গোয়েন্দা পুলিশের অবৈধ লেনদেন, বিভাগীয় তদন্ত

আরো পড়ুন

গোপন সংবাদের ভিত্তিতে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) একটি দল রাজধানীর মগবাজারের বিশাল সেন্টারের সামনে অবস্থান নেয়। সেখানে সন্দেহজনক এক ব্যক্তিকে তল্লাশি করে। তখন শার্ট দিয়ে মোড়ানো একটি মোবাইল ফোনের বক্স উদ্ধার করে তারা। ওই বক্সের ভেতর থেকে ৪ রাউন্ড গুলি ভর্তি একটি ৭.৬৫ অটোমেটিক পিস্তল পায়। পরে বাচ্চু শেখ নামে ওই ব্যক্তিকে গ্রেফতার করা হয়। বাচ্চু গাজীপুর জেলার জয়দেবপুরের গাছা ইউনিয়ন পরিষদের তৎকালীন চেয়ারম্যান সিরাজুল ইসলামের গাড়িচালক। তার সঙ্গে থাকা জিপ গাড়িটিও জব্দ করে ডিবির ওই দলটি।

ঘটনা ২০১১ সালের ১৪ জানুয়াারির। ওই অভিযানের পর রমনা থানায় দায়ের করা মামলার তদন্ত করে গোয়েন্দা পুলিশ। তদন্ত শেষে আদালতে প্রতিবেদন দেয় তারা। এতে বলা হয়, অস্ত্রসহ গ্রেফতার বাচ্চু শেখের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের মতো কোনো সাক্ষ্যপ্রমাণ পাওয়া যায়নি। আদালত এই প্রতিবেদন গ্রহণ করেনি। পরে ঘটনাটি অধিক তদন্তের জন্য দায়িত্ব দেয় পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগকে (সিআইডি)।

সিআইডি অস্ত্র মামলাটির তদন্ত শেষে চারজনকে অভিযুক্ত করে আদালতে অভিযোগপত্র দেয় ২০১৩ সালের জুলাই মাসে। অভিযুক্তরা হলেন সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান সিরাজুল ইসলাম, তার গাড়িচালক বাচ্চু শেখ, সিএম গালিব চৌধুরী ওরফে সোর্স খোকন ও বকুল মোল্লা।

সিআইডির তদন্ত সূত্রে জানা যায়, সাবেক চেয়ারম্যান সিরাজুল ইসলাম লাভলী নামে এক নারীকে পছন্দ করতেন। তাকে পাওয়ার জন্য নানাভাবে চেষ্টা করেছেন। একবার গাজীপুরে এক বিচিত্রা অনুষ্ঠানে লাভলীকে চা খাইয়ে অচেতন করেন। এই পরিকল্পনায় ব্যর্থ হয়ে তিনি লাভলীকে অপহরণ করার জন্য তার গ্রামের বাড়িতে হামলা করেও ব্যর্থ হন। অপরদিকে চেয়ারম্যান সিরাজের হাত থেকে বাঁচতে লাভলী তার এলাকার সাংবাদিক কলিমুল্লাহ নয়নের দারস্থ হন। তাদের মধ্যে যোগাযোগের একপর্যায়ে কলিমুল্লাহ নয়নকে বিয়ে করেন লাভলী। এদিকে সিরাজুল ইসলাম লাভলীকে পাওয়ার জন্য মরিয়া হয়ে ওঠেন। এ জন্য কলিমুল্লাহর কাছ থেকে লাভলীকে সরাতে নান পরিকল্পনা করতে থাকেন। একপর্যায়ে মিথ্যা মামলায় ফাঁসানোর পরিকল্পনা করেন সিরাজ। মিথ্যা মামলা দেয়ার জন্য বিভিন্ন জনকে টাকা দেন তিনি। পরিকল্পিতভাবে অস্ত্র মামলায় নয়নকে ফাঁসিয়ে লাভলীকে বিয়ে করার পরিকল্পনা চূড়ান্ত করেন।

পরিকল্পনা অনুযায়ী সিএম গালিব চৌধুরীর মাধ্যমে একটি গুলিসহ অটোমেটিক পিস্তল সংগ্রহ করেন। সিরাজুল ইসলামের এ পরিকল্পনায় যুক্ত হয় বকুল মোল্লা। তারা কলিমুল্লাহ নয়নকে মগবাজারে এনে ডিবি পুলিশের মাধ্যমে অস্ত্রসহ ফাঁসিয়ে দেয়ার ছক আঁকেন। এ জন্য ডিবি পুলিশের কয়েকজনকে টাকার বিনিময়ে তাদের পরিকল্পনায় যুক্ত করেন।

পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী সেদিন সিরাজুলের সহযোগীদের সঙ্গে মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের একটি দল ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন। তাদের পরিকল্পনা অনুযায়ী কলিমুল্লাহ নয়নকে বিভিন্ন কৌশলে ঘটনাস্থলে উপস্থিত করতে ব্যর্থ হন। ফলে পরিকল্পনায় যুক্ত থাকা গোয়েন্দা পুলিশের সদস্যরা ওই পিস্তলসহ সিরাজুলকে তার সহযোগীসহ গ্রেফতার করার সিদ্ধান্ত নেন। পরে তারা গ্রেফতার এড়াতে নানাভাবে চেষ্টা করতে থাকেন। একপর্যায়ে মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে গ্রেফতার এড়িয়ে যান তারা। পরে সিরাজের গাড়িচালক বাচ্চু শেখকে প্রলোভন দেখিয়ে তার কাছ থেকে অস্ত্র উদ্ধারের নাটক সাজান। পুলিশ বাচ্চু শেখকে অস্ত্রসহ গ্রেফতার দেখিয়ে মামলা করে।

