দেশের আমদানি-রফতানি বাণিজ্যে গতি আনতে চট্টগ্রাম ইপিজেডের ঠিক পেছনেই আউটার রিং রোডসংলগ্ন সাগরপাড়ে প্রায় ৬ দশমিক ১৫ কিলোমিটার দীর্ঘ জায়গায় বে-টার্মিনাল নির্মাণের প্রকল্প নিয়েছে বন্দর কর্তৃপক্ষ। এটি হবে গভীর সমুদ্রবন্দরের আদলে একটি আধুনিক বন্দর। অংশীজনরা বলছেন, বন্দরের সক্ষমতা বাড়াতে এখনই দরকার বে-টার্মিনালের। প্রকল্পটিতে অর্থায়ন করতে পারে বিশ্বব্যাংক। চলছে নকশা প্রণয়নের কাজ। আগামী বছর শুরু হতে পারে এর নির্মাণকাজ।
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এম শাহজাহান গণমাধ্যমকে বলেন, পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০২৫ বা ২০২৬ সালে বে-টার্মিনাল অপারেশনে যাওয়ার কথা। সেই অনুযায়ী আগামী বছর নির্মাণকাজ শুরুর পরিকল্পনা আছে। প্রথমে মাল্টিপারপাস টার্মিনালের নির্মাণকাজ শুরু হবে, যা বাস্তবায়ন করবে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ। নকশার কাজ মোটামুটি চূড়ান্ত হয়ে গেছে। খুব শিগগির পরামর্শক প্রতিষ্ঠান আমাদের কাছে নকশা জমা দেবে। এরপর উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) প্রণয়ন করে নৌ মন্ত্রণালয়ে পাঠাব।
প্রকল্প এলাকা ঘুরে দেখা যায়, নগরীর পতেঙ্গা ও হালিশহর সমুদ্র উপকূলভাগের বিস্তীর্ণ ভূমি ও সাগর ঘেঁষে হচ্ছে বে-টার্মিনাল। এরপূর্ব পাশে আউটার রিং রোড এবং পশ্চিমে বঙ্গোপসাগর। পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকতের খেজুরতলার বিপরীত থেকে কাট্টলী পর্যন্ত অংশে একটি চর আছে। এই চরকে কেন্দ্র করেই হচ্ছে বে-টার্মিনাল। চরের কিছু এলাকায় এরই মধ্যে বালু ফেলে ভূমির উন্নয়নকাজ করা হয়েছে। প্রকল্প এলাকায় কিছুটা দূরে দূরে বসানো হয়েছে বে-টার্মিনাল নির্মাণের সাইনবোর্ড।
২০১৬ সালের দিকে বে-টার্মিনাল নির্মাণের কারিগরি, অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত সম্ভাব্যতা সমীক্ষা করা হয়। ওই সমীক্ষায় কারিগরি ও অর্থনৈতিকভাবে এ টার্মিনাল করার পক্ষে মত দেয়া হয়।
এরপর বে-টার্মিনাল নির্মাণ প্রকল্পের বিস্তারিত মহাপরিকল্পনা প্রণয়ন এবং চট্টগ্রাম বন্দরের অধীনে মাল্টিপারপাস টার্মিনালের বিস্তারিত প্রকৌশল নকশা, ড্রয়িং ও প্রাক্কলনে পরামর্শক সেবার জন্য চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ ও কুনহোয়া ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড কন্সাল্টিং কোম্পানি লিমিটেড এবং ডি ওয়াই ইঞ্জিনিয়ারিং যৌথ কনসোর্টিয়ামের গত ৩১ মে একটি চুক্তি সই হয়। দক্ষিণ কোরিয়ার এই দুটি প্রতিষ্ঠান প্রকল্পের মহাপরিকল্পনা প্রণয়নের পাশাপাশি বে-টার্মিনাল নির্মাণকাজেরও তদারকি করবে। এ জন্য ব্যয় হচ্ছে প্রায় ১২৬ কোটি ৪৯ লাখ ৭৩ হাজার টাকা। পুরো প্রকল্পে ব্যয় হতে পারে প্রায় ২১০ কোটি ডলার।
প্রকল্পসংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, চুক্তি অনুযায়ী ৩৬ মাসের মধ্যে নকশাসহ যাবতীয় কাজ শেষ করতে বলা হয়েছে।
