দায়িত্ব পালনকালে মৌলিক অধিকার, মানবাধিকার ও আইনের শাসনকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিতে বাংলাদেশে পুলিশের নবীন কর্মকর্তাদের নির্দেশনা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
তিনি বিশেষত নারী, শিশু ও প্রবীণদের প্রতি সংবেদনশীল আচরণ করার কথা বলেছেন।
রবিবার রাজশাহীর সারদায় বাংলা পুলিশ একাডেমির প্যারেড গ্রাউন্ডে ৩৮তম বিসিএস পুলিশ ক্যাডারের শিক্ষানবিশ সহকারী পুলিশ সুপারদের (এএসপি) প্রশিক্ষণ সমাপনী কুচকাওয়াজ পরিদর্শন ও অভিবাদন গ্রহণ শেষে প্রধান অতিথির বক্তব্যে শেখ হাসিনা এসব কথা বলেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, উন্নয়ন অগ্রযাত্রায় আপনারাও আমাদের সাথী। এজন্য আপনাদের যুগোপযোগী কর্মকৌশল গ্রহণ এবং দক্ষতার সঙ্গে কাজ করতে হবে। বাংলাদেশকে উন্নত-সমৃদ্ধ দেশে রূপান্তরে তরুণ প্রজন্মকে নেতৃত্ব দিতে আপনাদের প্রস্তুত হতে হবে ‘স্মার্ট পুলিশ’ হিসেবে। দায়িত্ব পালনকালে আপনাদের মৌলিক অধিকার, মানবাধিকার ও আইনের শাসনকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিতে হবে। নারী, শিশু ও প্রবীণদের প্রতি সংবেদনশীল আচরণ করতে হবে। সর্বোপরি, আপনাদের প্রতিটি কাজে জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষার সর্বোচ্চ প্রতিফলন ঘটাতে হবে।
শেখ হাসিনা বলেন, গণতন্ত্রকামী জনগণকে সঙ্গে নিয়ে এ দেশকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় ও গণতান্ত্রিক ধারায় ফিরিয়ে এনেছে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ। এদেশে সংবিধানকে সমুন্নত করার পাশাপাশি গণতন্ত্রকে সুপ্রতিষ্ঠিত করেছি। দেশবিরোধী অপশক্তি বিভিন্ন সময়ে হত্যা, লুটপাট, বোমা হামলা এবং আগুন সন্ত্রাসের মাধ্যমে বাংলাদেশকে অকার্যকর রাষ্ট্রে পরিণত করতে চেয়েছিল। এরূপ প্রতিটি ক্রান্তিলগ্নে বাংলাদেশ পুলিশ অত্যন্ত দক্ষতা ও পেশাদারিত্বের সঙ্গে তাদের প্রতিহত করে দেশে আইনের শাসন ফিরিয়ে এনেছে। আমি এজন্য বাংলাদেশ পুলিশের সব সদস্যকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই।
বিশ্বায়ন ও প্রযুক্তির উৎকর্ষের পরিপ্রেক্ষিতে অপরাধ এবং অপরাধীর ধরন পরিবর্তিত হয়েছে উল্লেখ করে সরকারপ্রধান বলেন, সময়ের সঙ্গে খাপ খাইয়ে সাইবার ক্রাইম, মানি লন্ডারিং, মানব পাচার, জঙ্গিবাদ এবং সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড প্রতিরোধে আমরা বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছি। বাংলার মাটি থেকে জঙ্গি ও সন্ত্রাসবাদ নির্মূলের প্রত্যয় নিয়ে গঠিত পুলিশের বিশেষ ইউনিট আইটিইউ এবং সিটিটিসিসহ অন্যান্য সব ইউনিট সাফল্যের সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছে। জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাসবাদ নির্মূলের কার্যক্রম দেশ ও বিদেশে সমাদৃত হয়েছে। ফলে জঙ্গিবাদ দমনে বাংলাদেশ বিশ্বে রোল মডেলে পরিণত হয়েছে। মাদক, দুর্নীতি, সাইবার ক্রাইম ও অন্যান্য সংঘবদ্ধ অপরাধ দমনে বাংলাদেশ পুলিশের দক্ষতা সব মহলে প্রশংসিত হয়েছে।
বাংলাদেশ পুলিশের সার্বিক ব্যবস্থাপনায় জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯ ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করেছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এই সার্ভিস ব্যবহার করে প্রত্যন্ত এলাকার মানুষও সহজে ই-ফায়ার সার্ভিস, অ্যাম্বুলেন্স ও পুলিশের জরুরি সেবা গ্রহণ করতে পারছে। এছাড়া নারী নির্যাতনের মত ঘৃণ্য অপরাধের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ পুলিশের দৃঢ় অবস্থান, সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি ও নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলার জন্য পুলিশের সৃজনশীল উদ্যোগও ব্যাপক প্রশংসিত হচ্ছে। জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশ পুলিশের পেশাদারিত্ব, দক্ষতা ও গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে আমাদের দেশের সম্মানকে উজ্জ্বল করেছে।
