করাতে ট্রাক মালিক সমিতির লোকজন স্কেল পরিচালনা শ্রমিকদের মারধরও করে। এরপর খুলনা বিভাগীয় কমিশনার ও জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে এ বিষয়ে বৈঠক হয়। এরপর ওই স্কেলটি বন্ধ করে রাখা হয়। সেই থেকে অকার্যকর অবস্থায় স্থাপনাটি পড়ে আছে। দীর্ঘদিন পড়ে থেকে স্কেলটির যন্ত্রপাতি নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, মহাসড়কের পাশে ওয়ে স্কেলটি স্থাপন করা আছে। স্কেলের সাথেই একটি দাপ্তরিক কক্ষ রয়েছে। কক্ষটি তালাবন্দ অবস্থায় পড়ে রয়েছে। স্কেলের উপরে যানবাহন ওঠা নামার মুখেই কয়েকটি ট্রাক দাঁড় করিয়ে রাখা আছে। স্থানীয় লোকজন স্কেলের পাশেই বালু স্তুপ করে ফেলে রেখেছেন। এই ওয়ে স্কেলটি পরিচালনার কাজে নিয়োজিত কর্মচারীদের আবাসন সুবিধার জন্য পাশেই তিন কক্ষ বিশিষ্ট একতলা একটি ভবন রয়েছে। ওই ভবনটি ব্যবহার করতে দেখা গেল, সড়ক সংস্কার কাজের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের শ্রমিক কর্মচারীদের। সেখানে থাকা প্রতিষ্ঠানের কর্মচারীরা বলেন, ভবনটি পড়েছিল বলে কাজের স্বার্থে আমরা ব্যবহার করছি। যানবহনে ওভারলোডের কারণে এই সড়কটি নষ্ট হয়ে যাচ্ছে বলে জানান সড়ক সংস্কারের কাজে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের শ্রমিক কর্মচারীরাও জানিয়েছেন।
হানিফ নামে এক ট্রাক ড্রাইভার বলেন, আমরা নওয়াপাড়া থেকে বিভিন্ন পণ্য নিয়ে সারাদেশে পৌঁচ্ছে দিয়ে থাকি। যেখান থেকে পন্য লোড করি; সেখানেই ওজন করে গাড়ি লোড দেওয়া হয়। ওয়ে স্কেল থাকলে তো ভালো। কয়েকদিন এই ওয়ে স্কেল চালু হলে ট্রাকে সড়কের নির্ধারিত পণ্যের তালিকার বাইরে বেশি পন্য কেউ নিতে পারতো না। এতে এখানকার ব্যবসায়ীদের দাবির পেক্ষিতে স্কেলটি বন্ধ করে দেয়।
জয়ন্ত নাথ নামে আরেক ট্রাক ড্রাইভার বলেন, নওয়াপাড়া থেকে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় পন্য পৌঁচ্ছে দেওয়ার জন্য ‘ফুল ট্রাক চুক্তি’ নীতিতে ভাড়া চুড়ান্ত করা হয়। এই জন্য কোম্পানি বেশি বেশি পণ্য লোড দিয়ে দেয়। কিন্তু সওজের ওয়ে স্কেল বসানোর পর সেটি করতে পারছিলো না তারা। তাই ব্যবসায়ী ও স্থানীয় ট্রাক মালিক সমিতির দাবি জানায়। সেই থেকে এখনো স্কেলটির বন্ধ রয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে যশোর জেলা ট্রাক ও ট্রাঙ্কলরি মালিক সমিতির সভাপতি রেজাউল বিশ্বাস বলেন, ‘ওয়ে স্কেলটি চালু হলে আমরা আপত্তি জানিয়েছিলাম একটা সত্য। আমাদের দাবি ছিল, সারাদেশে একযোগে ওয়ে স্কেল কার্যকর করতে হবে। শুধু নওয়াপাড়া এলাকায় এই স্কেল কার্যকর হলে সারাদেশের ব্যবসায়ীরা নওয়াপাড়া নৌবন্দর ব্যবহার করতে আসতো না। ফলে এই বন্দরটি ব্যবসা-বাণিজ্যে গতি হারাতো। যে কারণে আমরা খুলনা বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ে গিয়ে বৈঠক করে এই দাবি জানিয়েছিলাম। সারাদেশে ওয়ে স্কেল কার্যকর না হলে শুধুমাত্র যশোরে কার্যকর করা ঠিক হবে না। যানবহনে ওভারলোডের কারণে এই সড়কটি দিন দিন নষ্ট হয়ে যাচ্ছে সওজ বিভাগের কর্মকর্তাদের এমন অভিযোগ উড়িয়ে দিয়ে রেজাউল বিশ্বাস বলেন, একই ওভারলোডেড ট্রাক নওয়াপাড়া ছেড়ে উত্তরবঙ্গ- দক্ষিণবঙ্গ ও ঢাকাসহ দেশের সব জায়গায় চলাচল করছে। অন্য কোথাও সড়ক এতো বেশি নষ্ট হচ্ছে না।ওভাররোডের কারণে না বরং নির্মাণ ত্রুটির কারণেই সড়কটি বারবার নষ্ট হচ্ছে’।
সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর যশোরের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী আরিফ মাহমুদ বলেন, ‘যশোর খুলনা সড়কে অভারলোডেড বন্ধ করার জন্য ওয়ে স্কেল স্থাপন করা হয়। নির্মাণের পর চালু হওয়ার কিছুদিন পর স্থানীয় লোকজন ও পরিবহন শ্রমিকরা আপত্তি জানায়। নওয়াপাড়ার ব্যবসায়ী ও ট্রাক শ্রমিকরা একদিন এসে বন্ধের দাবি জানিয়ে ওয়ে স্কেলের কর্মচারীদেরও মারধর করে। নিরাপত্তা চেয়ে বিষয়টি প্রশাসনকে জানালে তারা তেমন ব্যবস্থা নেয়নি। এর পর বিষয়টি সড়ক অধিদপ্তরে জানালেও তারা স্থানীয়দের বুঝিয়ে চালু রাখার নির্দেশনা দেয়। কিন্তু স্থানীয় ব্যবসায়ীদের আপত্তিতে এখনো বন্ধ রয়েছে।
তিনি বলেন, ওয়ে স্কেল বসানোতে এই সড়কে অভারলোডেড বন্ধ হয়ে যায়। এই কারণেই স্থানীয় ব্যবসায়ী ও ট্রাক সমিতির লোকজন আমাদের আক্রমন করেছিলেন।’
ওই স্কেলটি বন্ধ করে রাখা হলো কেন এমন প্রশ্নের জবাবে সওজ বিভাগ যশোরের নির্বাহী প্রকৌশলী গোলাম কিবরিয়া বলেন, ‘স্কেল টি চালু হওয়ার পর স্থানীয় ট্রাক মালিক ও শ্রমিকেরা আপত্তি জানায় এরপর সেটি আবার বন্ধ করে রাখা হয়। ওই অবস্থায় পড়ে আছে। ওভারলোডের কারণে সড়কটি উচু নিচু হয়ে গেছে বলে জানান তিনি। তাহলে পণ্যবাহী যানবাহনের অভারলোড পরিমাপ করার দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান এখন কোনটি- এমন প্রশ্নের বিষয়ে তিনি কিছু জানাতে পারেননি।
জাগো/জেএইচ

