বর্তমান বিশ্ব পেক্ষাপটে অর্থনীতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং স্পর্শকাতর সূচক বিদেশি মুদ্রার সঞ্চয়ন বা রিজার্ভ থেকে ডলার বিক্রিতে নতুন রেকর্ড গড়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। অস্থির ডলারের বাজার সুস্থির করতে চলতি ২০২২-২৩ অর্থবছরের প্রথম সাত মাস নয় দিনে (২০২২ সালের ১ জুলাই থেকে গত বৃহস্পতিবার পর্যন্ত) সাড়ে ৯ বিলিয়ন (৯৫০ কোটি) ডলার বিক্রি করা হয়েছে। এর আগে কোনো অর্থবছরের পুরো সময়েও রিজার্ভ থেকে এত ডলার বিক্রি করা হয়নি।
চলতি মাসের প্রথম সপ্তাহেই বিক্রি করা হয়েছে ৩৩ কোটি ডলার। ফলে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ৪৭০ কোটি ডলার ঋণের প্রথম কিস্তি ৪৭ কোটি ৬০ লাখ ডলার পাওয়ার পর রিজার্ভ বেড়ে স্বস্তির যে আশা জাগিয়েছিল, তা ফিকে হয়ে গেছে। ফের কমতে শুরু করেছে রিজার্ভ।
গত বৃস্পতিবার দিন শেষে রিজার্ভের পরিমাণ ছিল ৩২ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার। গত ১ ফেব্রুয়ারি আইএমএফের ঋণের প্রথম কিস্তি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভে যোগ হওয়ার আগে রিজার্ভ ছিল ৩২ দশমিক ১৯ বিলিয়ন ডলার।
জানুয়ারি মাসের প্রথম সপ্তাহে এশিয়ান ক্লিয়ারিং ইউনিয়নে (আকু) নভেম্বর-ডিসেম্বর মেয়াদের ১১২ কোটি (১.১২ বিলিয়ন) ডলার আমদানি বিল পরিশোধের পর রিজার্ভ কমে ৩২ দশমিক ৫০ বিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছিল। তার আগে ছিল ছিল প্রায় ৩৪ বিলিয়ন ডলার।
আগামী মার্চ মাসের প্রথম সপ্তাহে জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি মাসের আকুর বিল পরিশোধ করতে হবে। এরমধ্যে আইএমএফের ঋণের দ্বিতীয় কিস্তি বা বিশ্বব্যাংক-এডিবির কাছ থেকে যে ঋণের আশা সরকার করছে তা যদি না আসে, আর কেন্দ্রীয় ব্যাংক যদি ডলার বিক্রি অব্যাহত রাখে তাহলে রিজার্ভ কমে ৩০ বিলিয়ন ডলারে নেমে আসবে বলে আশঙ্কার কথা জানিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা।
মার্চ মাসের তৃতীয় সপ্তাহ থেকে রমজান মাস শুরু হবে। রোজার মাসে প্রয়োজনীয় বাড়তি পণ্য আমদানির জন্য এলসি (ঋণপত্র) খুলতে ব্যাংকগুলোর ডলারের চাহিদা বেড়ে গেছে। সেই চাহিদা মেটাতে রিজার্ভ থেকে বেশি ডলার বিক্রি করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
ডিসেম্বর মেয়াদের ১১২ কোটি (১.১২ বিলিয়ন) ডলার আমদানি বিল পরিশোধের পর রিজার্ভ কমে ৩২ দশমিক ৫০ বিলিয়ন ডলারে নেমে আসে। তার আগে ছিল ছিল প্রায় ৩৪ বিলিয়ন ডলার।
অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে ২০২১ সালের আগস্টে রিজার্ভ যে ৪৮ বিলিয়ন ডলারের মাইলফলক অতিক্রম করেছিল, তাতে বাজার থেকে ডলার কেনার অবদান ছিল বলে জানিয়েছেন অর্থনীতিবিদ আহসান এইচ মনসুর। আবার এখন যে রিজার্ভ কমছে, তাতে রিজার্ভ থেকে ডলার বিক্রি একটি বড় কারণ বলে মনে করছেন এই অর্থনীতিবিদ।
