নিজস্ব প্রতিবেদক
ভুষিবোঝাই ট্রাকটি যখন রেলগেটটিতে ঢুকে পড়ে তখন ক্রসিংয়ের গেট ছিল খোলা। আর সে কারণেই খুলনামুখী রকেট মেল ট্রেনটির সামনে পড়ে যায় এটি। সরে যাওয়ার আগেই ধাক্কা খেয়ে চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে উল্টে যায় ট্রাকটি। এসময় ট্রাকের ভিতরে থাকা চালক ও হেলপার ঘটনা স্থলেই নিহত হয়। আজ রবিবার ভোর সাড়ে পাঁচটা দিকে যশোর সদরের চূড়ামনকাটি রেলক্রসিংয়ে এ দুর্ঘটনা ঘটার পর থেকে ওই রেলক্রসিংয়ের গেটম্যান পলাতক রয়েছেন। পুলিশ ও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে। তাদের ভাষ্য, দুর্ঘটনার সময় প্রচন্ড কুয়াশাচ্ছন্ন ছিলো। ওই সময় গেটম্যান ঘুমিয়ে ছিলেন। গেটম্যানের দায়িত্ব অবহেলার কারণে এই দুর্ঘটনাটি ঘটেছে। নিহতরা হলেন ঝিনাইদহের কোটচাঁদপুর উপজেলার কাগমারী গ্রামের বাহাদুর মিয়ার ছেলে ট্রাক চালক পারভেজ হোসেন (৫০) ও মহেশপুর উপজেলার আজমপুর গ্রামের মৃত শহিদুল ইসলাম ওরফে শহিদের ছেলে হেলপার নাজমুল ইসলাম (৪০)।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্র জানায়, ভোর সাড়ে ৫টার দিকে চিলাহাটি থেকে খুলনামুখী রকেট মেল ট্রেনটি খুলনার উদ্দেশ্য যাচ্ছিলো। ট্রেনটি যখন সদর উপজেলার চূড়ামনকাটি রেল ক্রসিংয় পার হচ্ছিলো; এসময় চৌগাছাগামী ভূষিবাহী (ঝিনাইদহ ট- ১১-১৬৬৭) একটি ট্রাকও চলে আসে। রেল ক্রসিংয়ের বার খোলা থাকাতে ট্রাকটি ক্রসিংয়ে ঢুকে পড়ে। এমন সময় এই দুর্ঘটনাটি ঘটে। এতে ট্রাকের হেলপার ও ড্রাইভার ঘটনাস্থলেই মারা যান। দুর্ঘটনার পরপরই ফায়ার সার্ভিস, রেলওয়ে পুলিশ, সদর পুলিশসহ প্রশাসন উদ্ধার তৎপরতা শুরু করে।
স্থানীয় বাসিন্দা চুড়ামনকাটি গ্রামের আনিসুর রহমান বলেন, ‘আজ ভোর থেকেই ঘন কুয়াশায় আচ্ছাদিত ছিলো। বাড়ির মধ্যে থেকে বিকট শব্দ শুনে রাস্তায় বের হয়ে দেখি রেল লাইনের পাশে উল্টে আছে বড় ট্রাক। ট্রাকটি দেখেই বুঝলাম ট্রেনের ধাক্কা খেয়েছে। কাছে যেয়ে দেখি ট্রাকের ভিতরে দুটি মানুষ। তারা দুজনেই রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে রয়েছে। এর পর পুলিশ আর ফায়ার সার্ভিস এসে ট্রাকের থাকা ভুষি সরিয়ে ট্রেন লাইন পরিস্কার করে। আর নিহত দুইজনরে যশোর জেনারেল হাসপাতালের মর্গে পাঠায়। তিনি জানান, এই রেলক্রেসিংয়ে দায়িত্বে ছিলেন চুড়ামণকাঠি দাসপাড়া এলাকার সজল কুমার। তিনি গেট লাগানোর দায়িত্ব পালন না করে ঘুমিয়ে থাকায় বড় ধরণের দুর্ঘটনাটি ঘটেছে।
