এবারের আমন মৌসুমে প্রায় ১ কোটি ৬৩ লাখ টন উৎপাদনের লক্ষ্য নিয়েছিল কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর (ডিএই)। ঘূর্ণিঝড় সিত্রাং ও খরার কারণে দেশের বেশকিছু স্থানে আবাদ বিলম্বিত হওয়ায় এ লক্ষ্যমাত্রা পূরণ নিয়ে আশঙ্কা দেখা দেয়। তবে বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের (ব্রি) পূর্বাভাস বলছে, অনুকূল আবহাওয়া, তাপমাত্রা ও সূর্যালোকের কারণে এবার আমনের ফলন ভালো হয়েছে। এতে উৎপাদনও দাঁড়াতে যাচ্ছে লক্ষ্যমাফিক ১ কোটি ৬৩ লাখ টনে।
বন্যা ও অতিবৃষ্টিতে গত বোরো ও আউশ মৌসুমে উৎপাদন কমেছে। আবার অনাবৃষ্টির কারণে শুরুতেই বিঘ্নিত হয় আমনের আবাদ। দেরিতে চাষাবাদ শুরু হলেও পরে ডিএইর আবাদ লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হয়। এর মধ্যেই আঘাত হানে ঘূর্ণিঝড় সিত্রাং। আবাদ বিঘ্নিত হলেও অনুকূল আবহাওয়ায় দুর্যোগের অভিঘাত কাটিয়ে ওঠা গিয়েছে বলে জানিয়েছে ব্রি।
বিগত পাঁচ বছরের আমন মৌসুমের আবহাওয়াসংশ্লিষ্ট উপাদান (সূর্যালোক, সৌরবিকিরণ, তাপমাত্রা, আপেক্ষিক আর্দ্রতা ও মেঘমুক্ত আকাশ) এবং ফলনের ওপর এগুলোর প্রভাবের গাণিতিক বিশ্লেষণের ভিত্তিতে ব্রির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এ বছর আমনের ফলন হবে হেক্টরপ্রতি পৌনে তিন টনের বেশি। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত এটিই গত পাঁচ বছরে সর্বোচ্চ ফলন। এ পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ ফলন হয়েছিল গত অর্থবছরে (২০২১-২২ সালে)। ওই সময়ে দেশে আমন মৌসুমে হেক্টরপ্রতি ফলনের হার ছিল ২ দশমিক ৬১৫ টন। এছাড়া ২০২০-২১ অর্থবছরে এ হার ছিল প্রায় ২ দশমিক ৫৭ টন।
ব্রির প্রতিবেদনে বলা হয়, আমনের ভালো ফলনের জন্য পরিষ্কার সূর্যালোক, অধিক সৌরবিকিরণ, অধিক গড় তাপমাত্রা, কম আপেক্ষিক আর্দ্রতা এবং মেঘমুক্ত আকাশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ভালো ফলনের জন্য উৎপাদনের বিভিন্ন পর্যায়ে যে পরিমাণ সূর্যালোক প্রয়োজন পড়ে, এবার তা পাওয়া গিয়েছে প্রয়োজনের চেয়ে বেশি।
এ বিষয়ে ব্রির মহাপরিচালক ড. শাহজাহান কবীর বলেন, চলতি বছর আমনের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের জন্য উৎপাদন উপকরণ যেমন—বীজ, সার, কীটনাশক ও সম্পূরক সেচ প্রদান, সঠিক সময়ে সঠিক বয়সের চারা রোপণ ও যথাসময়ে কৃষিতাত্ত্বিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিতকরণে কার্যকরী উদ্যোগ নেয়া হয়। ফলে সারা দেশে এবার আমনের বাম্পার ফলন হয়েছে। আমন নিয়ে যে ধরনের শঙ্কা ছিল সেটি কেটে গিয়েছে। আমাদের হিসাব অনুযায়ী, এ অর্থবছর অর্থাৎ আগামী জুন পর্যন্ত খাদ্য সংকটের কোনো সম্ভাবনা নেই।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ধানের কুশি গঠনের জন্য এবারের তাপমাত্রা ছিল সর্বোত্তম। ফলে প্রজনন পর্যায়ে ভালো ফুল ফুটেছে। আবার সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে প্রজনন পর্যায়ে বৃষ্টিপাত হওয়ার পাশাপাশি আপেক্ষিক আর্দ্রতা ভালো হওয়ার বিষয়টি ফুল ফোটা ও পরাগায়নে ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে।
