বড় সুযোগ হয়ে আসছে দুই মেট্রোরেল

আরো পড়ুন

পদ্মা সেতুর কাজ শেষ। ঢাকার প্রথম মেট্রোরেল (এমআরটি লাইন-৬), কর্ণফুলী নদীতে বহু লেনবিশিষ্ট টানেল, ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের মতো দেশের বড় অবকাঠামো প্রকল্পগুলোও শেষের পথে। এসব অবকাঠামো তৈরিতে ব্যবহূত ইস্পাত, সিমেন্ট, কেবল, সিরামিক টাইলস, রঙসহ বিভিন্ন ধরনের নির্মাণ উপকরণের সিংহভাগই সরবরাহ করেছে স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলো। বিপুল চাহিদা থাকায় উপকরণ সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের উৎপাদনের সঙ্গে সঙ্গে বাড়িয়েছে সক্ষমতাও।

বেশির ভাগ প্রকল্প শেষ বা শেষদিকে চলে আসায় ব্যবসা নিয়ে কিছুটা দুশ্চিন্তায় পড়েছে সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলো। যদিও আগামী অন্তত পাঁচ বছরে তাদের জন্য বড় সুযোগ হয়ে দাঁড়াবে ঢাকার দুই মেট্রোরেল প্রকল্প। এর মধ্যে প্রথমটির (এমআরটি লাইন-১) কাজ ২৬ জানুয়ারি উদ্বোধন করতে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। একইভাবে বছরের মাঝামাঝিতে ঢাকার তৃতীয় মেট্রোরেলের (এমআরটি লাইন-৫, নর্দার্ন রুট) কাজ শুরুর লক্ষ্যের কথা জানিয়েছেন ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেডের (ডিএমটিসিএল) কর্মকর্তারা। মেট্রো দুটির নির্মাণ ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৯৪ হাজার কোটি টাকা, যার সিংহভাগই ঋণ হিসেবে দিচ্ছে জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা (জাইকা)।

ডিএমটিসিএলের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ঢাকায় নির্মিতব্য এ দুই মেট্রোরেলের সিংহভাগ নির্মাণ উপকরণ স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে সংগ্রহ করা হবে। ইস্পাত ও সিমেন্ট খাতের স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলোও এখন এ দুই মেট্রো প্রকল্প ঘিরে তাদের ভবিষ্যৎ উৎপাদন ও বিপণন পরিকল্পনা সাজাচ্ছে।

বাংলাদেশের স্টিল ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিএসএমএ) ও উদ্যোক্তাদের তথ্য অনুযায়ী, গত ১০ বছরে দেশে ইস্পাত খাতে বড় ধরনের প্রবৃদ্ধি হয়েছে। ২০১১ সালে দেশে সম্মিলিতভাবে এমএস রড উৎপাদন হতো ২৫ লাখ টন। ২০১৬ সালে তা ৫৫ লাখ টনে দাঁড়ায়। বর্তমানে চাহিদা অনুযায়ী বছরে গড়ে উৎপাদন হচ্ছে ৬৫ লাখ টন। উৎপাদিত রডের তুলনায় বাজারে সরবরাহ করা রডের পরিমাণ কিছুটা কম। ২০১৬ সালে বাজারে গড়ে ৫০ লাখ টন রড বিক্রি হয়েছে। বর্তমানে এর পরিমাণ ৬০ লাখ টনের বেশি। যদিও ইস্পাত উৎপাদকদের রড উৎপাদন সক্ষমতা আরো বেশি। ২০১৬ সালে ইস্পাত খাতের মোট উৎপাদন সক্ষমতা ছিল ৭০ লাখ টন, যা বর্তমানে ৮০ লাখ টন ছাড়িয়েছে। এখনো বেশকিছু প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা বাড়ানোর কার্যক্রম চলছে। এতে আগামী দুই বছরে দেশে রড উৎপাদন সক্ষমতা এক কোটি টন ছাড়িয়ে যাবে।