ট্রাক হেলপার নাজমুলের মা নাসিমা বেগম বলেন, ‘ওরে ট্রাকে হেলপারি করতে নিষেধ করেছি। তার পরেও আমার কথা না শুনে গাড়ি চালাতে আসে। গতকাল সন্ধ্যায় আমার ছেলের সঙ্গে শেষ কথা হয়। আর সকালে শুনি আমার ছেলে এই দুনিয়াতে নেই। আহাজারি করতে করতে তিনি বলেন, ‘দোষ সব এই গেটম্যানের। যদি রেলগেটের বারটি যদি নামাতো গেটম্যান। তাহলে আমার ছেলেটারে এভাবে জীবন দিতে হতো না। এতোক্ষণ ছেলেটা আমার বুকে থাকতো। চার বছর আগে আমার স্বামী মারা গেছে। আমার একটাই ছেলে । এই ছেলেটা আমার সংসার চালাতো। এখন আমার কি হবে! আমার সব শেষে হয়ে গেছে। আমার আর কিছু নেই। ও নাজমুল…। তুই আমারে ফেলাইয়া কই গেলি রে..বাবা। আমার সংসারের কি হবে। তার সংসারে কোন ছেলে মেয়েও নেই।
ট্রাকটির মালিক শাহীন হোসেন জানান, ‘গতকাল শনিবার ঢাকার সিটি মিল থেকে আমারে ট্রাকে করে ভুষি নিয়ে আসছিলো। ভুষিগুলো দেওয়ার কথা ছিলো চৌগাছার শফি স্টোরে। গেটম্যানের ভুলের কারণে এই দুর্ঘটনাটি ঘটেছে। ট্রেন আসার আগে গেটের বারটি লাগানো থাকলে এই দুর্ঘটনাটি ঘটতো না।গেটম্যানের দায়িত্ব অবহেলার কারণে আমার দুই কর্মচারীর প্রাণ গেল। একই সাথে আমার ট্রাকটি দুর্ঘটনার শেষ হয়ে গেল।’
এদিকে দুর্ঘটনার খবর পেয়ে যশোর সেনানিবাস ফায়ার স্টেশনের কর্মীরা ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। সিনিয়র স্টেশন কর্মকর্তা নাহিদ মামুন বলেন, ‘সকাল ৫টা ৪৫ মিনিটে আমরা দুর্ঘটনার খবর পেয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলে যাই। ভুষিবোঝাই ট্রাকটি উল্টে গেছিল তার সামনের অংশ দুমড়ে-মুচড়ে যায়। আমরা স্পট ডেড হিসেবে ট্রাকের চালক ও হেলপারকে উদ্ধার করি। তিনি আরও বলেন, আমরা রেল লাইনের উপরে পড়া থাকা ভুষি পরিষ্কার করি। পরে পুলিশ এসে ট্রেকার দিয়ে ট্রাকটি সরিয়ে ফেলে।
যশোর কোতয়ালী মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আব্দুর রাজ্জাক বলেন, ট্রেনের সাথে ট্রাকের ধাক্কায় ট্রাকচালক ও হেলপারের মৃত্যু হয়েছে। বিষয়টি জিআরপি পুলিশের। এই ঘটনায় আমরা প্রাথমিকভাবে ধারণা করছি গেটম্যানের দায়িত্ব অবহেলার কারণে এই দুর্ঘটনা ঘটেছে। দুর্ঘটনার পরে গেটম্যান পলাতক রয়েছে। যশোর রেলের স্টেশন মাস্টার আইনাল হাসান বলেন, ভোর সাড়ে ৫টার দিকে চিলাহাটি থেকে খুলনামুখী রকেট মেল ট্রেনটিতে দুর্ঘটনার ঘটনা ঘটে। দুর্ঘটনার পর খুলনাগামী সকল রেললাইনে ট্রেন কিছুক্ষণ চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। তবে আবার ট্রেন চলাচল স্বাভাবিক হয়েছে।
জেবি/জেএইচ