মামলাটির তদন্তকারী কর্মকর্তা সিআইডির সাবেক পরিদর্শক লুৎফর রহমান। তার কাছে এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমি মামলাটির তদন্ত শেষ করে আদালতে অভিযোগপত্র দিয়েছি। এখন এটি আদালতে বিচারাধীন রয়েছে। আমি ঘটনার বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে চাই না।

জানা গেছে, পরিকল্পনার মূলহোতা সিরাজুল ইসলামের বিরুদ্ধে দেশের বিভিন্ন থানায় ১৮টি মামলা রয়েছে। এছাড়া তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন থানায় ১১টি জিডি রয়েছে। তার ছেলে তৌহিদুল ইসলাম দীপ বলেন, তিনি বেশ কয়েক বছর ধরে অসুস্থ, চোখেও দেখতে পান না। এ জন্য বাড়িতেই থাকেন।

আদালত সূত্রে জানা যায়, ২০১৩ সালে সিআইডি অভিযোগপত্র দেয়ার পর অভিযোগ গঠন করা হয়। তবে এখনো এই মামলার সাক্ষ্যগ্রহণ চলছে। আসামিপক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট আশরাফ বলেন, বাচ্চু শেখ এবং বকুল মোল্লা জামিনে রয়েছেন। বকুলকে এই ঘটনার দশ বছর পর গ্রেফতার করা হয়েছিল। পরে উচ্চ আদালত তাকে জামিন দেয়।

সাজানো এই মামলায় গ্রেফতার হয়ে কারাভোগ করা বাচ্চু শেখ বলেন, সিরাজ চেয়ারম্যান পরিকল্পনা করে আমাকে ফাঁসিয়েছিলেন। আমার কোনো দোষ ছিল না। সেটা আমি ডিবি অফিসারদেরও তখন জানিয়েছিলাম। এরপরও আমাকে এক বছর কারাগারে থাকতে হয়েছে। এখন নিয়মিত আদালতে হাজিরা দিতে হচ্ছে।

সিরাজুল ইসলামের এসব কর্মকাণ্ড নিয়ে জানতে চাইলে কলিমুল্লাহ নয়ন বলেন, সিআইডির একজন অফিসার জানিয়েছিলেন এই অস্ত্র মামলায় আমাকে ফাঁসিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছিল। আমি তাদের পরিকল্পনার বিষয়ে কিছু জানতাম না। তবে তারা ওই দিন আমাকে ঘটনাস্থলে নেওয়ার জন্য নানাভাবে চেষ্টা করেছিল।

গোয়েন্দা পুলিশের সঙ্গে যোগসাজশে এ ঘটনাটির পর পুলিশের পক্ষ থেকে একটি বিভাগীয় তদন্ত করা হয়েছে। ওই তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মগবাজারে ঘটনার দিন কলিমুল্লাহ নয়নকে না পেয়ে গোয়েন্দা পুলিশের কয়েকজন সদস্য সিরাজুল ও গালিবকে ফকিরাপুলের একটি আবাসিক হোটেলে নিয়ে যায়। সেখানে তার কাছে ৫০ লাখ টাকা দাবি করেন। সিরাজুল তার ভাইদের মাধ্যমে বিভিন্ন ব্যক্তির কাছ থেকে ১৮ লাখ ৫০ হাজার টাকা সংগ্রহ করে তাদের দেন।

জানা গেছে, অবৈধভাবে টাকার বিনিময়ে সিরাজুল ইসলামের ষড়যন্ত্রে যুক্ত হওয়া, অন্যদিকে তাদের আটকে রেখে টাকা নেয়ায় গোয়েন্দা পুলিশের সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থাও নেয়া হয়। সিআইডির দেয়া অভিযোগপত্রে ওই অভিযানে থাকা চার কর্মকর্তার নাম উল্লেখ করা হয়। তারা হলেন সহকারী পুলিশ কমিশনার (এসি) মতিয়ার রহমান, উপপরিদশক (এসআই) প্রদীপ, এসআই ইউসুফ ও এসআই দেলায়ার। তবে অভিযুক্ত গোয়েন্দা পুলিশের কর্মকর্তাদের মন্তব্য জানতে ডিবি কার্যালয়সহ পুলিশের একাধিক দফতরে যোগাযোগ করেও তাদের সঙ্গে কথা বলা সম্ভব হয়নি।

ঢাকা মহানগর পুলিশের মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশনস বিভাগের উপপুলিশ কমিশনার ফারুক হোসেন বলেন, পুলিশের কেউ দায়িত্বে অবহেলা করলে তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হয়। ২০১১ সালের ওই ঘটনাতেও তাই হয়েছিল, যে কারণে এরপর এমন ঘটনা আর ঘটেনি। আইজিপির নির্দেশে পুলিশের সব ইউনিটের দায়িত্বরতদের কার্যক্রমে নজর রাখা হচ্ছে। ফলে কেউ নিয়মের ব্যত্যয় ঘটানোর সাহসও করছে না।

আরো পড়ুন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

সর্বশেষ