বৈশ্বিক ইস্পাত খাতের তথ্যসেবা প্রতিষ্ঠান স্টিলমিন্টের প্রক্ষেপণ অনুসারে, ২০২৫ সালে দেশের ইস্পাত উৎপাদন সক্ষমতা ১ কোটি ৩০ লাখ টনে দাঁড়াবে। বতর্মানে বসুন্ধরা গ্রুপ, মেঘনা গ্রুপ, আবুল খায়ের স্টিল, ইউনিটেক্স স্টিল মিলস, বাংলাদেশ স্টিল রি-রোলিং মিলস (বিএসআরএম) ও আকিজ স্টিল মিলসের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের ইস্পাত উৎপাদন সক্ষমতা বাড়াচ্ছে।

রাজধানীকে ঘিরে ছয়টি মেট্রো লাইনের নেটওয়ার্ক তৈরির পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে সরকার। উত্তরা-মতিঝিল মেট্রোর কাজ শেষের পথে। এর দৈর্ঘ্য প্রায় ২১ কিলোমিটার। খরচ হচ্ছে প্রায় সাড়ে ৩৩ হাজার কোটি টাকা। গত ২৮ ডিসেম্বর লাইনটির উত্তরা-আগারগাঁও অংশে বাণিজ্যিক চলাচল কার্যক্রম উদ্বোধন করেছেন প্রধানমন্ত্রী। ডিএমটিসিএলের তথ্য বলছে, মেট্রোটির অবকাঠামো গড়ে তুলতে প্রয়োজন হয়েছে প্রায় সাড়ে তিন লাখ টন সিমেন্ট। ব্যবহূত রডের পরিমাণ সোয়া দুই লাখ টনের বেশি। অবকাঠামো নির্মাণের প্রধান এ দুই উপকরণের পুরোটাই সরবরাহ করেছে স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলো।

ডিপোর ভূমি উন্নয়নের মধ্য দিয়ে চলতি মাসেই শুরু হতে যাচ্ছে ঢাকার দ্বিতীয় মেট্রোর নির্মাণকাজ। লাইনটি আবার ঢাকার প্রথম পাতাল মেট্রো হতে যাচ্ছে। নির্মাণ ব্যয় প্রাক্কলন করা হয়েছে ৫২ হাজার ৫৬১ কোটি টাকা। এর মধ্যে জাইকার ঋণ ৩৯ হাজার ৪৫০ কোটি টাকা।

মেট্রোরেল লাইন-১-এর দুটি অংশ। প্রথম অংশটি পুরোপুরি পাতালপথে। ঢাকার বিমানবন্দর রেলওয়ে স্টেশন থেকে কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশন পর্যন্ত পাতাল অংশের দৈর্ঘ্য ১৯ দশমিক ৮৭ কিলোমিটার। পাতালপথেই নির্মাণ করা হবে ১২টি স্টেশন। স্টেশনগুলো হবে বিমানবন্দর, বিমানবন্দর টার্মিনাল-৩, খিলক্ষেত, যমুনা ফিউচার পার্ক, নতুন বাজার, উত্তর বাড্ডা, বাড্ডা, হাতিরঝিল পূর্ব, রামপুরা, মালিবাগ, রাজারবাগ ও কমলাপুর। অন্যদিকে কমলাপুর থেকে পূর্বাচল পর্যন্ত নির্মাণ করা হবে উড়ালপথ, যার দৈর্ঘ্য ১১ দশমিক ৩৬ কিলোমিটার। এখানে স্টেশন হবে নয়টি। মেট্রোর এ প্রকল্প ২০২৬ সালের মধ্যে সম্পন্ন করার লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছে সরকার।

ডিএমটিসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এমএএন ছিদ্দিক জানিয়েছেন, চলতি বছরের জুনের মধ্যেই ঢাকার তৃতীয় মেট্রোর নির্মাণকাজ শুরুর লক্ষ্য নিয়ে তারা কাজ করছেন। হেমায়েতপুর-ভাটারার মধ্যে নির্মিতব্য এ মেট্রোর নির্মাণ ব্যয় ৪১ হাজার ২৩৮ কোটি টাকা। উড়াল ও পাতালপথের সমন্বয়ে গঠিত মেট্রোর দৈর্ঘ্য ২০ কিলোমিটার। লাইনটি গড়ে তোলা হবে হেমায়েতপুর, গাবতলী, মিরপুর ১০, বনানী, নতুন বাজার, ভাটারার মধ্যে। ২০২৮ সালের মধ্যে মেট্রোর এ লাইনের কাজ শেষ করার লক্ষ্য রয়েছে।

