উন্নত জাতের পাটবীজ উৎপাদন করা শিখতে বিদেশ যেতে চান পাট ও বস্ত্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা। উন্নত প্রযুক্তিনির্ভর পাট ও পাটবীজ উৎপাদন ও সম্প্রসারণ প্রকল্পের সংশোধিত প্রস্তাবনায় এই আবদার করা হয়েছে।
তারা বলছেন, ভারতে পাটের বীজ উৎপাদনের ভালো পদ্ধতি আছে। সে সম্পর্কে জানতে তারা সেখানে যেতে চান। এদিকে বৈশ্বিক এই সংকটকালে প্রকল্পের আওতায় বিদেশ প্রশিক্ষণে যাওয়া না যাওয়ার অভিমত দিয়েছে পরিকল্পনা কমিশন।
প্রকল্পটির উপস্থাপনায় দেখা যায়, উন্নত প্রযুক্তিনির্ভর পাট ও পাটবীজ উৎপাদন ও সম্প্রসারণ প্রকল্পটি জুলাই ২০১৮ থেকে মার্চ ২০২৩ মেয়াদে বাস্তবায়নের জন্য অনুমোদিত হয়। পাট অধিদফতর এখন চাইছে, সেটির মেয়াদ ২ বছর ৩ মাস বাড়িয়ে জুন ২০২৫ মেয়াদে ৩৭৩ কোটি টাকা ব্যয়ে বাস্তবায়ন করতে।
এ প্রকল্পের আওতায় উন্নত জাতের পাটের বীজ উৎপাদনে প্রশিক্ষণ নিতে ২০২২-২৩ অর্থবছর থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ভারতে যেতে চাইছেন পাট অধিদফতর ও বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা। যদিও পরিকল্পনা কমিশন প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভার কার্যপত্রে বিদেশ প্রশিক্ষণ না দেয়ার অভিমত দেয়া হয়েছে। জানতে সংশ্লিষ্ট শাখার কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি পিইসি সভার আগে এ বিষয়ে কথা বলতে রাজি হননি।
এ বিষয়ে পাট অধিদফতরের যুগ্ম সচিব ও প্রকল্প পরিচালক দীপক কুমার সরকার বলেন, আমাদের দেশে পাটের বীজের যে চাহিদা আছে, সেটা আমরা পূরণ করতে পারছি না। সেকারণেই এ প্রকল্পটি নেয়া হয়েছে। ভারতে পাটবীজে উৎপাদনের কার্যকর একটা পদ্ধতি রয়েছে। সে সম্পর্কে জানতে পারলে আমাদের সুবিধা হবে- সেটাই মূল বিষয়। তা ছাড়া পাটের বীজ উৎপাদন দেখার তো কোনো প্রয়োজন নেই।
প্রকল্পটিতে দেশের অভ্যন্তরেও ভ্রমণ খাতে ১৭ কোটি ২৭ লাখ টাকা ব্যয়ের কথা বলা হয়েছে। প্রসঙ্গত, ২০১৮ থেকে এ পর্যন্ত চার বছরে এ খাতে ২ কোটি ৬৩ লাখ টাকা খরচ করা হয়েছে। বাকি মাত্র দুই বছরে এ খাতে ১৫ কোটি টাকা ব্যয় বরাদ্দের প্রস্তাবকে অস্বাভাবিক মনে করছে কমিশন।
এ বিষয়ে প্রকল্পটির পরিচালক বলেন, মূল প্রস্তাবনায় বিভিন্ন উপজেলা পর্যায়ের কর্মকর্তাদের জন্য ২৯২টি মোটরসাইকেল কেনার সংস্থান ছিল। কিন্তু সেটি বাদ দেয়া হয়েছে। এখন তাদের তো যাতায়াত ভাতা দিতে হবে। এখানে সেটাই ধরা হয়েছে।
এদিকে প্রকল্পটিতে প্রচার ও বিজ্ঞাপনের ক্ষেত্রে ৬ কোটি ৮৯ লাখ টাকা ব্যয় ধরা হয়েছে। এ ব্যয়কেও ‘অস্বাভাবিক’ মনে করছে পরিকল্পনা কমিশন। তবে প্রকল্প পরিচালক দীপক কুমার সরকার বলছেন, এই প্রকল্পে কৃষকদের প্রদর্শনীর জন্য সাইনবোর্ড দিতে হবে। এ খাতে যে খরচ ধরা হয়েছে, সেটাকে সে কারণে বেশি মনে হচ্ছে।
এ ছাড়া প্রকল্পটিতে উন্নত জাতের পাটের বীজ উৎপাদন ও স্বল্প পানিতে পাট জাগ দেয়ার বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে ৫ লাখ ৫০ হাজার কৃষককে প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। এর মধ্যে উচ্চফলনশীল পাটবীজ উৎপাদনের জন্য ১ লাখ ৫০০ জন কৃষককে এবং গুণগত মানসম্পন্ন পাটের আঁশ উৎপাদন ও পচনের জন্য ২ লাখ ৬১ হাজার ৩৫০ জন কৃষককে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ দেয়া হবে। এতে ব্যয় হবে ৫৭ কোটি ৪৩ লাখ টাকা।