সরকারপ্রধান বলেন, পেশাদারিত্ব, দক্ষতা এবং বিজ্ঞানভিত্তিক তদন্তের মাধ্যমে অপরাধী শনাক্তকরণে পুলিশে আধুনিক ডিএনএ ল্যাব, ফরেনসিক ল্যাব, অটোমেটেড ফিঙ্গারপ্রিন্ট আইডেন্টিফিকেশন সিস্টেম, রাসায়নিক পরীক্ষাগার স্থাপন করা হয়েছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো একবিংশ শতকের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার জন্য পুলিশ বাহিনীকে উন্নত প্রশিক্ষণ প্রদান ও তথ্যপ্রযুক্তির প্রয়োগে দক্ষ করে গড়ে তোলা। বাংলাদেশ পুলিশকে এই সময়ের যে কোনো সমস্যা সমাধানে সক্ষম করতে বাহিনীর বিভিন্ন প্রশিক্ষণ কেন্দ্রকে আধুনিক ও যথাযথ মানসম্পন্ন করার জন্য আমাদের সরকার সব সময় আন্তরিক ও সচেষ্ট।
আধুনিক সময়ে নাগরিক সেবার ধারণাকে প্রাধান্য দিয়ে পুলিশি সেবাকে গণমানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেয়ার তাগিদ দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, মানুষ তার চরমতম বিপদের সময় পুলিশের কাছে সাহায্যের জন্য আসে, তাই পেশাদারিত্ব ও সহমর্মিতার সঙ্গে আইনি সেবা দিয়ে গণমানুষের আস্থা অর্জন করতে হবে। প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী হিসেবে জনগণের সেবা করা পুলিশ বাহিনীর প্রতিটি সদস্যের পবিত্র দায়িত্ব।
আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা আরো বলেন, সরকার ২০৪১ সালে স্মার্ট বাংলাদেশ গড়ার চারটি ভিত্তি সফলভাবে বাস্তবায়নে কাজ করছে। এগুলো হচ্ছে- স্মার্ট সিটিজেন, স্মার্ট ইকোনমি, স্মার্ট গভর্নমেন্ট ও স্মার্ট সোসাইটি। এসবের জন্য প্রয়োজন স্মার্ট পুলিশ। এজন্য পুলিশকে আধুনিক প্রযুক্তিজ্ঞানে সমৃদ্ধ করে গড়ে তোলার বিকল্প নেই। পুলিশের দক্ষতা ও সক্ষমতা বৃদ্ধিকল্পে এ বাহিনীর জনবল, ভৌত অবকাঠামো, লজিস্টিকস্ ও যানবাহন, আধুনিক প্রশিক্ষণ সুবিধা বৃদ্ধিসহ পুলিশ সদস্যদের কল্যাণে যথোপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণে আমাদের সরকার সব সময়ই আন্তরিক থাকবে।
বঙ্গবন্ধুকন্যা আরো বলেন, আওয়ামী লীগ সরকারের গত ১৪ বছরের আন্তরিক প্রচেষ্টায় বাংলাদেশ আজ উন্নয়নের মহাসড়কে উঠে এসেছে। অর্থনীতি, কৃষি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি, ব্যবসা-বাণিজ্য, সামাজিক নিরাপত্তাসহ প্রতিটি সেক্টরে আজ উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জিত হয়েছে। তথ্যপ্রযুক্তির যথাযথ বিস্তৃতি ও ব্যবহারের সুফল প্রত্যন্ত অঞ্চলের জনগণও আজ ভোগ করছেন। বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ উৎক্ষেপণের মাধ্যমে মহাকাশেও আমাদের অগ্রযাত্রা শুরু হয়েছে। যোগাযোগ খাতে আমাদের যুগান্তকারী উন্নয়ন ঘটেছে। পদ্মা সেতু চালু হওয়ার ফলে আমাদের অর্থনীতিতে নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়েছে। ইতোমধ্যে মেট্রোরেল চলতে শুরু করেছে। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র ও বঙ্গবন্ধু টানেলের মতো মেগা প্রজেক্টের কাজ দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলেছে। অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ও বিদেশি বিনিয়োগ বাড়াতে ১০০টি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল গঠন করা হচ্ছে।
সরকারপ্রধান আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, দেশ যেভাবে দ্রুতগতিতে এগিয়ে যাচ্ছে, তাতে আমি বিশ্বাস করি, বাংলাদেশ ২০৪১ সালের আগেই উন্নত দেশের সারিতে নাম লেখাতে সক্ষম হবে।
এর আগে প্রধানমন্ত্রী বিমান বাহিনীর একটি বিশেষ হেলিকপ্টারযোগে ঢাকা থেকে রওনা হয়ে রবিবার বেলা পৌনে ১১টায় সারদায় বাংলাদেশ পুলিশ একাডেমির হেলিপ্যাডে নামেন। সেখানে পৌঁছে ৩৮তম বিসিএস পুলিশ ক্যাডারের শিক্ষানবিশ সহকারী পুলিশ সুপারদের প্রশিক্ষণ সমাপনী কুচকাওয়াজ পরিদর্শন ও অভিবাদন গ্রহণ করেন প্রধানমন্ত্রী। এই কুচকাওয়াজে ১২ জন নারীসহ ৯৭ জন শিক্ষানবিশ সহকারী পুলিশ সুপার অংশ নিয়েছেন।
অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী প্রশিক্ষণে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনকারী কর্মকর্তাদের মাঝে ট্রফি বিতরণ করেন।
অনুষ্ঠানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, মহাপুলিশ পরিদর্শক (আইজিপি) চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুনসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