এইচএম স্টিল ও গোল্ডেন ইস্পাতের পরিচালক মোহাম্মদ সরওয়ার আলম বলেন, মেট্রোরেল যেহেতু একটি বড় অবকাঠামো প্রকল্প, সেহেতু এ প্রকল্পে আগামী কয়েক বছর নির্মাণ উপকরণের ভালো চাহিদা থাকবে। এখানে ইস্পাতের যে চাহিদা, তা পার্শ্ববর্তী দেশের তুলনায় অনেক কম। এ চাহিদা ধীরে ধীরে বাড়বে। তবে সেক্ষেত্রে এ মেগা প্রকল্পগুলো ভালো ভূমিকা রেখে যাচ্ছে। মেট্রোরেলও এক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখবে। আমরা সরকারের বিভিন্ন প্রকল্প সামনে রেখে ইস্পাত কারখানা বড় পরিসরে সম্প্রসারণ করে নিয়েছি। মেট্রোরেলের কারণে ইস্পাতের যে একটি বড় চাহিদা তৈরি হবে, তা আমাদের নির্মাণ উপকরণ শিল্পের জন্য ভালো একটি অবস্থা তৈরি করবে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মেট্রোর মতো মেগা প্রকল্পগুলো গত এক দশকে দেশের নির্মাণ উপকরণ উৎপাদনকারীদের ব্যবসা সম্প্রসারণে বড় ভূমিকা রাখছে। প্রকল্পগুলোর কারণে ইস্পাত ও সিমেন্টের চাহিদা বেড়েছে। বাড়তি এ চাহিদা পূরণের জন্য সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলো বিনিয়োগ ও সক্ষমতা দুটোই বাড়িয়েছে। এমন মুহূর্তেই গত বছর ব্যয় সংকোচনের নীতি থেকে নিতান্ত জরুরি ছাড়া নতুন করে অন্য কোনো প্রকল্প হাতে না নেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। বিষয়টি দেশের নির্মাণ উপকরণ উৎপাদন খাতে উদ্বেগের সঞ্চার করেছে। চাহিদা হ্রাসে বাড়তি উৎপাদন সক্ষমতা প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য বড় বোঝা হয়ে ওঠার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। তবে এক্ষেত্রে মেট্রোরেলের মতো অগ্রাধিকারমূলক প্রকল্পগুলো এ দুশ্চিন্তা অনেকটাই দূর করবে বলে প্রত্যাশা করছেন খাতসংশ্লিষ্টরা।

দেশের সিমেন্ট খাতের ব্যবসায়ীরাও ঢাকার দুই মেট্রোরেলকে ঘিরে তাদের উৎপাদন ও বিপণনে জোর দিচ্ছেন। এ সম্পর্কে জানতে চাইলে কনফিডেন্স সিমেন্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জহির উদ্দীন আহমেদ বলেন, দেশের উদীয়মান অর্থনীতিতে এ ধরনের বড় বড় প্রকল্পের প্রয়োজন আছে। এসব প্রকল্পের সুবিধাও দীর্ঘমেয়াদি। অবকাঠামো নির্মাণে প্রধান দুই উপকরণ ইস্পাত ও সিমেন্ট খাতকে মেট্রোরেলের মতো বড় প্রকল্পগুলো চাঙ্গা করে তুলবে। বর্তমানে যেসব প্রতিষ্ঠান খাতটিতে রয়েছে, তারা এরই মধ্যে মেট্রোরেলের মতো বড় প্রকল্পগুলোকে লক্ষ্য করে তাদের কারখানা সম্প্রসারণে জোর দিয়েছে। যোগাযোগ অবকাঠামোর ধারাবাহিক উন্নয়নের প্রভাবে ব্যক্তি খাতেও বিভিন্ন ধরনের অবকাঠামো গড়ে ওঠার একটি সম্ভাবনা আমাদের সামনে তৈরি হচ্ছে। এসব অবকাঠামোও সিমেন্ট, রডের মতো নির্মাণ উপকরণগুলোর চাহিদায় গতি আনবে।