প্রকল্প সংশোধনের কারণ হিসেবে প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে, কোভিড-১৯ পরিস্থিতির কারণে পাটচাষিদের তালিকা, প্রশিক্ষণ, কৃষক সমাবেশ, সেমিনার-কর্মশালা এবং পাটবীজ ও সার লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী বিতরণ করা সম্ভব হয়নি। তাই ২ বছর ৩ মাস মেয়াদ বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। এ ছাড়া রিবনের ক্রয় ও বিতরণ বাদ দিয়ে উন্নত পাট পচনের বিষয়ে চাষিদের প্রশিক্ষণ দেয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। কৃষি ভর্তুকির মাধ্যমে পাটের জমিতে অগভীর গর্ত খনন ও পাওয়ার রিবন চাষিদের মধ্যে বিতরণের ব্যবস্থা করা হয়েছে। মোট ১ হাজার ৬০৮টি কৃষি প্রদর্শনী মাঠ দিবস অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এ রকম বিভিন্ন কারণে প্রকল্প সংশোধন প্রস্তাব করা হয়েছে।
প্রকল্পের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যের মধ্যে রয়েছে- ৩১৯০ দশমিক ৭০ মেট্রিক টন উচ্চফলনশীল পাটবীজ উৎপাদন এবং নিম্নমানের পাটবীজের জায়গায় উচ্চফলনশীল পাটবীজের ব্যবহার ও ১১০-১১৫ লাখ বেল উচ্চফলনশীল তোষা পাট উৎপাদন; পাট পচনের ক্ষেত্রে কচুরিপানা, খড়, কংক্রিট স্লাব, বাঁশের খুঁটি ইত্যাদি ব্যবহারে কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করা এবং কলাগাছ ও মাটি ইত্যাদি ব্যবহারে নিরুৎসাহিত করা; কম পানির কারণে পাট পচনের সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যে পাটের জামিতে অগভীর গর্ত খনন এবং পাওয়ার রিবনার চাষিদের মধ্যে বিতরণ করা; মানসম্মত বীজ ও পাটের আঁশ উৎপাদন এবং পচনের জন্য ৩ লাখ ৬১ হাজার ৮৫০ জন কৃষককে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ দেওয়া এবং কৃষকদের কাছ থেকে পর্যায়ক্রমে ৫৫০ মেট্রিক টন প্রত্যয়িত বীজ অথবা টিএলএস বীজ কেনা ও বিতরণ করা।
প্রকল্পটি নেয়ার গুরুত্ব সম্পর্কে প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে, গুণগত মানসম্পন্ন পাটের উৎপাদন এলাকা ধীরে ধীরে কমে ১০-১২ লাখ একরে দাঁড়িয়েছে। ফলে উৎপাদন ৬৮ লাখ বেল থেকে কমে ০-৫০ লাখ বেল হয়েছে। পাট খাত দেশের মোট কর্মসংস্থানের প্রায় ১০ শতাংশ। দেশের জিডিপিতে প্রায় ৪ শতাংশ এবং রফতানি আয়ের ৫ শতাংশ অর্জনে অবদান রাখছে। দেশে পাটবীজের বার্ষিক চাহিদা প্রায় ৫ হাজার ৫০০ থেকে ৬ হাজার মেট্রিক টন। এর মধ্যে প্রায় ৩ হাজার ৮০০ মেট্রিক টনই বেসরকারিভাবে আমদানি করা। তাই দেশে মানসম্মত পাটবীজের ব্যাপক ঘাটতি রয়েছে।
উচ্চ-৬ ফলনশীল পাটবীজের অধিক উৎপাদনের সুফল সারা দেশে সম্প্রসারণের লক্ষ্যে বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয় পাট অধিদফতরের মাধ্যমে ‘উচ্চফলনশীল (উফশী) পাট ও পাটবীজ উৎপাদন এবং উন্নত পাট পচন’ প্রকল্পটি ২০১১ সালের জুলাই থেকে ২০১৭ মেয়াদের জুনে বাস্তবায়িত হয়। এ প্রকল্পের আওতায় দেশের পাট উৎপাদনকারী ৪৪টি জেলার ২০০টি উপজেলায় বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিজেআরআই) উদ্ভাবিত উন্নত তোষা জাতের পাটবীজ বাংলাদেশে কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি) থেকে কিনে নির্বাচিত পাটচাষিদের বিতরণ করা হয়। আগের প্রকল্পের ধারাবাহিকতায় পাট অধিদফতর এই ‘উন্নত প্রযুক্তিনির্ভর পাট ও পাটবীজ উৎপাদন এবং সম্প্রসারণ’ প্রকল্প হাতে নেয়।