করোনা মহামারি পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে শুরু করায় ২০২১ সালের মাঝামাঝি সময় থেকে দেশে আমদানি বাড়তে শুরু করে; লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়তে থাকে অর্থনীতির এই সূচক। তাতে বাজারে ডলারের চাহিদা বেড়ে যায়, বাড়তে থাকে দাম। সেই চাহিদা মেটাতে ডলার বিক্রি শুরু করে বাংলাদেশ ব্যাংক।
গত ২০২১-২২ অর্থবছরের পুরো সময় ধরে চলে এই বিক্রি। রিজার্ভ থেকে ডলার বাজারে না ছাড়লে টাকার বিপরীতে ডলারের দাম আরও বেড়ে যাবে-এ বিবেচনায় ডলার বিক্রি অব্যাহত রাখে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। শেষ পর্যন্ত ৭ দশমিক ৬২ বিলিয়ন ডলার বিক্রির মধ্য দিয়ে অর্থবছর শেষ হয়।
গত অর্থবছরের ধারাবাহিকতায় চলতি ২০২২-২৩ অর্থবছরেও রিজার্ভ থেকে ডলার বিক্রি অব্যাহত রাখে বাংলাদেশ ব্যাংক। আগে সব ব্যাংকের কাছে প্রয়োজনীয় ডলার বিক্রি করলেও গত চার মাস ধরে শুধু সরকারি কেনাকাটা ও জ্বালানি তেল, স্যারসহ অন্যান্য অতিপ্রয়োজনীয় পণ্য আমদানির জন্য এলসি বা ঋণপত্র খুলতে রাষ্ট্রায়ত্ত কয়েকটি ব্যাংকের কাছে রিজার্ভ থেকে ডলার বিক্রি করা হচ্ছে। বেসরকারি ব্যাংকগুলো আন্তব্যাংক মুদ্রাবাজার থেকে ডলার কিনে আমদানি খরচ মেটাচ্ছে।
কিন্তু এরইমধ্যে ডলারের দাম ৮৫ টাকা থেকে বাড়তে বাড়তে ১০৫/১০৭ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। শতকরা হিসাবে এক বছরে টাকার বিপরীতে ডলারের দর বেড়েছে ২৫ শতাংশ। খোলাবাজার বা কার্ব মার্কেটে ডলারের দর ১২০ টাকা ছাড়িয়ে গিয়েছিল। এখনো ১১২-১১৩ টাকা বিক্রি হচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা যায়, ক্যালেন্ডার বছরের হিসাবে বিদায়ী ২০২২ সালে রিাজার্ভ থেকে মোট ১২ দশমিক ৬১ বিলিয়ন ডলার বিক্রি করা হয়েছে। এর বিপরীতে বাজার থেকে ১ লাখ ২২ হাজার কোটি টাকার বেশি তুলে নিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকে। এতে অভ্যন্তরীণ তারল্যের ওপর চাপ বেড়েছে।
অবশ্য আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) পরামর্শ মেনে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণভাবে রিজার্ভের হিসাব করতে সম্মত হয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এতে ব্যবহারযোগ্য রিজার্ভ দাঁড়াবে ২৪ বিলিয়ন ডলারের ঘরে।
বাংলাদেশ, ভুটান, ভারত, ইরান, মিয়ানমার, নেপাল, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা ও মালদ্বীপ বর্তমানে আকুর সদস্য। এই দেশগুলো থেকে বাংলাদেশ যেসব পণ্য আমদানি করে তার বিল দুই মাস পরপর আকুর মাধ্যমে পরিশোধ করতে হয়। মহাসংকটে পড়ায় শ্রীলঙ্কা অবশ্য মাস দেড়েক আগে আকু থেকে বেরিয়ে এসেছে।
আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী, একটি দেশের কাছে অন্তত তিন মাসের আমদানি ব্যয় মেটানোর সমপরিমাণ বিদেশি মুদ্রা মজুত থাকতে হয়।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সবশেষ হিসাবে, গত ডিসেম্বর মাসে মোট ৬ দশমিক শূন্য চার বিলিয়ন ডলারের আমদানি বিল পরিশোধ করেছে বাংলাদেশ। এ হিসাবে বর্তমানের রিজার্ভ দিয়ে পাঁচ মাসের কিছু বেশি সময়ের আমদানি বিল মেটানো সম্ভব।