তিন দশক আগেও দেশের সিমেন্ট খাত ছিল আমদানিনির্ভর। তবে বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তারা সিমেন্ট ব্যবসায় প্রবেশের পর পরিস্থিতি পুরোপুরি বদলে যায়। আমদানিনির্ভরতা কাটিয়ে বর্তমানে সিমেন্ট রফতানিকারক হিসেবে নাম লিখিয়েছে বাংলাদেশ। অবশ্য বর্তমানে দেশে সিমেন্টের চাহিদার তুলনায় কোম্পানিগুলোর উৎপাদন সক্ষমতা অনেক বেশি। এতে অর্ধেকের বেশি সক্ষমতাই অব্যবহূত থাকছে। এ অবস্থায়ও সিমেন্ট উৎপাদকদের কেউ কেউ বড় আকারে ব্যবসা সম্প্রসারণের দিকে যাচ্ছেন। মূলত বিদ্যমান চাহিদার পাশাপাশি ভবিষ্যতের কথা মাথায় রেখে বাজার অংশগ্রহণ বাড়াতে এ কৌশল নিয়েছেন তারা।

বাংলাদেশ সিমেন্ট ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিসিএমএ) তথ্য বলছে, বর্তমানে দেশে ৩৪টি সিমেন্ট কোম্পানির কার্যক্রম চলমান রয়েছে। সব মিলিয়ে এসব কোম্পানির বার্ষিক উৎপাদন সক্ষমতা ৮ কোটি ৫০ লাখ টন। এর মধ্যে ব্যবহূত হচ্ছে চার কোটি টন। অর্থাৎ অর্ধেকের বেশি সক্ষমতাই অব্যবহূত থাকছে। অবশ্য এর মধ্যে ক্রাউন সিমেন্ট তাদের সক্ষমতা বাড়াতে ষষ্ঠ ইউনিট নির্মাণের কাজ শুরু করেছে। এতে কোম্পানিটির উৎপাদন সক্ষমতা বার্ষিক ৪০ লাখ ১৫ হাজার থেকে বেড়ে বার্ষিক ৬৫ লাখ ৭০ হাজার টনে দাঁড়াবে। এ খাতের আরো বেশ কিছু কোম্পানিও তাদের সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি বাজারে নতুন ব্র্যান্ডের সিমেন্ট নিয়ে আসছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিসিএমএর প্রথম ভাইস প্রেসিডেন্ট ও বিএসএমএর সেক্রেটারি জেনারেল এবং মেট্রোসেম গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ বলেন, বর্তমানে দেশে মাথাপিছু সিমেন্টের ব্যবহার ২১০ কেজি। ভবিষ্যতে এটি ৫০০ কেজিতে উন্নীত হবে। একইভাবে ইস্পাত খাতেও পার্শ্ববর্তী দেশের তুলনায় আমাদের ভোগের পরিমাণ বেশ কম। সামনের দিনগুলোয় এর ব্যবহার আরো বাড়বে। পদ্মা সেতুর মতো মেগা প্রকল্পগুলোয় সিমেন্ট ও ইস্পাতের ব্যবহার যতটা হয় সেটি কিন্তু এ খাতের কোম্পানিগুলোর উৎপাদন সক্ষমতার তুলনায় খুব বেশি নয়। কিন্তু এ ধরনের মেগা প্রকল্প সম্পন্ন হওয়ার পর এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এলাকাগুলোয় ব্যাপক আকারে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বেড়ে যায়, যা প্রকারান্তরে সিমেন্ট ও ইস্পাতের ভোগ বাড়িয়ে দেয়। একইভাবে মেট্রোরেল প্রকল্পে যতটা সিমেন্ট ও ইস্পাত ব্যবহার হবে তার চেয়ে বেশি হবে কিন্তু এর পার্শ্ববর্তী এলাকাগুলোর অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে। ফলে এসব মেগা প্রকল্পে প্রত্যক্ষভাবে যতটা ইস্পাত ও সিমেন্টের ব্যবহার হয় তার চেয়ে বেশি হয় এগুলোর পরোক্ষ প্রভাবের কারণে। তবে বর্তমানে গ্যাসের দাম বাড়ানোর কারণে বৃহৎ শিল্পগুলো সামনের দিনগুলোয় ব্যয় বৃদ্ধির চ্যালেঞ্জের মধ্যে পড়বে।

আরো পড়ুন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

সর্বশেষ