ডিএইর ৮ ডিসেম্বর পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, এ পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন জেলায় মোট আবাদকৃত জমির ৭৪ দশমিক ৩৮ শতাংশ ফসল কাটা করা হয়েছে। ফসল কাটা করা হয়েছে প্রায় ৪৪ লাখ হেক্টর। এসব জমিতে ১ কোটি ৩৮ লাখ টন চাল উৎপাদন হয়েছে। সে হিসেবে হেক্টরপ্রতি গড় ফলন দাঁড়ায় প্রায় ৩ দশমিক ১ টন।
শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের এগ্রিকালচারাল এক্সটেনশন অ্যান্ড ইনফরমেশন সিস্টেম বিভাগের অধ্যাপক এম জাহিদুল হক বলেন, এবার আমনের ফলন ভালো হয়েছে, এটা কৃষক ও কৃষিসংশ্লিষ্টদের সফলতা। এবার দেরিতে আমন আবাদ হলেও পরে আবহাওয়া অনেক ভালো ছিল। তবে প্রতি বছরই এমন আবহাওয়া থাকবে এমন নয়। এখন প্রযুক্তির মাধ্যমে জলবায়ু সম্পর্কিত আগাম তথ্য পাওয়া যায়। এ কারণে প্রতি বছরই আলাদাভাবে পরিকল্পনা করতে হবে এবং কৃষকদের মোটিভেট করতে হবে। অঞ্চলভিত্তিক চাষাবাদের পরিকল্পনা করতে হবে। প্রযুক্তির উন্নয়নে আরো বরাদ্দ বাড়াতে হবে।
ডিএই জানিয়েছে, চলতি মৌসুমে রোপা আমনের জন্য ৫৬ লাখ ২০ হাজার হেক্টর জমিতে আবাদ লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। তবে লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হয়ে এবার ৫৬ লাখ ৫৭ হাজার ৪৪৭ হেক্টর জমিতে আবাদ হয়েছে। এসব জমিতে উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ১ কোটি ৫৯ লাখ ৮৬ হাজার টন। আবার বোনা আমনে ২ লাখ ৮৫ হাজার হেক্টর লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে ২ লাখ ৬৫ হাজার হেক্টর জমিতে আবাদ করা হয়। এসব জমিতে ৩ লাখ ৫৯ হাজার টন চাল উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নেয়া হয়। সে হিসেবে ৫৯ লাখ ২৩ হাজার হেক্টর জমিতে এবার আবাদ করা হয়। মোট উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা নেয়া হয়েছে ১ কোটি ৬৩ লাখ ৪৫ হাজার টন।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের সাবেক সচিব আনোয়ার ফারুক বলেন, আমাদের দেশে আগের বছরের চেয়ে বেশি ফলন দেখানোর একটা প্রবণতা লক্ষ করা যায়। এবার শুরুতে আমন মৌসুমে অনিশ্চয়তা থাকলেও পরবর্তী সময়ে ভালো ফলন হয়েছে। তবে যেভাবে পূর্বাভাস দেয়া হচ্ছে, এ তথ্যে যদি কোনো ভুল থাকে তাহলে সরকারের পক্ষ থেকে কোনো পরিকল্পনা করা যাবে না। প্রতি বছরই সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যেই উৎপাদন নিয়ে গরমিল থাকে। আমরা প্রত্যাশা করছি ভালো ফলন হবে। তবে তাতে যেন নির্ভুল তথ্য থাকে।