এই বে-টার্মিনাল ও মাতারবাড়ী সমুদ্রবন্দরের সঙ্গে রেললাইন যুক্ত হবে।
প্রকল্প সূত্র জানায়, বে-টার্মিনাল চ্যানেলে কোনো বাঁক থাকবে না। চ্যানেলটি নাব্য থাকায় সেখানে ১০ থেকে ১২ মিটার ড্রাফটের জাহাজ এবং ৬ হাজার কনটেইনার বহনক্ষমতাসম্পন্ন জাহাজ ভেড়ানো সম্ভব হবে। বে-টার্মিনালে প্রাথমিকভাবে তিনটি টার্মিনাল নির্মাণ করা হবে। এর মধ্যে তৃতীয় টার্মিনালটি হবে মাল্টিপারপাস। এই তিনটি টার্মিনালের মোট দৈর্ঘ্য হবে ৩ দশমিক ৫৫ কিলোমিটার।
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, মাল্টিপারপাস টার্মিনালটি নির্মাণ করবে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ। এরপর বাকি দুটি টার্মিনাল সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব বা পিপিপির আওতায় নির্মাণ করা হবে। ভবিষ্যৎ চাহিদা মাথায় রেখে ট্রাক টার্মিনাল ও আলাদা ডেলিভারি ইয়ার্ড নির্মাণও পরিকল্পনায় রয়েছে।
এই প্রকল্পের আওতায় বে-টার্মিনালে মোট ১৩টি জেটি থাকবে। টার্মিনালে মাল্টিমোডাল কানেক্টিভিটি সুবিধা রাখা হবে। প্রকল্পের পূর্ব দিকে থাকবে পোর্ট অ্যাকসেস রোড ও রেলপথের সুবিধা। বে-টার্মিনালকে বৈরী আবহাওয়া এবং সাগরের বড় ঢেউ থেকে রক্ষা করতে একটি পাঁচ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের ব্রেক ওয়াটার নির্মাণ করা হবে, যা ওই এলাকায় অবস্থিত ডুবোচরের ওপর নির্মিত হবে।
বর্তমানে চট্টগ্রাম বন্দরের জেটিগুলোতে সর্বোচ্চ ৯ দশমিক ৫ মিটার ড্রাফটের এবং ১৯০ মিটার দৈর্ঘ্যের জাহাজ ভিড়তে পারে। একই সঙ্গে চট্টগ্রাম বন্দর জোয়ারের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় দিনে দুবার নেভিগেশন হয়ে থাকে। ফলে ২৪ ঘণ্টা জাহাজ ভিড়তে পারে না। এতে বন্দরে জট তৈরি হয়।
চট্টগ্রাম বন্দরের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বন্দরের জেটিগুলোর অবস্থান বঙ্গোপসাগরের মোহনা থেকে অনেক দূরে এবং বহির্নোঙর থেকেও দূরে। বে-টার্মিনালের ভৌগোলিক অবস্থান সাগরের মোহনা এবং বহির্নোঙরের কাছে অবস্থিত। ফলে দিন-রাত ২৪ ঘণ্টাই জাহাজ ভিড়তে পারবে সেখানে। আবার বে-টার্মিনাল রিং রোডসংলগ্ন হওয়ায় পণ্য আমদানি-রফতানিতে থাকবে না কোনো ধরনের জটও। ফলে ব্যবসা-বাণিজ্যের পরিচালন ব্যয় অনেক কমে আসবে। এতে সব মিলিয়ে বৈশ্বিক ব্যবসা-বাণিজ্যে গুরুত্ব আরো বাড়বে বাংলাদেশের।
তবে বাংলাদেশ শিপিং এজেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের (বিএসএএ) চেয়ারম্যান সৈয়দ মোহাম্মদ আরিফ বলেন, অন্যান্য বন্দরের চেয়ে এই টার্মিনালের অবস্থান সুবিধাজনক। এখানকার বেশির ভাগ যোগাযোগব্যবস্থা তৈরি হয়ে আছে। কিছু কাজ করলে এটা ব্যবহারের উপযোগী হবে। তাই বে-টার্মিনালের কাজ অগ্রাধিকার দিয়ে শেষ করা উচিত। এটি চালু হলে বন্দরের গতি বাড়বে, লাভবান হবে সবাই।

